‘তুমি আমার মাকে বিবস্ত্র করেছিলো’

0
8

মিজানুর রহমান রানার মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক উপন্যাস- প্রথম খণ্ড

এক.
শেষ বিকেলের নীলিমা নীলাম্বরীতে আচ্ছাদিত হয়। দিন-শেষে সূর্যের হাসি বিলীন হতে থাকে। পৃথিবীর বুকে ঘনায় আঁধার। বন্ধ হয় ঝিঁঝির একটানা সুর। জোনাকিপোকারা আলোকবর্তিকায় বেরিয়ে পড়ে দূর-দূরান্তে। রাতের আঁধারে বেরোয় নিশাচর পশু-পাখির দল। বাদুরের ডানা ঝাঁপটানি, উড়ে চলা একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে জীবন ও জীবিকার অন্বেষণে।

রাতশেষে আবার প্রভাতের জ্যোতিষ্মান আলো ধরায় প্রাণের ছোঁয়া জাগায়। নরোম ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দুর দীপিত দীপ্তি প্রাণবন্ত কোরে। নিশাচর পশু-পাখিরা ফিরে যায় আপন আলয়ে। পৃথিবীমাঝে মানুষের কর্মব্যস্ততা বাড়ে। প্রভাতের সূর্যের আলো ক্রমে গাঢ়ো হয়। উষ্ণতা বাড়ে ঘরে-বাইরে, সবখানে।

শেষ বিকেলে-সাঁঝে আবার কর্মক্লান্ত মানুষের নীড়ে ফেরা। এভাবেই চলছে পৃথিবী। চলছে পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর জৈবনিক আশা-আকাক্সক্ষার ভেলা। কেউ কামিয়াব হয়, আর কেউ পড়ে থাকে আশার ভেলায় সমুদ্র-সৈকতে- বালুচরে। আশা-নিরাশার পৃথিবীতে হাজার রকমের মানুষের আগমন ও প্রস্থান। এদের মধ্য থেকে ক’জন মানুষকে নিয়ে শুরু হলো আমাদের ‘নীল যন্ত্রণা’র গল্প।

এ নীল যন্ত্রণার শুরুটা এভাবেই : যখোন মানুষ সংসার সীমান্তের যন্ত্রণায় ভুগতে ভুগতে পাড়ি জমায় অন্য শহরে এক অদ্ভুত আলোর দীপিকায়, কিন্তু তার শেষ কীভাবে? সে অন্য এক অধ্যায়, অন্যরকম পরিণতিতে।

ছয় মার্চ, উনিশশো একাত্তর।
নদীপথে লঞ্চে পাড়ি দিয়ে এক ইলিশের শহর চাঁদপুর থেকে ভোরবেলা ঢাকার সদরঘাটে এসে নামলেন গণি মিয়া। তিনি বড়ো আশা করে ঢাকায় এসেছেন। গ্রামে কাজকর্ম তেমন একটা নেই। সাংসারিক টানাপোড়েন তাকে ফেলে দিয়েছে অথৈ সাগর মাঝে। অর্থনৈতিক দৈন্যদশা, সাংসারিক দূরবস্থা, টানাটানি, ছেলেমেয়ের স্কুলের পড়াশুনার খরচ চালাতে পারছেন না। জীবনের দুর্গম বাঁকে ক্লান্ত-পাখির বটের ডানার মতো উড়ে উড়ে কূলের জন্যে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

গণি মিয়া সদরঘাটে নামলেন।
খাবার হোটেলে টিউবঅয়েলের পানি দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিলেন তিনি। পাশে ফুটপাতে বসে একজন দোকানি রুটি বানাচ্ছে। গ্রাম থেকে আসা গণিমিয়াকে দেখে উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘চাচা, নাস্তা খাইবেন? আহেন।’

সম্মতি জানায় গণি মিয়া।
তারপর বলে, ‘হ বাপজান, বড়ই খিদা পাইছে। নাশ্তা খাইতে অইবো। তয়, রুটির সাথে আর কী আছে?’

ফুটপাতের এই দোকানদার লোকটার নাম কাশেম আলী।
সে গণিমিয়ার খাবারের আগ্রহে খুশি হয়। তার খুশির কারণ সকালবেলায় এই প্রথম একজন ‘কাস্টমার’ পাওয়া গেলো। অন্য কাস্টমাররা বেশিরভাগই সামনের ওই আলীশান হোটেলটাতে বসে মজা করে খায়। তার এই ফুটপাতের অপরিচ্ছন্ন দোকানে তেমন একটা কেউ আসতে চায় না।
ঢাকা শহরে অনেক ধনী লোকের বাস। কেউ থাকে আটতলায় আর কেউ থাকে গাছতলায়। যারা আটতলায় থাকে তারা ওপর থেকে গাছতলার মানুষদের খুব ছোটো করে দেখে। এটা কাশেম আলী বেশ ভালো করেই জানে। ওপরতলার মানুষরা তাদের মতো গাছতলার মানুষদের সাথে মেশে না, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। কারণে-অকারণে বকে, মারে, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এমনকি ভুলক্রমে পথ চলতে গিয়ে যদি কোনোদিন কোনো ওপরতলার মানুষদের গায়ে লাগে তাহলে তো আর রক্ষা নেই। গলাধাক্কা মারতেও দ্বিধাবোধ করে না।

গণিমিয়া কাশেম আলীর কাছে আসে। তার খাবারের প্রতি উৎসাহ দেখে কাশেম আলী বেশ খুশি হয়। সে একটা ছালার চট বিছিয়ে দেয় গণি মিয়ার সামনে। বলে, ‘আগে বহেন চাচা। ডিম, ভাজি, হালুয়া সবই আছে। কী খাইবেন?’

গণি মিয়া সেই ছালার চটে বসলেন।
কাশেম আলীর ফুটপাতের অপরিচ্ছন্ন দোকানটাতে বসে গণি মিয়া পেটপুরে রুটি-হালুয়া খেলেন। মুখ মুছলেন কাশেম আলীর তেলচটচটে নোংরা গামছায়।
তারপর খাবারের দাম দিয়ে গণি মিয়া কাশেম আলীকে প্রশ্ন করলো, ‘বা’জান, এইহান থাইক্কা ঢাহা বিশ্ববিদ্যালয় কতো দূর?’
কাশেম আলীর জন্যে এসব প্রশ্ন নিত্য-নৈমিত্তিক বিষয়। সে জানে এই সদরঘাটে প্রতিদিন বারো রঙের মানুষ আসে। সবাই জানতে চায় তার গন্তব্যের দূরত্ব কতোদূর।
কাশেম আলী দিনে সদরঘাটের ফুটপাতে রুটি-ভাজি-হালুয়া বিক্রি করে। এটাই তার আসল রুজি নয়। এটা হচ্ছে তার ফ্যাশন বা পোশাক। এখানে বসে সে প্রতিদিন হালুয়া-রুটি বিক্রি করে আর মানুষজনদের দেখে। সে মানুষদের দেখে বুঝতে পারে কার পকেটভারী, কারটা হাল্কা। সাথে সাথে অন্য সাথীদের কাছে সেই খবরটা পৌঁছে যায়। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি সবই তার দলের লোকেরা করে। এটাই তাদের আসল পেশা।
কাশেম আলী সরাসরি এসব করে না। সে শুধু খবরটা পৌঁছে দেয়। বিনিময়ে সে পায় দলের সম্মিলিত ধান্ধার কিছু অংশ। আর সে অংশটা মাঝে মাঝে অনেক বড়ো ধরনের হয়ে যায়।

এখন এই যে গণি মিয়া লোকটা তার সামনেই কোমরের খুট থেকে টাকা বের করলো সেটা সে গুণে ফেলেছে দ্রত। গণি মিয়ার কোমরের খুট থেকে বেরিয়েছে অল্প কয়েকটি টাকা। সেই টাকা থেকে সে নাশ্তার বিল মিটিয়েছে। বাকি টাকা তার কাছে কিছুই নয়।
কাশেম আলীরা এসব অল্প টাকা নিয়ে মাথা ঘামায় না। কারণ তাদের দলে লোকের সংখ্যা অনেক। ছোটখাটো চুরি, ছিনতাই তাদের পোষে না। একটা ধান্ধা করলে সবাই যেহেতু ভাগ পায় তাই তাদেরকে বড় বড় ধান্ধা কোরতে হয়।
কাশেম আলীকে ভাবতে দেখে গণি মিয়া আবারও প্রশ্ন করলো, ‘ভাইজান বিশ্ববিদ্যালয় কতো দূর?’
এবার বাস্তবে ফিরে এলো কাশেম আলী। সে হাতের তর্জনী উঁচিয়ে উত্তর দিলো, ‘বেশি দূর না। ওই তো সামনেই।’

রাস্তায় নামতেই একজন রিকশাঅলা আগ্রহভরে জানতে চাইলো, ‘চাচা, কুনহানে যাইবেন? ওঠেন আমার রিকশায়।’
‘বাবা, ঢাহা বিশ্ববিদ্যালয় যামু। তুমি যাইবানি?’
রিকশাঅলা মৃদু হাসলো।
‘হাসছো ক্যান বাপজান? এইডা কি হাসার কথা অইলো?’ প্রশ্ন করে গণি মিয়া।
‘আপনে এই বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অইবেন? বয়স ত কম অইলো না!’

এবার গণি মিয়াও হাসলেন।
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উত্তর দিলেন, ‘হ, কথাডা ঠিক। আমার বয়স অইছে। তয় বিশ্ববিদ্যালয় আমি ভরতি অমু না। আমাগো পাশের বাড়ির এক ভাতিজা ইরফান। অয় পড়ে। হের লগে দেহা করতে যামু। যাইবানি তুমি?’

রাজি হয়ে গেলো রিকশাঅলা।
তারপর উত্তরে জানালো, ‘হ যামু। তয় ইরফান ভাই কোন্ হলে থাহে?’
‘হুনছি কারজন হলে থাহে। জায়গাডা চিনোনি তুমি?’
‘চিনি। আপনে ওডেন রিকশায়।’

গণি মিয়া আল্লাহ্-নবীর নাম নিয়ে রিকশায় ওঠলেন।
দু’জনের আলাপচারিতায় জানা গেলো- রিকশাঅলার নাম হামিদ বেপারী। পথ চলতে চলতে আরো জানা গেলো, তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা। চার-পাঁচ বছর আগে ঢাকায় এসেছে কাজের সন্ধানে। কাজ-কর্ম জুৎসই না পেয়ে ঢাকায় এখোন রিকশা চালায়। গ্রামে স্ত্রী, সন্তান ও বৃদ্ধা মা আছে। মাসে মাসে টাকা পাঠায়। মাঝে মাঝে আবার গ্যারেজে রিকশা রেখে স্ত্রী-সন্তান ও মাকে দেখাশোনা করার জন্যে গ্রামের বাড়িতে যায় সে।
রিকশা চালিয়ে দৈনিক যা আয় করে তাতে তার ও পরিবারের সদস্যদের কোনোমতে দিন চলে যায়। মাঝে মাঝে ঝড়-বৃষ্টি বা হরতাল হলে রিকশা চালাতে না পারলে ঢাকায় তার এক ব্যবসায়ী বন্ধু আলি মিয়ার কাছ থেকে টাকা-পয়সা ধার নেয়। আবার রুজি-রোজগার হলে সময়মতো টাকা ফেরত দিয়ে আসে।

গণি মিয়া রিকশায় যেতে যেতে রিকশাচালক হামিদ বেপারীর জীবনের নানা কথা শোনে।
গণি মিয়ার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর মহকুমার হাজীগঞ্জ এলাকায়। হামিদ বেপারীর বাড়ি কুমিল্লা জেলার কোর্টবাড়ি এলাকায়। পাশাপাশি জেলা ও মহকুমায় দু’জনের বাড়ি হওয়ায় উভয়ের মধ্যে ক্ষণিকের মধ্যেই একটা হৃদয়ের টান জন্ম নেয়।
চলতে চলতে হামিদ বেপারীও গণি মিয়ার সুখ-দুঃখের কথা শোনে মন দিয়ে। গণি মিয়ার কাছ থেকে জানতে পারে ঢাকায় কাজের সন্ধানে এসেছে। গ্রামে তারও পরিবার-পরিজন আছে। ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ, পরিবারের নৈমিত্তিক খরচের সঙ্কুলান না করতে পেরে সে শহরে এসেছে ইরফান নামক বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর কাছে। গণি মিয়া তার সাথে দেখা করে একটা চাকরি-বাকরি বা কাজকর্মের জন্যে সাহায্য চাইবেন।
হামিদ বেপারীসহ কার্জন হলে গিয়ে গণিমিয়া ইরফান নামক যুবকটিকে খুঁজে পেলেন না। ইরফানের বন্ধুরা জানালো পরদিন ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে ভাষণ দেবেন। সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণাও আসতে পারে। তাই ইরফান বন্ধুদের নিয়ে ওই জনসভায় যোগদানের প্রাক-মিটিং করছে কোনো এক জায়গায়।

অনেক খুঁজেও গণি মিয়া যখন ইরফানকে খুঁজে পেলেন না, তখন রিকশাচালক হামিদ বেপারী বললেন, ‘ভাইজান! ঢাকা শহরে সবাই ব্যস্ত। কে কার খোঁজ-খবর নেয়। আপনে আমার গরিবখানায় বিশ্রাম করেন। আমি ঠিক সুময় ইরফান ভাইরে খুঁইজা আপনের লগে দেহা করাইয়া দিমু।’
‘ভাই, আপনে এতো কষ্ট কোরবেন?’ গণি মিয়া অবাক হয়।
পান খাওয়া লাল টকটকে দাঁতগুলো বের কোরে হাসে হামিদ বেপারী। তারপর বলে, ‘এইডা আর এত্তো কী কষ্ট ভাইজান! সারাদিন রোদে পুড়ি, মাথার ঘাম পায়ে ফেলি। বৃষ্টিতে ভিইজ্জা ভিইজ্জা কাঁপতে কাঁপতে রিকশা চালাই। হেইডাই তো কষ্ট মোনে অয় না। আপনে আমার দ্যাশের এলাকার মানুষ। আপনের লাইগা যদি এট্টু-আধটু উপোকার কোরতে পারি, তাইলে তো আল্লাহ্পাক খুশি অইবেন। আপনে চিন্তা কোরবেন না। আইজ রাইতের মইধ্যেই ওনার দেখা পাইবেন। লন, এখোন আমার লগে।’
হামিদ বেপারী গণি মিয়ার হাত ধরে। গণি মিয়া আরো অবাক হয় তার কথায়। কিংবর্তব্যবিমূঢ় হয়ে থাকে কতোক্ষণ। বুঝতে পারে না কী করবে সে।
গণি মিয়ার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বুঝতে পারে হামিদ বেপারী। টান মেরে জোর করে তার রিকশায় ওঠায় গণি মিয়াকে।

চলবে…

আরো পড়ুন :

মিজানুর রহমান রানার মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক উপন্যাস- দ্বিতীয় খণ্ড

mizanranapress@gmail.com
ফেসবুকে মন্তব্য করুন
46 জন পড়েছেন