‘তুমি আমার মাকে বিবস্ত্র করেছিলো’-২

0
65

মিজানুর রহমান রানার মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক উপন্যাস- দ্বিতীয় খণ্ড

দুই.
একটা বন্ধো দরোজা-জানালাবিহীন ঘর। ঠিক দেখতে একটা গুদামের মতো, বেশ উঁচুতে টিনের চাল। ভেতরে কয়েকজন যুবক-যুবতী। মিটিং চলছে। একজন বক্তা। তার নাম ইরফান। সে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখছে। তার সামনে বন্ধু-সহযোদ্ধারা নীরব-নিঃস্তব্ধভাবে দীপ্র-দীর্ঘ বক্তার কথা শুনছে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

ইরফানের চোখে-মুখে আগুনের ফুলকি। তার মুখ থেকে যে কথাগুলো বের হচ্ছে তা’ বন্ধুদের হৃদয়প্রচীরে আঘাত হানছে বজ্রের মতো।

ইরফান বলে চলছে, ‘বন্ধুরা! আমাদের এই দেশটা ছিলো এককালে একটি মণিদ্বীপ। মণিদ্বীপ হচ্ছে মণিময় প্রদীপ- অতি মূল্যবান স্মরণযোগ্য বস্তু। আমাদের দেশের এই মণি-মুক্তোরূপী প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাটের জন্যে পর্তুগীজ, ওলন্দাজ, মগ জলদস্যুরা যেমোন এসেছে তেমনি এসেছে ইংরেজরা। আমাদের দেশের সম্পদে ইংল্যান্ডে গড়ে তোলে সুদৃশ্য অট্টালিকা। ওরা ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত লুট করে যখোন দেশটা তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হলো তখোনই তা দু’টি ডোমোনিয়ামের ভিত্তিতে ভাগ করে দিয়ে চলে যায়। এরপর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট সৃষ্টি হয় পাকিস্তান। পূর্ব বাংলা হয় পাকিস্তানের অংশ- পূর্ব পাকিস্তান। দেশের জনগণ আশা কোরছিলো এবার তাঁদের আশা-আকাঙ্খা পূরণ হবে। জনগণ পাবে পূর্ণ স্বাধীনতা। পাবে স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার। কিন্তু না, জনগণের এ আশা পূর্ণ হলো না। শুরু হয় নব্য পশ্চিম পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শক্তির পদ্চারণা। তবে এবার বিদেশী শক্তি নয়, এবার আমাদেরকে শোষণ করার জন্যে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকচক্র ছলে-বলে-কৌশলে শুরু করে নানা টালবাহানা। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক- সবক্ষেত্রেই তারা আমাদের অধিকার হরণ করা শুরু করলো। তারা বায়ান্নে আঘাত হানলো ভাষার ওপর। সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ বাংলা মায়ের বীর সন্তানদের রক্তদানে তারা সফল হলো না। ১৯৫৪ সালে ১০ মার্চ পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ববঙ্গে যুক্তফ্রন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কোরে সরকার গঠন করে। কিন্তু পাকিস্তান শাষকগোষ্ঠী বাঙালির এই বিজয় মেনে নেয়নি। ক্ষমতা দখলে রাখার এবং বাঙালিদেরকে শোষণ ও নির্যাতন করার হীন মানসে আড়াই মাসের মধ্যে ৩০ মে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা হয়। ১৯৫৯ সালে সমগ্র পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের সময় নির্ধারিত হলে বাঙালিদের মধ্যে বিপুল সাড়া দেখা দেয়। জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ বাঙালি, সুতরাং এই নির্বাচনের ফলাফল চিন্তা করে কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র শুরু কোরে। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসন তুলে নেয়া হলে শিক্ষা সঙ্কোচন নীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ তাদের অধিকারের দাবিতে পুনরায় আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ১৯ জুন ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবর রহমানসহ ৩৫ ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা কোরে। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্র“য়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্যে ছয় দফা দাবি পেশ করেন। ১৯৬৯ সালে পূর্ব-বাংলার স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে। রাজনৈতিক দলের ৬ দফা দাবি গণদাবিতে পরিণত হয়। বাঙালি একক জাতিসত্তার আন্দোলনের ফলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এই গণ-আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে ২০ জানুয়ারি ছাত্র আসাদুজ্জামান এবং ২৪ জানুয়ারি আমাদের ভাই স্কুল ছাত্র মতিউর রহমান শহীদ হন। ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন আরও পূর্ণমাত্রা লাভ করে। এরপর ১৫ ফেব্র“য়ারিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত অবস্থায় বন্দী আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হক মৃত্যুবরণ করেন। ১৮ ফেব্র“য়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এই মৃত্যুসংবাদ গণ-আন্দোলনে আরেকটি নতুন মাত্রা সংযোজন করে। প্রচণ্ড-আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার ২১ ফেব্র“য়ারি মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ২২ ফেব্র“য়ারি শেখ মুজিবর রহমানসহ অভিযুক্ত সকলেই ঢাকা সেনানিবাস থেকে মুক্তিলাভ করেন। ২৩ ফেব্র“য়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল গণ-সংবর্ধনায় শেখ মুজিবর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ছয় দফা ম্যান্ডেট নিয়ে পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে।’

একটু দম নিলো ইরফান। তারপর বলতে লাগলো, ‘প্রত্যাশা করেছিলাম এবার বাঙালিদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা-লাঞ্ছনা-নির্যাতন-নিপীড়নের ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন হবে। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও ছলনার আশ্রয় নিয়ে শাসকগোষ্ঠী সে অধিকার দেয়নি। বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্যে মাওলানা ভাসানীসহ অনেক রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্বে এ দেশে বহু আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। রক্তদান করেছে আমাদের অসংখ্য ভাই-বোন। সেকথা তোমাদের জানা আছে। আজ বাঙালি জাতির ক্রান্তিলগ্নে আমরা আবারও ঐক্যবদ্ধ হোতে চাই। নিজেদেরকে দেশমাতার জন্যে বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত হোতে চাই। আমাদের অধিকার ফিরে পেতে চাই। সেজন্যে আগামীকাল রেসকোর্সে সমবেত হচ্ছি আমরা। নেতার নির্দেশনায় আমরা ওদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবো। প্রয়োজন হলে শেষ রক্তবিন্দুটি দিয়ে হলেও মা-জননীকে আমরা শত্র“মুক্ত করে ছাড়বো।’

ইরফানের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে বন্ধুরা শুনছিলো। তাদের সবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো ইরফান, ‘তোমরা কি দেশের জন্যে যে কোনো মুহূর্তে জীবন দিতে প্রস্তুত?’

সবাই বজ্রমুষ্ঠি তুলে উচ্চস্বরে শ্লোগান তুলে দেশের জন্যে নিজেদের প্রাণ বিলানোর দীপ্ত শপথ করলো।

ইরফান নির্দেশ দেয়, ‘আগামীকাল বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে ভাষণ দেবেন। আমি জানতে পেরেছি, তিনি ওই সমাবেশে স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। যদি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা নাও দেন তবে কৌশলগত কারণে তাঁর ওই ভাষণের মধ্যেই থাকবে স্বাধীনতার উদ্দীপ্ত কণ্ঠস্বর। তোমরা প্রস্তুত হয়ে নাও ওই জনসভাকে সফল করার জন্যে। আমরা ওই জনসভায় যোগদান করে আমাদেরকে ইতিহাসের পাতায় লিখে যেতে চাই।’

ইরফান কথা শেষ করে আরো কিছু প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করলো বন্ধু-সহযোদ্ধাদের। মিটিং শেষ করে একে একে সবাই বাইরে এলো। হঠাৎ করেই ইরফানের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো অদূরে দাঁড়ানো এক নারীকে দেখে।

বেশ দূরেই দাঁড়ানো ছিলো সে নারী। হঠাৎ করেই ছুঁটে এলো ইরফানের কাছে। তারপর তাকিয়ে থাকলো তার দৃষ্টিসীমানায়।

‘কী হয়েছে অপর্ণা?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সে নারীর কাছে জানতে চাইলো ইরফান।
‘শুনেছি তুমি কাল বঙ্গবন্ধুর জনসভায় যোগদান করতে যাচ্ছো।’ অপর্ণা জিজ্ঞেস কোরে।
‘অবশ্যই।’
‘আমিও যাবো।’ বায়না ধরে সে।

‘দেখো অপর্ণা, ওই জনসভায় লাখ লাখ মানুষের সমাগম হবে। ভিড়ের মধ্যে কী হয় না হয়। তাছাড়া পুলিশ কখোন টিয়ার শেল ছোঁড়ে, গুলি কোরে তার ইয়ত্তা নেই। একজন নারী হোয়ে তোমার ওখানে যাবার প্রয়োজন আছে কি?’

‘এসব কী বলছো তুমি? আমি জানতে পেরেছি ওই জনসভায় কয়েক হাজার নারী যোগদান করবেন। আমিও তাঁদের একজন হোতে চাই।’
অপর্ণা ইরফানের কোনো কথাই শুনলো না। তার বাঁধভাঙ্গা দেশপ্রেমের অদম্য জোয়ারে ইরফানের মনের কঠিন বরফ গলতে শুরু করলো। অবশেষে ইরফান রাজি হলো অপর্ণাকে জনসভায় তাদের সঙ্গী কোরতে।

তিন.
রিকশাচালক হামিদ বেপারীর টিনের ভাঙ্গা ঘরে শুয়ে আছে গণি মিয়া। শুয়ে শুয়ে ভাবছে নানা কথা। এমন সময় হামিদ বেপারী এলো। তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো গণি মিয়া। তারপর হামিদ বেপারীকে প্রশ্ন কোরলো, ‘ইরফানরে খুঁইজা পাইছো?’

‘না চাচা। পাই নাই। তয়, হুনছি আগামীকাইল ইরফান ভাই ও তার বন্ধুরা বঙ্গবন্ধুর জনসভায় যোগদান কোরবো। আমারও কালকে রিকশা নিয়া যাওন অইবো না। চিন্তা করছি, আপনেরে লইয়া অই জনসভায় যামু। ইরফান ভাইরেও খোঁজা অইবো, আর বঙ্গবন্ধুরও ভাষণডাও শুনা অইবো।’

‘তুমি কি বঙ্গবন্ধুরে খুুউব পছন্দ করো?’

‘ক্যান করুম না। লোকটা তো অন্যায় কিছুই কয় না। ক’দিন পর পর দ্যাশের লাইগা, দ্যাশের মানুষের অধিকার আদায়ের লাইগা কথা কইতে গিয়া গেরেফতার অয়, জেলে যায়। অই মানুষের চেহারাডা দেখলেও মনডা শান্তি অয়। আহা! কি সোন্দর চেহারা, কি শান্তির কথা কয় মানুষটা।’

‘হ, বুঝছি। তুমি বঙ্গবন্ধুর দেওয়ানা-আশিক মানুষ। কিন্তু অইযে মানুষেরা কয়, মুসলিম লীগ নাকি ইসলামের দল, আর আওয়ামী লীগ নাকি ভারতের হিন্দুগো দল। হেইডা কি বুঝায়া কইবার পারো?’

‘আরে চাচা মিয়া, আপনেরা আগের কালের মানুষ। হের লাইগা আগের যুগেই রইয়া গেলেন। কে আসল আর কে নকল, কারা আল্লাহ্-নবীজীর নাম বেইচা ব্যবসা করে, হেইডা তো অহনও বুঝবার পারলেন না। তয় একখান কথা, আমি কিন্তু দিব্যচোখে অনেক কিছু দেখবার পারি।’

‘হেইডা কী?’

‘আমি জানি, মুজিবই এই দ্যাশের মানুষের আসল বন্ধু। এই মুজিব ভাঙবো, তয় মচকাইবো না। জান দিবো, তয় আপোস করবো না। হেইদিন পরমান অইবো, কারা আসল আর কারা নকলÑ বর্ণচোরা।’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন গণি মিয়া। তারপর বললেন, ‘কি জানি মিয়া। হুনছি মুজিব এই দেশের শত্র“। আর যারা মুসলিম লীগ করে, উর্দু ভাষায় কথা কইতে চায়, হেরা আমাগো বন্ধু। অহন তুমি হুনাইলা মুজিবই নাকি আমাগো বাঙালির বন্ধু। তয় তোমার মুখে এইসব কথা হুইনা অই মুজিব ভাইরে একটু দেখবার মোন চাইতাছে। ওনার কথা হুনবার লাইগা মোন চাইতাছে। হুনছি কাইল নাকি উনি ভাষণ দিবেন।’

‘হ, ঠিক কইছেন চাচাজান। চলেন আমরা ওইখানেই যাই। বঙ্গবন্ধুর কথা হুনাও অইবো, আর এদিগে ইরফান ভাইরেও খোঁজা অইবো।’
গণি মিয়া ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালেন। খুশিতে মনটা ভরে ওঠে রিচশাচালক হামিদ বেপারীর।

চলবে…

আরো পড়ুন :

মিজানুর রহমান রানার মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক উপন্যাস- প্রথম খণ্ড

আপনার অভিমত জানাতে মেইল করুন : mizanranapress@gmail.com

ফেসবুকে মন্তব্য করুন
477 জন পড়েছেন