সত্যিই সে আর কাঁদলো না..

0
23

কথাটা অনেক কষ্টেরও…

মিজানুর রহমান রানা :

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

গত ২ জুলাই ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে। আমার শ্বশুর স্ট্রোক করার পর চাঁদপুর সদর হাসপাতাল থেকে  ঢাকা মেডিকেল কলেজে আমার শ্বশুরকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেলাম। কর্তব্যরত ডাক্তার প্রেসার মেপে দেখলেন এবং বললেন, তাঁর ইসিজি করার জন্য।

ডাক্তার প্রেসার মাপার আগেই যখন আমি তাকে বেডে শুইয়েছিলাম, তখন তার শ্বাসপ্রশ্বাস নেই দেখে, আমি হাত দিয়ে তার শিরা পরীক্ষা করে দেখেছিলাম, তিনি দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু আমার স্ত্রী পাশে থাকায় এবং তার ভেঙ্গেপড়ার আশঙ্কায় আমি তাকে কথাটা বলিনি। সে কাঁদো কাঁদো গলায় জিজ্ঞাসা করেছিলো, আব্বা নেই?

আমি বলেছিলাম, আছে, আছে। চিন্তা করো না তুমি।

এরপর ডাক্তার প্রেসার মেপে বললেন, ইসিজি করার জন্য।

ইসিজি করতে গেলে তারা আমার ভাইকে জানালেন, তিনি আর বেঁচে নেই।

আমি আমার স্ত্রীকে বলিনি। কারণ সেখানে কান্নার রোল হলে সমস্যা বাড়বে। এদিকে দালালদের টানাটানি।

আমার ভাই হাসপাতালের সব নিয়ম কানুন ও দালালদের বখশিশ দেয়া শেষে যখন বাড়িতে আনার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে উঠাবো, তখন আমার স্ত্রী কেঁদে উঠে বললো, আব্বা আর নাই।

আমি মিনমিনে গলায় বললাম, তিনি আছেন। তাকে অন্য হাসপাতালে নিতে হবে।

এদিকে আমাদের ড্রাইভারকে নিয়ে আবারও দালালদের টানাটানি ঝগড়া শুরু হলো। তারা বললো, তাদের গাড়িতে করে লাশ নিতে হবে। তারা আমাদের ড্রাইভারকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল শুরু করলো।

আমি কাঁদবো নাকি তাদেরকে কিছু বলবো, বুূঝে উঠতে পারছিলাম না। কোনো মতে গাড়ি থেকে মাথা বের করে বললাম, ভাইজানরা দয়া করে কলহ করবেন না। আপনাদেরকে তো আমার ছোট ভাই টাকা দিয়েছে।

তারা বললো, আপনি সাংবাদিক এবং আপনার ভাই অ্যাডভোকেট সেজন্য আমরা আপনাদের কাছ থেকে কিছুই নিলাম না। (যদিও তারা দেড় হাজার টাকা নিয়েছে, এটা নাকি কিছুই না।) কিন্তু আপনাদের ড্রাইভার আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে, দালালরা বলতে লাগলো।

আমি তাদেরকে কোনোমতে বুঝলাম। গাড়ি ছাড়লো।

হায়রে জীবন। মরনের পরেও রক্ষা নেই। আমার শ্বশুর মারা গিয়েছেন, আরা তারা টাকা পয়সার লেনদেন নিয়ে কলহ করছেন। তাদেরকে কি এভাবে মরতে হবে না?

কোনো রকমে শ্বশুরের মৃত শরীরটা বহুকষ্টে গাড়িতে উঠানোর পর আমার স্ত্রীকে বললাম, হ্যা, সতিই তোমার বাবা আর আমাদের মাঝে নেই। আমার স্ত্রী আর কাঁদলো না, ফ্যাল ফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। সত্যিই সে আর কাঁদলো না..। কিছু সময়ের জন্য পাষাণ হয়ে গেলো।

তাঁর ডেড বডি তার কোনো আত্মীয় স্বজন নিতে আসেনি। শুধু মিনমিনে গলায় বলেছিলো কিছু একটা। আমি আমাদের বাড়িতেই তাঁকে দাফন করলাম। সব আনুষ্ঠানিকতা করলাম।

বাবার মৃত্যুর সময় আমি বিদেশে ছিলাম। বাবোর লাশ কাঁদে নেয়ার সুযোগ হয়নি। শ্বশুরের লাশ কবর পর্যন্ত নামিয়েছি। এরপরই আমার পরিবর্তন। মনের ভেতর থেকে সমস্ত রাগ, অভিমান, হিংসা বিদ্বেষ ও অহঙ্কার মুছে দিয়েছি। কারণ আমাকেও এভাবেই একদিন না বলে অপ্রস্তুত অবস্থায়ই চলে যেতে হবে।

আমি আজও মাঝে মাঝে তাকে স্মরণ করি। কেনো যেনো তাকে আমার সবকাজেই মনে হয়। আমি মাঝে মাঝে কাঁদি। তার জন্য দোয়া করি।

আমার স্ত্রীকে আমি এখন আর কিছুই বলি না। বলতে হয় না। সে এখন অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। নামাজ পড়ে, সারাদিন আল্লাহর দরবারে বাবার জন্য প্রার্থনা করে।

মানুষের মাঝে কখন, কোনো ঘটনায় যে পরিবর্তন আসবে সেটা তো আল্লাহই ভালো জানেন।

ফেসবুকে মন্তব্য করুন
228 জন পড়েছেন