চাঁদপুরে গ্রাম আদালতের কল্যাণে পাওনা টাকা উদ্ধার হলো খুর্শিদার

0
41

আবেদনকারী : খুর্শিদা বেগম
প্রতিবাদী : মাহবুব আলম
গ্রাম : দোপল্লা
ইউনিয়ন : টামটা-দক্ষিণ
উপজেলা : শাহরাস্তি
জেলা : চাঁদপুর
মামলা নং ও ধরণ : ০০৯/২০১৮ (দেওয়ানী)
নিষ্পত্তির ধরণ ও সময়কাল : প্রাক-বিচার (সময়কাল-২৬ দিন)

চাঁদপুর জেলার অন্তর্গত শাহরাস্তি উপজেলাধীন টামটা-দক্ষিণ ইউনিয়নের দোপল্লা গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে বসবাস করেন খুর্শিদা বেগম (৫০)।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

আর্থ সামাজিক অবস্থা: উক্ত গ্রামের সহিদুল্লার সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয় খুর্শিদা বেগম। তার স্বামী দিন-মজুরের কাজ করত। তার এক ছেলে ও দুই মেয়ে। আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগে তিনি স্বামীর বাড়ি থেকে পিত্রালয়ে চলে আসেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তার অজান্তে তার স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করে। এজন্য তিনি ০৩ সন্তান সহ পিত্রালয়ে চলে আসেন। বড় মেয়েকে খুব কষ্ট করে বিবাহ দিয়েছেন। তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন এবং বিভিন্ন সময় দিন-মজুরিরও কাজ করতেন। এভাবে কষ্ট করে দ্বিতীয় মেয়েকে বিবাহ দেওয়ার জন্য ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা জমা করেন। তার ছেলে একটি হোটেলে কাজ করে। সেখান থেকে তিনি দৈনিক ৩০০/- (তিনশত) টাকা হিসেবে পেয়ে থাকেন। খুর্শিদা বেগম খুব কষ্ট করে ছোট মেয়েটিকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করিয়েছেন।

বিরোধের বিবরণ: উক্ত ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা প্রায় আড়াই বৎসর পূর্বে অত্র ইউনিয়নের ০৩ নং ওয়ার্ডের রাজাপুরা গ্রামের মাহবুব আলম (৩২), পিতা- ফজুলল হক -এর নিকট দেন। শর্ত থাকে যে, বৎসর শেষে ১০ মন ধান সহ উক্ত টাকা ফেরত দিবেন। কিন্তু দেখতে দেখতে ২.৫ বৎসর অতিবাহিত হওয়ার পরও ১০ মন ধান দেওয়াতো দূরের কথা উক্ত ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা ফেরত দেওয়ার কোন কথাই নেই। বর্তমানে তিনি অসুস্থ্য। নিজস্ব কোন আয় নাই। তার ছেলের আয়ের উপর নির্ভরশীল। তার ছেলের মাসিক আয় প্রায় ৯,০০০/- (নয় হাজার) টাকা। এখন বর্তমানে ছেলে, ছেলের বউ, ছোট মেয়ে ও নিজে সহ ০৪ জনের সংসার। মামলা দায়ের এক মাস আগে মাহবুব আলমের নিকট টাকা চাহিতে গেলে সে কোন কথাই বলে না। তার বাড়িতে প্রায় ০৩ ঘন্টা বসে থেকে চলে আসেন।

গ্রাম আদালতে মামলা দায়েরের আগে বিচার প্রাপ্তির চেষ্টা: খুর্শিদা বেগম সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বারকে বিষয়টি জানালে তিনি কোন ধরণের সহযোগিতা করেন নাই। খুর্শিদা বেগম এই টাকার চিন্তায় আরও বেশী অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, মেয়ে বিবাহের উপযুক্ত, আমি টাকা দিয়ে কি সর্বনাশ করলাম, আমি মেয়েকে বিবাহ দিব কিভাবে। এই চিন্তায় তার খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ।

গ্রাম আদালতের ধারণা লাভ ও মামলা দায়ের: খুর্শিদা বেগমের বাড়ির পার্শ্বে গ্রাম পুলিশ সুকুর আলম ঘটনাটি জানতে পান। তিনি ইউনিয়ন পরিষদে মামলা দায়েরের পরামর্শ দেন। খুর্শিদা বেগম গত ১০.০৫.২০১৮ তারিখে ইউনিয়ন পরিষদে এসে মোঃ আরিফ হোসেন, গ্রাম আদালত সহকারী নিকট উক্ত ঘটনাটি বিস্তারিত বলেন এবং মামলা করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০ টাকা ফি দিয়ে একটি দেওয়ানী মামলা দায়ের করেন যার মামলা নং- ০০৯/২০১৮।

গ্রাম আদালত গঠন ও বিচার-প্রক্রিয়া: ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জহিরুল আলম ভূইয়া আবেদনকারীর আবেদনটি গ্রহণ করেন এবং ১০.০৫.২০১৮ তারিখে প্রতিবাদীর প্রতি সমন জারী করার নির্দেশ দেন। সমন পেয়ে প্রতিবাদী ১৬.০৫.২০১৮ তারিখে ইউনিয়ন পরিষদে এসে উপস্থিত হলে তাকে অভিযোগের বিষয়টি জানানো হয় এবং বিধি-৩১ -এর বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়। প্রতিবাদী তার দোষ স্বীকার করেননি। উক্ত তারিখে চেয়ারম্যান মহোদয় সদস্য মনোনয়ন ফরম ও নির্দেশনামা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আদালত সহকারীকে বলেন এবং ২৩.০৫.২০১৮ তারিখে মনোনীত সদস্যদের নাম দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেন। ২৩.০৫.২০১৮ তারিখের মধ্যে উভয়পক্ষ সদস্য মনোনয়নের নামগুলো দাখিল করেন যা নি¤œরূপ:

আবেদনকারীর পক্ষে: ১। মোসাম্মৎ হাসিনা বেগম, ইউপি সদস্য (১,২,৩), স্বামী- হাবিবুর রহমান, ২। মোঃ অলি উল্যা (গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি), পিতা- মুসলিম বেপারী।
প্রতিবাদীর পক্ষে: ১। মোঃ ইমরান হোসেন ইউপি সদস্য (৩), পিতা- মৃত আবুল খায়ের, ২। মোঃ হোসেন মিয়া (গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি), পিতা- মোঃ আবুল বাশার।

২৩.০৫.২০১৮ তারিখে গ্রাম আদালত গঠন করা হয় এবং মামলার নথি গ্রাম আদালতে প্রেরণ করা হয়। প্রতিবাদীকে লিখিত আপত্তি দাখিলের জন্য ২৭.০৫.২০১৮ তারিখ নির্দেশ দেন এবং ১ম শুনানি ০৬.০৬.২০১৮ তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সে মোতাবেক বিচার কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য চেয়ারম্যান মনোনীত সদস্যগনকে অনুরোধপত্র প্রেরণ করার নির্দেশ দেন। স্বাক্ষীর প্রতি সমন জারীর জন্য নির্দেশ প্রদান করেন এবং উভয়পক্ষকে মামলার স্লীপের মাধ্যমে বিচার কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য আদেশ প্রদান করেন।

মামলার শুনানী ও নিস্পত্তি: উক্ত ০৬.০৬.২০১৮ তারিখে বিচারকম-লী মামলার শুনানীতে বসেন এবং বিচার্য্য-বিষয় নির্ধারণ করেন। সে মোতাবেক আবেদনকারীর বক্তব্য প্রতিবাদীর বক্তব্য ও স্বাক্ষীর বক্তব্য শুনার পর তাদের জবানবন্ধী লিপিবদ্ধ করা হয়। চেয়ারম্যান মহোদয় প্রাক-বিচারের উদ্যোগ নিলে প্রতিবাদী আপোষ মিমাংসার প্রস্তাব দেন। তখন উভয় পক্ষের মধ্যে আপোষনামা সম্পাদনের নির্দেশ দেন। প্রতিবাদী ০৬.০৬.২০১৮ তারিখে সকলের উপস্থিতিতে ২০,০০০/- (বিশ হাজার) টাকা অত্র ইউনিয়ন পরিষদে জমা প্রদান করেন। বাকী ৩০,০০০/- (ত্রিশ হাজার) টাকা পরিশোধের জন্য প্রতিবাদী ০৩ (তিন) মাসের সময় চান। সে হিসেবে উক্ত ৩০,০০০ টাকা ১০.০৯.২০১৮ তারিখে প্রদান করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক যথা সময়ে উক্ত টাকা ইউনিয়ন পরিষদে এসে পরিশোধ করেন।

সেবা প্রাপ্তির সন্তোষটি: দাবীকৃত ৫০,০০০/- (পঞ্চাশ হাজার) টাকা ফেরত পেয়ে খুর্শিদা বেগম খুশি হয়ে বলেন, চেয়ারম্যান ভাল মানুষ, চেয়ারম্যান বাবা আমার টাকাটা নিয়ে দিছে, তার ভাল হউক। এ রকম সমস্যা অন্য কারো হলে আমি তাদের গ্রাম আদালতে আসতে বলুম। তিনি আরো বলেন, আমার যাতায়াত সহ মোট ২৫০/- টাকা খরচ হয়েছে। আর কোথাও কোন টাকা দেওয়া লাগে নাই। খুব তাড়াতাড়ি বিচার পাইছি আমি।

ক্ষতিপুরণ ও বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থা: উক্ত টাকা পেয়ে আশা ছিল মেয়েকে বিবাহ দিবে। কিন্তু খুর্শিদা বেগমের শারীরিক অবস্থা ভাল নয়। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সেখানে প্রায় ২০,০০০/- টাকার মত খরচ হয়ে গেছে। বাকী টাকাগ্রলো দিয়ে তিনি এখন বড় মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

প্রস্তুতকরণে:
– মোঃ আরিফ হোসেন, গ্রাম- আদালত সহকারী, টামটা-দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ, শাহরাস্তি, চাঁদপুর।
– মোহাম্মদ জহিরুল আলম ভূইয়া, চেয়ারম্যান, টামটা-দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ, শাহরাস্তি, চাঁদপুর।

 

আপডেট : বাংলাদেশ সময় : ৯:১৫ পিএম, ০৮ অক্টোবর ২০১৮  খ্রি.সোমবার

চাঁদপুর রিপোর্ট : এমআরআর

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন এবং শেয়ার করুন …

ফেসবুকে মন্তব্য করুন
483 জন পড়েছেন