জীবিত অবস্থায়ই টুকরো টুকরো করা হয় খাশোগিকে

0
34

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

২ অক্টোবর তুরস্কে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেটে ঢোকার পর থেকেই নিখোঁজ হন সৌদি সমালোচক হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক জামাল খাশোগি। তুরস্ক বলছে, কনস্যুলেট ভবনেই খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

একটি সূত্র দাবি করেছে, সৌদি সাংবাদিককে জীবিত অবস্থায় টুকরো টুকরো করা হয়। এরপরও তিনি সাত মিনিট বেঁচেছিলেন। অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।

সূত্রটি বলছে, গত ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর হত্যা করা হয় খাশোগিকে। এ সময় খাশোগির হাতে অ্যাপল ওয়াচের রেকর্ডিং চালু ছিল। মৃত্যুকালীন অ্যাপল ওয়াচের রেকর্ডকৃত কথোপকথন তাদের হাতে এসেছে।

বুধবার অজ্ঞাত ওই সূত্রের বরাত দিয়ে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল। সূত্রটি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্টআইকে কথোপকথন হাতে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

সূত্রটি বলছে, খাশোগিকে টেনেহিঁচড়ে কনসাল জেনারেলের অফিস থেকে পাশের রুমের একটি টেবিলের কাছে নেয়া হয় এবং সেখানেই তাকে টুকরো টুকরো করা হয়। অডিও রেকর্ডে খাশোগির চিৎকার শোনা গেছে। তার চিৎকার বন্ধ করতে শরীরে চেতনানাশক ওষুধের ইনজেকশন দেয়া হয় এবং এর কিছুক্ষণ পর তিনি নীরব হয়ে যান।

সূত্রটির দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নয়, বরং খাশোগিকে হত্যা করার জন্যই ঘাতকরা এখানে এসেছিল। যখন তাকে টুকরো টুকরো করে কাটা হচ্ছিল তখন তার চিৎকার কনস্যুলেটের নিচে থাকা ব্যক্তিরা শুনতে পেরেছেন। যারা ওই সময় ওই ভবনের আশপাশে ছিলেন তারাই বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

মঙ্গলবার তুর্কি পুলিশ বলেছিল, ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে খাশোগিকে হত্যা করা হয় এবং কেটে টুকরো টুকরো করা হয়। এ বিষয়ে তাদের যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ আছে। তুর্কি পুলিশের এ বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে অজ্ঞাত এ সূত্রটি এ দাবি করল।

একইদিন তুরস্তের একজন সরকারি কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, পুলিশ বিশ্বাস করে খাশোগিকে নির্মমভাবে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসও তাদের প্রতিবেদনে একই তথ্য দেয়।

তুরস্কে থাকা সৌদি কনস্যুলেট থেকে জামাল খোশেগির নিখোঁজ হওয়ার পর সবার সন্দেহের তির সৌদি আরবের দিকেই। তুরস্ক বলছে, খাশোগিকে কনস্যলুটের ভেতরেই হত্যা করার যথেষ্ট প্রমাণ তাদের হাতে আছে।

কনসল্যুটের ভেতরে খাশোগিকে হত্যার অভিযোগ জোড়ালোভাবে প্রত্যাখান করে আসছে সৌদি সরকার। যদিও আন্তর্জাতিক কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, খাশোগিকে হত্যার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। স্বীকারোক্তিমূলক ওই প্রতিবেদনে সৌদি আরব বলছে, জিজ্ঞাসাবাদের সময় মৃত্যু হয়েছে খাশোগির।

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, খাশোগির সঙ্গে কী ঘটেছে, তা একবার স্পষ্ট হলে বিশ্বকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কীভাবে যথাযথ উপায়ে প্রতিক্রিয়া জানাবে।

এদিকে খাসোগি নিখোঁজ ইস্যুতে সৌদি আরবে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক সম্মেলন বর্জন করার কথা ভাবছে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে ওই সম্মেলন থেকে কয়েকজন শীর্ষ ব্যবসায়ী ও মিডিয়া গ্রুপ তাদের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খাশোগির নিখোঁজের নেপথ্যে একদল দুর্বত্ত হত্যাকারীর কথা বলেন। তবে তার এ মন্তব্যের পেছনে কোনও প্রমাণ দেখাতে পারেন নি তিনি। এ ঘটনায় সৌদি বাদশাহ সালমানের সঙ্গে ট্রাম্পের এক টেলিফোন আলাপ হয়। ওই ফোনালাপে খাশোগির নিখোঁজের ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন সালমান।

সৌদি রাজপুত্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা ট্রাম্প এর আগে বলেছেন, খাসোগির মৃত্যুর জন্য সৌদি আরব দোষী প্রমাণিত হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা নেবে। তিনি জানান, এমন কিছু হলে তিনি খুবই মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হবেন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করছে, সৌদি রাজতন্ত্রের সমালোচনাকারীরা দেশের বাইরেও নিরাপদ নন।

এর আগে তুর্কি পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তারা ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেট ভবনে তদন্ত করতে যান। যেখান থেকেই নিখোঁজ হন রাজ পরিবারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত সৌদি সাংবাদিক জামাল খোশেগি।

এদিকে গত শুক্রবার পরিবারের বরাত দিয়ে তুরস্ক কর্তৃপক্ষ বলে, সৌদি কনস্যুলেট ভবনের ভেতরে খাসোগিকে হত্যার অডিও এবং ভিডিও প্রমাণ তারা পেয়েছে। তবে খাসোগির নিখোঁজের ঘটনায় নিজেদের কোনো সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও বহির্বিশ্বের জোরালো অবস্থানের কারণে বেশ চাপে রয়েছে কঠিন রক্ষণশীল সৌদি আরব।

উল্লেখ্য, ব্যক্তিগত কাগজপত্র আনার জন্য গত ২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেট ভবনে ঢোকেন সাংবাদিক জামাল খাসোগি। কিন্তু তিনি সেখান থেকে আর বেরিয়ে আসেননি। সৌদি রাজতন্ত্রের বিরোধিতাকারী খাশোগি ২০১৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা-নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিলেন। বিবাহ বিচ্ছেদের দলিল সংক্রান্ত কাজে তিনি তার হবু বউকে কনস্যুলেটের বাইরে রেখে ভেতরে প্রবেশ করেন।

খাশোগি নিখোঁজের বিষয়ে যা বললেন প্রিন্স সালমান

পুরো বিশ্ব যখন সাংবাদিক জামাল খাশোগির নিখোঁজের বিষয়ে উদ্বিগ্ন তখন সৌদির ক্রাউন প্রিন্স বলছেন তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। সৌদি প্রিন্সের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান তাকে জানিয়েছেন- সাংবাদিক জামাল খাশোগি নিখোঁজের বিষয়ে পূর্ণ তদন্ত চলছে এবং তার নিখোঁজের বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না।

বার্তা সংস্থাএপিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, ‘কোন কিছু প্রমাণ না হওয়ার আগে সৌদি আরবকে দোষারোপ করা হচ্ছে।

এদিকে তুরস্কের কর্মকর্তারা বলছেন, ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে অভিযান চালালে প্রমাণ পাওয়া যাবে যে খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে কিনা। দু’সপ্তাহ আগে তুরস্কে সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন সৌদির ভিন্ন মতাবলম্বী সাংবাদিক জামাল খাশোগি।

যদিও শুরু থেকে তুরস্ক দাবি করে আসছে যে, খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে। তবে সৌদি আরব এ অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করছে। খাশোগি নিখোঁজের পর ট্রাম্প প্রথমদিকে এ ঘটনাকে ভয়ঙ্কর ও বর্বর বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন বলছেন- সৌদি সাংবাদিক নিখোঁজের বিষয়ে পুরোপুরি না জানা পর্যন্ত দেশটির নেতাদের এ নিয়ে দোষারোপ করা উচিত নয় বিশ্ববাসীর।

যেভাবে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটের ভেতর জামাল খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে বলা হচ্ছে, তা যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। অনেক দেশেই নতুন করে দাবি উঠছে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে বিবেচনার, কেউ কেউ সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার কথাও ভাবছে।

সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি গত ২ অক্টোবর দুপুরের দিকে সৌদি দূতাবাসে যান। স্থানীয় সময় দেড়টার দিকে তার অ্যাপয়নমেন্ট ছিল। দূতাবাসের বাইরে ছিলেন তার তুর্কী বান্ধবী হাতিস চেঙ্গিস। খাশোগির অপেক্ষায় দূতাবাসের বাইরে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করেছিলেন হাতিস চেঙ্গিস।

খাশোগি নিখোঁজের পর থেকেই তাকে হত্যার যে দাবি জানায় তুরস্কের কর্তৃপক্ষ তা পুরো বিশ্বকে নাড়া দেয়। তথ্যপ্রমাণ হাজির না করতে পারলেও তুরস্কের এমন দাবির কারণে সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। মঙ্গলবার রাতে ট্রাম্প তার টুইট বার্তায় জানান প্রিন্স মোহাম্মদের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তুরস্কে সৌদি কনস্যুলেটে আসলে কী ঘটেছে সে বিষয়ে কোন কিছু জানার কথা তিনি জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। তার কথা শুনে মনে হয়েছে কোন দুর্বৃত্ত এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরো বলেন, তিনি আমাকে বলেছেন এ বিষয়ে পূর্ণ তদন্ত শুরু হয়েছে। আশা করি খুব শিগগিরই জানা যাবে আসলে কী ঘটেছে সেখানে। প্রিন্স মোহাম্মদের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ফোনালাপের বিষয়টি এমন সময় জানা গেল যখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সৌদি আরবে সফরে রয়েছেন। মঙ্গলবার তিনি সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে সাক্ষাতও করেছেন।

জামাল খাশোগির সৌদি কনস্যুলেটে নিখোঁজের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে এরই মধ্যে তল্লাশি হয়েছে। আরো ব্যাপক পরিসরে তল্লাশির উদ্যোগ নিচ্ছে তুরস্ক। সৌদি আরব সোমবার ঘটনাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।

আর যৌথ তদন্তের উদ্যোগ নেয়ার কারণে তদন্ত কাজ শেষ হতে আরো একটু সময় লাগতে পারে জানিয়েছেন তুরস্কের কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে তুরস্কের গণমাধ্যমে কিছু সিসিটিভি ফুটেজ প্রচারিত হয়েছে যাতে সাংবাদিক জামাল খাশোগির নিখোঁজ হওয়ার ষড়যন্ত্রের প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

ওই ভিডিওতে দেখানো হয়েছে, ইস্তাম্বুলের বিমান বন্দর দিয়ে কথিত সৌদি গোয়েন্দারা ঢুকছে এবং বের হয়ে যাচ্ছে।সিসিটিভির ভিডিওতে দেখানো হয়েছে, কতগুলো গাড়ি সৌদি কনস্যুলেটের ভেতর ঢুকছে। এর মধ্যে কালো রঙের একটি ভ্যান সম্পর্কে তুর্কী কর্তৃপক্ষ জানতে খুবই আগ্রহী ভিডিওতে। আরো দেখা গেছে একদল সৌদি নাগরিক ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর থেকে প্রবেশ করছে, হোটেলে চেক-ইন করছে এবং পরে তারা ইস্তাম্বুল ত্যাগ করেছে।

তুর্কী তদন্তকারীরা দু’টি সৌদি গাল্ফস্ট্রিম জেট বিমান সম্পর্কেও খোঁজখবর করছে। এই বিমান দুটি ২ অক্টোবর অবতরণ করেছিল। খাশোগি সেদিন থেকেই নিখোঁজ রয়েছেন। খাশোগির কনস্যুলেটে ঢোকার দৃশ্য সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। কিন্তু তার বেরিয়ে আসার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তুর্কী সংবাদপত্র সাবাহর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সৌদি গোয়েন্দা বাহিনীর ১৫ জন সদস্য ঐ সাংবাদিকের গুমের সাথে জড়িত বলে তারা জানতে পেরেছে। পুলিশ এখন প্রায় ১৫০টি সিসিটিভি ক্যামেরা পরীক্ষা করে দেখছে। তুরস্ক বলছে, তারা সৌদি কনস্যুলেটে তল্লাশি চালাবে। অন্যদিকে, সৌদি আরব বলছে যে কোন তদন্তের সাথে তারা সহযোগিতা করবে।

তুর্কী সরকার দাবি করছে, খাশোগি যে কনস্যুলেট থেকে বেরিয়ে গেছেন সৌদি সরকারকেই সেটা প্রমাণ করতে হবে। গত বছর আমেরিকায় স্বেচ্ছা নির্বাসনে যান জামাল খাশোগি। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রতি মাসে কলাম লিখতেন যেখানে তিনি সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান সম্পর্কে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন লিখেছেন।

আপডেট : বাংলাদেশ সময় : ১১:০১ এএম, ১৭ অক্টোবর ২০১৮  খ্রি.বুধবার

চাঁদপুর রিপোর্ট : এমআরআর

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন এবং শেয়ার করুন …

ফেসবুকে মন্তব্য করুন
363 জন পড়েছেন