ফরিদগঞ্জে গ্রাম আদালতের বিচারে ১০ টাকা ফি দিয়ে গরু ফিরে পেল খোরশেদ 

0
37

চাঁদপুর রিপোর্ট ডেস্ক :

চাঁদপুর জেলার অন্তর্গত ফরিদগঞ্জ উপজেলার গুপ্টি-পশ্চিম ইউনিয়নের খাজুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা মোঃ খোরশেদ আলম ভূঁইয়া (৫৫)। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তার মোট চার সদস্যের সংসার। তিনি তার পৈত্রিক বাড়িতে থাকেন। তিনি এলাকায় ফার্মেসী দিয়ে সংসার চালান। সংসার তার ভালোই চলে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

খোরশেদ আলম ভূঁইয়ার কাছে এলাকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “ভাই খুব দুঃখ-কষ্টে জীবন-যাপন করতেছি। যদি পারেন আমার জন্য কিছু একটা করেন।” তার দারিদ্রতার কথা চিন্তা করে খোরশেদ আলম বলেন, তোমাকে একটি গরু কিনে বর্গা দিলে পালতে পারবে? সে খুশিতে রাজি হয়ে যায় এবং ১৯,০০০/= (উনিশ হাজার টাকা) মূল্যে একটি গরু কিনে দেয়। কিন্তু কিছুদিন পর খোরশেদ আলম খবর পায় যে, রফিকুল ইসলাম গরুটি বিক্রি করে দিয়েছে। খোরশেদ আলম বার বার গরু ফেরত চাইলেও রফিকুল ইসলাম গরু ফেরত দিতে অস্বীকার করে। প্রতিবেশীকে উপকার করতে গিয়ে তিনি বিপদে পড়েন। এ নিয়ে খোরশেদ আলম এলাকায় অনেক শালিস-দরবারের দ্বারস্থ হয়েছেন কিন্তু তাতে কোন ফল হয়নি।

গ্রাম আদালতের ধারণা লাভ: বাংলাদেশ সরকার, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং ইউএনডিপি -এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (২য় পর্যায়) প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। গ্রাম আদালত আইন ২০০৬ (সংশোধন ২০১৩) বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ জনগোষ্ঠী স্বল্প সময়ে ও অতি অল্প খরচে ন্যায়-বিচার পাবেন। এলাকায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গ্রাম আদালত বিষয়ক উঠান-সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরূপ একটি উঠান-সভায় খোরশেদ আলম অংশগ্রহণ করেন। উক্ত উঠান-সভায় গ্রাম আদালত কি, গ্রাম আদালতের এখতিয়ার ও কোন কোন বিষয়ে গ্রাম আদালত বিচার করতে পারবে তা নিয়ে আলোচনা হয়। উঠান-সভার শেষে খোরশেদ আলম গ্রাম আদালত সহকারী সীমা রাণী দাসকে বলেন, “আপা, আমার এই ঘটনার কি কোনো বিচার পেতে পারি? আদালত সহকারী বলেন, এটি গ্রাম আদালতের এখতিয়ারভুক্ত একটি মামলা। আপনি চাইলে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে গ্রাম আদালতে মামলা দায়ের করতে পারেন।

গ্রাম আদালতে মামলা দায়ের: অতপর খোরশেদ আলম গুপ্টি-পশ্চিম ইউনিয়ন পরিষদে আসেন এবং গ্রাম আদালত সহকারীর সাথে আলোচনা করার পর গ্রাম আদালতে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আদালত সহকারীর সহায়তায় মাত্র ১০/= (দশ টাকা) ফিস দিয়ে তার ১৯,০০০/= (উনিশ হাজার টাকা) মূল্যের বর্গাকৃত গরু ফেরত পাওয়ার দাবিতে তিনি যথাক্রমে ১) রফিকুল ইসলাম ও ২) লিলু বেগমের বিরুদ্ধে ০৪/০৮/২০১৮ তারিখে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন।

মামলাটি আদালতের মামলা রেজিস্টারে ১৬/২০১৮ নং মামলা হিসেবে নথিভূক্ত করা হয়। ঐ দিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোঃ শরীফ গাজাী যথানিয়মে প্রতিবাদীগণের প্রতি সমন জারি করার আদেশ দেন। আদালত সহকারী গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে প্রতিবাদীগণের প্রতি সমন জারি করেন। সমন পাওয়ার পর ১১/০৮/২০১৮ তারিখে প্রতিবাদীগণ ও আবেদনকারী উভয়ই হাজির হন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোঃ শরীফ গাজী প্রতিবাদীগণকে আবেদনকারীর অভিযোগ সম্পর্কে অবহিত করলে প্রতিবাদীগণ তা অস্বীকার করায় পক্ষদ্ধয়কে আদালত গঠন করার জন্য সদস্য মনোনয়ন করার নির্দেশ দেন। গ্রাম আদালত সহকারী তাদেরকে সদস্য মনোনয়ন ফরম দিয়ে সদস্য মনোনয়নের বিষয়টি সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেন। ১৬/০৮/২০১৮ তারিখে আবেদনকারীর পক্ষে ১) মোঃ শাহ আলম কিরণ, ইউপি সদস্য, ২) মোঃ বজলুর রহমান, স্থানীয় ব্যক্তি এবং প্রতিবাদীর পক্ষে ১) মোঃ মাসুদ আলম, ইউপি সদস্য, ২) মোঃ কামরুল হাসান, স্থানীয় ব্যক্তিকে গ্রাম আদালতের বিচারক হিসেবে মনোনীত করেন। তারপর চেয়াম্যান মহোদয় ১৯/০৮/২০১৮ তারিখের মধ্যে প্রতিবাদীকে লিখিত আপত্তি ও ২২/০৮/২০১৮ তারিখে প্রথম শুনানীর জন্য দিন ধার্য্য করেন।

মামলার শুনানী: ২২/০৮/২০১৮ তারিখে উভয় পক্ষ ও গ্রাম আদালতের মনোনীত সদস্যগণ (বিচারকগণ) হাজির হন। উভয় পক্ষ তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এরপর আদালত কর্তৃক বিচারিক বিষয় নির্ধারণ হয় যে, মোঃ খোরশেদ আলম ভূঁইয়ার বর্গা দেওয়া গরুটি মোঃ রফিকুল ইসলাম বিক্রি করে দিয়েছেন। অতঃপর পক্ষদ্বয়কে প্রাক-বিচারের মাধ্যমে মামলা নিস্পত্তির বিষয়টি অবহিত করলে পক্ষদ্বয় সম্মতি জ্ঞাপন করেন।

মামলার রায়: ২৮/০৮/২০১৮ তারিখে পক্ষদ্বয় আপোষনামা জমা দেওয়ায় আপোষনামার শর্ত অনুযায়ী গ্রাম আদালত রায় প্রদান করে যে, প্রতিবাদী আবেদনকারীকে ০১/০৯/২০১৮ তারিখের মধ্যে গরু ফেরত দিবেন এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এ ধরণের কাজ করবেন না। উপকারীর অপকার করবেন না।

বাস্তবায়ন: আদালতের রায় অনুযায়ী গত ০১/০৯/২০১৮ তারিখে প্রতিবাদী রফিকুল ইসলাম আবেদনকারী খোরশেদ আলম ভূঁইয়াকে তার ১৯,০০০/= টাকা মূল্যের বর্গাকৃত গরুটি সসম্মানে ফেরত দেন। মাত্র ১০ টাকা মামলা ফি প্রদান সাপেক্ষে ৬ দিনের মধ্যে বিচার-কার্য সম্পন্ন হয় এবং ৪ দিনের মধ্যে আদালতের রায় বাস্তবায়ন করা হয়।

আবেদনকারীর অভিব্যক্তি: মামলার রায় পেয়ে আবেদনকারী খুবই সন্তুষ্ট হন। তিনি বলেন, “ইউনিয়ন পর্যায়ে সঠিক বিচার পাওয়ার নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল হচ্ছে গ্রাম আদালত। আমি সাধারণ মানুষ হিসেবে হয়রানিমুক্ত সঠিক বিচার পাওয়ায় গ্রাম আদালতের কথা আমি কখনো ভুলব না। আমি আপনাদের প্রতিও কৃতজ্ঞ।”

আপডেট : বাংলাদেশ সময় :১১:০১ এএম, ১২ নভেম্বর ২০১৮ খ্রি.সোমবার

চাঁদপুর রিপোর্ট : এমআরআর

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন এবং শেয়ার করুন …

ফেসবুকে মন্তব্য করুন
397 জন পড়েছেন