bnp logo

যে কারণে নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি হলো

মিজানুর রহমান রানা :

সদ্য সমাপ্ত হলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মহাজোট পেয়েছে ২৫৭টি আসন। বিএনপি পেয়েছে মাত্র ৫টি আসন। লাঙ্গল প্রতীকে জাতীয় পার্টি পেয়েছে ২২টি আসন।

এছাড়াও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পাটি (বাসদ) পেয়েছে ৩টি আসন, গণফোরাম ২টি (এর মধ্যে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মোহাম্মদ মনসুর এবং গণফোরাম নিজস্ব প্রতীক উদীয়মান সূর্য নিয়ে মোকাব্বির খান নির্বাচিত হয়েছেন), বিকল্প ধারা বাংলাদেশ ২টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ২টি, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ১টি, জাতীয় পার্টি (জেপি) ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৩টি আসনে জয়ী হয়েছেন।

ভেবে দেখার বিষয় এক সময়ের শক্তিশালী বিএনপি কেন এইবারের সংসদ নির্বাচনে এভাবে ভরাডুবি হলো! নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে সেই বিষয়গুলো আলোচনা করছি।

এক. বিএনপির প্রধান সারির নেতাদের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা : বিএনপির প্রধানসারির রাজনৈতিক নেতাদের অদূরদর্শী চিন্তাভাবনা ও কার্যকলাপের ফলে তাদের এই ভরাডুবি। এর মধ্যে গত সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙ্গে গেছে। ওই সময় থেকেই নেতাকর্মীরা সঠিক দিক নির্দেশনা পায়নি। ফলে নেতাকর্মীদের মনে এক ধরনের হতাশা দেখা দেয়।

দুই. অন্তকলহ ও অন্তকোন্দল : সারাদেশে নেতাকর্মীদের মনে রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে এক ধরনের অন্তকলহ ও অন্তকোন্দল তৈরি হয়। এটা নিরসনে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতাগণ তেমন কোনো ফলপ্রসূ চিন্তাভাবনা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেননি। যেমন- এক জায়গায় একজন নেতা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতি করছেন, মাঠেঘাটে শ্রম দিয়েছেন বিএনপির জন্য। কিন্তু দেখা গেল নমিনেশন পেয়েছেন অন্যজন, যিনি হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন। সেই নেতা টাকার দাপটে ধরাকে সরাজ্ঞান করেছেন। ফলে নেতাকর্মীরা তাদেরকে ভালো চোখে দেখেনি এবং তার আহবানে মাঠে নেমে কাজও করেনি।

তিন. মনোনয়ন বাণিজ্য : খালেদা জিয়ার কারাগারে থাকার সুবাদে লন্ডনে বসে তারেক জিয়া এবং বাংলাদেশে বসে মির্জা ফখরুল টাকার বিনিময়ে এমন এমন নেতাদের নমিনেশন দিয়েছেন, যাদের এলাকায় কোনো শক্ত রাজনৈতিক ভীত নেই। দলীয় নেতাকর্মীরা তাদেরকে বর্জন করেছেন। ফলে বিএনপির ভরাডুবি সম্পন্ন হয়েছে অনেক আগেই।

চার. আন্দোলন ও গণসমর্থনে ব্যর্থ : গত সংসদ নির্বাচনে থেকে এ পর্যন্ত বিএনপি দেশের সমস্যা ও সঙ্কট নিরসনে প্রকৃতভাবে কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে গণ আন্দোলন তৈরি করতে পারেনি। ফলে বিএনপি নেতৃত্বের প্রতি সাধারণ মানুসের তেমন একটা রাজনৈতিক সমর্থনও গঠে উঠেনি।

পাঁচ : খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার সাজা : বিভিন্ন কারণে খালেদা জিয়ার দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ায় বিএনপি নেতৃত্বকে খালেদা জিয়ার মামলা সংক্রান্ত কাজেই বেশিরভাগ মনোনিবেশ করে সময় নষ্ট করতে হয়েছে। তেমনিভাবে তাদের নেতৃত্বের কারাবরণ উপলক্ষে দেশে কোনো আন্দোলন ও ইস্যুও বিএনপি নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেনি। ফলে বিএনপির প্রধান নেতৃত্বের কারাবরণে দলীয় নেতাকর্মীদের মনে এক ধরনের ভীতি কাজ করেছে। এই ভীতির কারণে বিএনপি নেতাকর্মীরা অনেকটা মাঝি ও পালহারা নৌকার মতোই দোদুল্যমান থেকেছে। না পারছে সামনে এগিয়ে যেতে, না পারছে লুকিয়ে থাকতে। ফলে বিএনপি নেতৃত্বহীন হয়ে দুর্বল হয়ে গেছে।

ছয় : তারেক জিয়ার দুর্নীতি, খামখেয়ালীপনা কাজকারবার : তারেক জিয়া দেশে থাকতে দুর্নীতির শীর্যে ছিলেন। তিনি দুর্নীতিবাজ, চাটুকারদেরকেই প্রশ্রয় ও লালন পালন করতেন। সঠিক সূত্র থেকেই জানা গেছে, তারেক জিয়ার কাছে টাকা দিয়ে অনেকেরই চাকরিবাকরি বিভিন্ন কাজকরবার হাসিল হতো। তিনি লন্ডনে বসেও এমন কিছু কর্মকাণ্ড করেছেন, যা তার জন্যে হিতে বিপরীত হয়েছে। এছাড়াও চলতি নির্বাচনে খামখেয়ালীভাবে তিনি যাকে খুশি থাকে মনোনয়ন দান করে দলের বারোটা বাজিয়েছেন।

সাত. জামায়াত সংশ্লিষ্টতা : বিএনপির জামায়াতের সংশ্লিষ্টতাকে বেশিরভাগ মানুষই ত্যাক্ত বিরক্ত চোখে দেখেছে। জামায়াত সংশ্লিষ্টতার ফলে বিএনপির এমন কিছু ক্ষতি হয়েছে, যা বিএনপি খালি চোখে দেখতেই পায়নি। ফলে দলটি বেশিরভাগ মানুষের কাছে অপাংক্তেয় হয়ে গেছে।

আট. জামায়াত নেতাদের ফাঁসি ও দলের নিবন্ধন বাতিল : একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অপরাধে জামায়াত নেতাদের ফাঁসি এবং পরবর্তীদের জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় জামায়াত যেমন কোণঠাসা হয়েছে ঠিক তেমনি জামায়াতের ভাইরাসও বিএনপিকে আছর করেছে। ফলে বিএনপির কার্যকলাপ সীমিত হয়েছে।

নয়. শেখ হাসিনার দূরদর্শী চিন্তা ও উন্নয়ন : শেখ হাসিনা গত তিনবার ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের জন্য এমন  কিছু কাজ করেছেন, দেশের উন্নয়নে যেসব পরিকল্পনা করেছেন, সর্বোপরি বাংলাদেশে যে ডিজিটাল সেবা দিয়েছেন, তাতে স্কুল-কলেজ অফিস-আদালত এবং সবক্ষেত্রেই এর প্রতিফলন ঘটায় বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণ-যুবকরা শেখ হাসিনার এই উন্নয়নের প্রতিফলন আগ্রহী হয়ে আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থাবান হয়েছে। এবং এতে আওয়ামী লীগ অনেক অনেক এগিয়ে গেছে, যেখানে  বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে।

দশ. বিএনপির ভবিষ্যত নেতৃত্ব তৈরির অভাব : বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতাদের অগোছালো কাজ ও সুচিন্তার অভাব দলটিকে এলোমেলো পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বিএনপি নেতৃত্ব দল গোছাতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্দোলনের ইস্যু তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি কমে গেছে। এছাড়াও ঐক্যফ্রন্ট যাদের নিয়ে করা হয়েছে- যেমন কামাল, মান্না এসব ভন্ড রাজনীতিবিদদের মুখোশ ও কার্যকলাপ দেখে সাধারণ মানুষ ঐক্যফ্রন্টের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। ফলে বিএনপির বাঘা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সারাদেশে প্রচুর নেতাকর্মী সরাসরি আওয়ামী লীগে যোগদান করেছে এবং আওয়ামী লীগের শক্তি বাড়িয়েছে।

এখন ভেবে দেখার বিষয়, বিএনপি কি নিভু নিভু বাতির মতো জ্বলতে জ্বলতে নিঃশেষ হয়ে যাবে, নাকি তারা এসব দুর্বলতা কাটিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো ধ্সংসস্তূপের ভেতর থেকে আবারও জ্বলে উঠবে।

মিজানুর রহমান রানা, সংবাদকর্মী ও লেখক।

ইমেইল : [email protected]

815 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন