‘এই পাগল-ছাগলের বাচ্চা, তোরে যে কইছি তুই শুনছ নাই’

0
178

ভিকারুননিসার শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ!

বিশেষ সংবাদদাতা  :

‘এই পাগল-ছাগলের বাচ্চা, তোরে যে কইছি তুই শুনছ নাই’- উক্তিটি রাজধানীর খ্যাতনামা ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন শিক্ষিকার। সম্প্রতি ক্লাসে অমনোযোগী হয়ে নোট তুলতে না পারায় দ্বিতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি এ উক্তি করেন। শিক্ষিকার এমন আচরণে ওই ছাত্রী বাসায় গিয়ে ওই ম্যাডামের ক্লাসে যাবে না বলে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। পরে অভিভাবক অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে ক্লাসে পাঠান তাকে।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ওই অভিভাবক বলেন, ‘খুব শখ করে মেয়েকে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু পড়াশুনার ব্যাপক চাপ ও কিছু কিছু শিক্ষিকার দুর্ব্যবহারের কারণে ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি অবস্থা।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক জানান, ‘এ স্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় ছেলেমেয়েরা পাস করলেও ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে দুই থেকে তিন লাখ টাকা উৎকোচ নেয়া হয় ভর্তির জন্য। না দিলে ভর্তি হতে দেয়া হয় না। নামীদামী এ প্রতিষ্ঠানে অভিভাবকরা পড়ালেখা করতে এ টাকাগুলো কষ্ট করে হলেও দিয়ে থাকেন।’

 এ অভিভাবকের অভিযোগ, পরীক্ষার প্রশ্ন যে পদ্ধতিতে আসে সে পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষে পড়ানো হয় না। সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে প্রশ্ন করা হয়। এ অভিভাবকের মতো খ্যাতনামা এ স্কুলটির বিভিন্ন শাখার শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে অভিভাবকদের।

অপমান সইতে না পেরে স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রির আত্মহত্যার পর স্কুলটির শিক্ষিকাদের দুর্ব্যবহারের ব্যাপারে অভিভাবকদের অনেকে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তবে তারা কেউই পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

অভিভাবকদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, স্কুলটিতে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকেই শিক্ষিকারা ছাত্রীদেরকে তাদের কাছে কোচিং করার জন্য প্রলুব্ধ করেন। তৃতীয় শ্রেণি থেকে তা তীব্র আকার ধারণ করে। জনশ্রুতি রয়েছে, তৃতীয় শ্রেণিতে উঠে একাধিক শিক্ষিকার কাছে কোচিং না করলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় নম্বর কম দেয়া হয়। ক্লাসে না পড়িয়ে কোচিং-এ সাজেশন দেয়া হয়। যারা কোচিং করে তারা ভালো ফলাফল করে। ফলে অভিভাবকরা অনেকটা বাধ্য হয়েই সন্তানদের কোচিং-এ দেন।

তৃতীয় শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থী জানায়, স্কুলের বোর্ডে শিক্ষিকার লেখা বুঝতে না পেরে কখনও প্রশ্ন করলে শিক্ষিকা তখন রেগে গিয়ে বলেন-‘চোখে দেখিস না, আজই চোখের ডাক্তার দেখাবি। বেয়াদব কোথাকার।’

এ স্কুল থেকে পাস করে গেছে-এমন এক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, ‘এ স্কুলে বড় মেয়েকে পড়াতে গিয়ে পড়াশুনা কাকে বলে হাড়েহাড়ে টের পেয়েছি। তাই সুযোগ থাকলেও ছোট মেয়েকে এই স্কুলে ভর্তি না করিয়ে সরকারি একটি স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস মঙ্গলবার বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা জিজ্ঞেস করলে শিক্ষক উত্তর না দিয়ে তাকে থামিয়ে দেবে-এমন কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। আমাদের শিক্ষকরা ঠিকমতোই ক্লাস নেন।’

কোচিং প্রসেঙ্গ তিনি বলেন, কোচিংয়ে উৎসাহী করার প্রশ্নই ওঠে না। অধ্যক্ষের দাবি, ভিকারুননিসার শতকরা পাঁচভাগ শিক্ষকও কোচিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তবে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

রাস্তায় ভিকারুননিসার মেয়েরা

বাবা-মা’কে অপমান করে শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়ায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসের পদত্যাগের দাবিতে বেইলি রোডের সড়কে বসেছে শিক্ষার্থীরা। অরিত্রিকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিচার চেয়েছে তারা।

মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড নিয়ে তারা বিক্ষোভ করছে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত স্কুলের বাইরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিক্ষোভ চলছিল।

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশরাত সুবর্ণ বলে, আমরা ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। অধ্যক্ষের খামখেয়ালির কারণেই মরতে হয়েছে অরিত্রিকে, আমরা তার পদত্যাগ চাই।

আন্দোলনে অংশ নেয়া দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘এটি একটি দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনা। স্কুল কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালির কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষার্থী যদি নকল করে থাকে সেজন্য সে ক্ষমা চেয়েছে। পা ধরেও ক্ষমা চেয়েছে। তারা তাকে মাফ না বরং তার বাবা-মা’কে অপমান করেছে, তাকে টিসি (বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র) দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষ সাধারণভাবে নিতে পারত, অরিত্রিকে বহিষ্কার কিংবা অন্য শাস্তি দিতে পারত। আমরা এটাকে হত্যা বলতে চাই। জড়িতদের বিচার চাই।’

সোমবার (৩ ডিসেম্বর) দুপুরে রাজধানীর শান্তিনগরের নিজ বাসায় ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেয় অরিত্রি। মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

অরিত্রির আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে তারা বাবা দিলীপ অধিকারী বলেন, ‘অরিত্রির স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল। রোববার (২ ডিসেম্বর) সমাজবিজ্ঞান পরীক্ষা চলার সময় তার কাছে একটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। এজন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের ডেকে পাঠায়। সোমবার স্কুলে গেলে স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের জানায়, অরিত্রি মোবাইল ফোনে নকল করছিল, তাই তাকে বহিষ্কারের (টিসি) সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্কুল কর্তৃপক্ষ মেয়ের সামনে আমাকে অনেক অপমান করে। এই অপমান এবং পরীক্ষা আর দিতে না পারার মানসিক আঘাত সইতে না পেরে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বাসায় ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেয় অরিত্রি।’

আপডেট : বাংলাদেশ সময় :০১:১১ পিএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮ খ্রি. মঙ্গলবার

চাঁদপুর রিপোর্ট : এমআরআর

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ফেইসবুক পেইজে লাইক দিন এবং শেয়ার করুন …

ফেসবুকে মন্তব্য করুন
398 জন পড়েছেন