২৬ মার্চ : প্রজন্মের উপলব্ধি

0
20

মিজানুর রহমান রানা :

‘স্বাধীনতা’ সে তো জাতির জন্যে এক মহাজাগরণের দিন, আনন্দ-বেদনার দিন, গোলাপের পাপড়ি ফোটানোর দিন। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির সাথে জড়িয়ে আছে স্বামীহারা বোনের আর্তচিৎকার, সন্তানহারা মায়ের বেদনাময় হৃদয়ের করুণ আহাজারি, ৩০ লক্ষ শহীদের পবিত্র রক্তের স্রোতধারা আর স্বজনের লাশের স্তূপে গড়া একটি দিন। পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক নামের শোষকচক্রের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, এ দিনটিতেই শুরু হয়েছিলো বাঙালি জাতির বুকের রক্তাক্ষরে লেখা সুমহান মুক্তির সংগ্রাম।

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

জাতির গর্বিত সন্তানদের বুকের তাজা রক্তদানে আজ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আজ বিশ্বের মাঝে সগৌরবে মাথা উঁচু করে অবস্থান করছে। আর আমরা এদেশের অধিবাসীরা মুক্তভাবে চলাফেরা করছি। কিন্তু একদিন বাংলাদেশ এমন স্বাধীন ও সার্বভৌম ছিলো না, ছিলো পরাধীনতার লৌহকঠিন জিঞ্জিরাবদ্ধ। এদেশের মানুষদের গোলামীর জিঞ্জির পরানো হয়েছিলো ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে ক‚টকৌশলে পরাজিত, বন্দী ও হত্যার পর। অর্থ ও ক্ষমতালোভী এদেশীয় মীরজাফর, ঘসেটি বেগম চক্র ব্রিটিশ বেনিয়াদের সাথে ষড়যন্ত্রের সুতী² জাল বোনার ফলে বাংলার আকাশে নেমে আসে সুদূরপ্রসারী মহাদুর্যোগের এক বিশাল অপছায়া। বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশে ক্ষমতাসীন হয় পরধনলোভী বিদেশী ষড়যন্ত্রকারী কুটিল মস্তিস্কসম্পন্ন এক ঔপনিবেশিক স¤প্রদায়।

এই স¤প্রদায়ের মাধ্যমে সারাবিশ্বে অনেক দেশেই চলছিলো সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার, বঞ্চনার স্টিমরোলার। তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশেও তারা ক‚টকৌশলের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে শুরু করে নির্মম শোষণ, বঞ্চনার করুণ এক অধ্যায়। এরই মধ্যে এই ব্রিটিশ শক্তি তাদের পদলেহনকারী এক শ্রেণীর জোতদার, জমিদারদের সৃষ্টি করে গরীব প্রজাদেরকে আরো নিবিড়ভাবে শোষণ করার জন্যে। জমিদারগণ নি®প্রাণ গরীব প্রজাদের চাবুকের কষাঘাতে জর্জরিত করে ষোলকলা পরিপূর্ণ করে সুদে-আসলে উসুল করে তা’ থেকে বখরা দিতো তাদের প্রভু ব্রিটিশদের। এভাবেই চলছিলো ব্রিটিশ ও বাংলার জমিদার, জোতদারদের নবাবী জীবন। তাদের লাঞ্ছনা-বঞ্চনায় অতিষ্ঠ হয়ে সাধারণ মানুষ ক্রমে ক্রমে নির্যাতিত, নিষ্পেষিত হতে হতে পৌঁছে যায় সহ্যের এক চরম সীমানায়। তখন থেকেই শুরু হয় লাঞ্ছনা-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সাধারণ গণমানুষের সংগ্রাম-আন্দোলন। ইতিহাসে সেসব আন্দোলনের নায়কদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যতম।

ইংরেজরা প্রায় দু’শ বছর এদেশ শাসন ও শোষণ করার পর বাংলার মানুষের তীব্র সংগ্রাম-আন্দোলনে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট শেষ পর্যন্ত তারা তল্পিতল্পা গুটিয়ে নেয়। যাবার সময় ক‚টচাল দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশকে এমনভাবে দু’টি ডোমেনিয়নের ভিত্তিতে ভাগ করে দিয়ে যায়, যাতে নিহিত ছিলো বিভেদে ও বঞ্চনার করুণ এক বিষবাষ্প। ভারতীয় উপমহাদেশ দু’টি ভাগ হওয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তানীরা পদে পদে পূর্ববঙ্গ তথা বাঙালিদের অবহেলা, নির্যাতন, নিষ্পেষণ, শোষণ শুরু করে। এদেশের ধন-সম্পদ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে গড়ে তুলতো শিল্প-কারখানা। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষরা হতো পদে পদে বঞ্চিত। ক্রমান্বয়ে পূর্ববঙ্গের সঙ্গে তাদের বিভেদের দেয়াল প্রকট হয়ে ওঠে। জাতির এ দুর্যোগঘন সময়ে কঠিন মনোবল, সাহস ও উদ্দীপনায় সংগ্রামী মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এলেন বাংলার মুক্তিদূত জাতির মহান কর্ণধার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতিকে পশ্চিম পাকিস্তানীদের নাগপাশ ও অক্টোপাশের বন্ধনমুক্ত করার জন্যে, বাঙালি সমাজে তাঁর আদর্শের দর্শনে জাতীয় মুক্তি ও বিপ্লব সাধনে তাঁর সংগ্রাম, দুর্লভ ত্যাগ-তিতিক্ষা চিরদিন ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে থাকবে।

৭ মার্চ ১৯৭১ সনে রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতির জনকের অমর কাব্যে বর্ণিত সুমহান ঘোষণাটি এসেছিলো। তবে সরাসরি নয়, একটু অন্যভাবে। কারণ তিনি যদি ওই ময়দানে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করতেন তাহলে সেদিন পাকিস্তানী পুলিশ-হায়েনা বাহিনী কর্তৃক লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তের স্রোত বয়ে যেত সেখানেই। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অপেক্ষমান সময় সম্পর্কে কবি নির্মলেন্দু গুণ বর্ণনা করেন,
“একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা ব’সে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতেÑ
‘কখন আসবে কবি?’ ‘কখন আসবে কবি?”
বঙ্গবন্ধু ধীরপদক্ষেপে মঞ্চে এলেন। তারপর তিনি ঘোষণা করলেন বাঙালি জাতির মুক্তির সুমহান বাণী। নির্মলেন্দু গুণ আরো বলেন,
“শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা,
জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা-
কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চে কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি ঃ
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
সেই থেকে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আমাদের।”

সত্যিকার অর্থে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর হতে পূর্ববঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা। বাঙালি জাতি ভাষা সৈনিকদের বুকের রক্তক্ষরণের মাধ্যমে সর্বপ্রথম ভাষার বিজয় অর্জন করে। ক্রমান্বয়ে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে এসে তা’ চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। তৎকালীন অথর্ব পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের বঞ্চনা, কুশাসন ও শোষণ বাঙালি জাতিকে জর্জরিত করেছিলো। ৭ মার্চ ১৯৭১, বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের জনসমুদ্র থেকে ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” ঐতিহাসিক এই ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে শৃঙ্খলমুক্তির আহŸান জানিয়ে ঘোষণা করেন, “রক্ত যখন দিয়েছি আরো রক্ত দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল­াহ্। ……..যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্র“র মোকাবেলা করতে হবে। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।” বঙ্গবন্ধু সারাদেশে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। শুরু হলো সর্বাত্মক অসহযোগ।

১৫ মার্চ ঢাকায় ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক শুরু হয়। আলোচনার জন্যে ভুট্টো আসেন ঢাকায়। ২৫ মার্চ কোনো ঘোষণা ছাড়াই সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করেন। ২৫ মার্চ মাঝরাতে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে হায়েনার মতো। আক্রমণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা রাইফেল সদর দফতর ও রাজারবাগ পুলিশ হেড কোয়ার্টার। বঙ্গবন্ধু মধ্যরাতের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্যে বাংলার সর্বস্তরের মানুষকে আহŸান জানান। বঙ্গবন্ধুর এই আহŸান বেতার মারফত তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ ব্যবস্থায় সারাদেশে পাঠানো হয়। রাতেই বার্তা পেয়ে চট্টগ্রাম, কুমিল­া ও যশোর সেনানিবাসে বাঙালি জওয়ান ও অফিসাররা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাকিস্তানী বাহিনী রাত ১:১০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে ধানমণ্ডির ৩২ নং বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যায়। এরপর বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।

২৬ মার্চ চট্টগ্রাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম. এ. হান্নান বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাঠ করেন। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এ ঘোষণা। কিন্তু বাঙালি সৈনিকরা এ ঘোষণায় আশ্বস্ত হতে পারেনি। তারা ছিলো দ্বিধাগ্রস্ত ও হতভম্ব। তাই তারা ভাবলেন, সেনাবাহিনীর একজন মেজর বা উচ্চ পদের লোক দিয়ে যদি বঙ্গবন্ধুর তরফ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া যায়, তাহলে বাঙালি সৈনিকরা দ্বিধা-দ্ব›দ্ব ভুলে সঠিক পথের দিশা খুঁজে পাবে। ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানকে দিয়ে তাই বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে পাঠ করানো হলো অনুরূপ একটি ঘোষণা। (তথ্যসূত্র: বঙ্গবন্ধু হত্যার দলিল, ২৭২ পৃষ্ঠা)।

২৫ মার্চ গভীর রাতে পাক হানাদারগণ কর্তৃক বাঙালি হত্যাযজ্ঞ, বর্বরতা, ধর্ষণ এতই নিষ্ঠুর ছিলো যে, তা’ মানব সভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় বলে আজ খ্যাত। ২৬ মার্চ যখন বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এম. এ. হান্নান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তখন জনতার হাতে কোনো অস্ত্র ছিলো না। কিন্তু দেশপ্রেমিক বাঙালি জাতি মাতৃভুমির স্বাধীনতার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক-হানাদার বাহিনীর ওপর। দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তি সংগ্রামে ৩০ লক্ষ প্রাণ বিসর্জন ও হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বিজয় অর্জন করে মুক্তিপাগল বাঙালি জাতি। মূলতঃ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার পর পরই আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে স্বাধীন বাঙালি জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি বিশ্বের মানচিত্রে। ২৬ মার্চকে আমরা তাই মহান স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করি। বাঙালি জাতীয় জীবনে এ এক অত্যন্ত মর্যাদাশীল ও গুরুত্বপূর্ণ দিন।

নব প্রজন্ম, যারা ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘মুক্তিযুদ্ধ’, ‘সংগ্রাম’, ‘স্বাধীনতা’, ‘বিজয়’ ইত্যাদি শুব্দগুলো কানে শুনেছে কিন্তু এসব চিরসত্য ইতিহাস চোখে দেখেনি তারা আজ এ সম্পর্কে সত্যের দ্বার উদ্ঘাটন করতে শুরু করেছে। কারণ, যারা ১৯৭১-এর পরবর্তী প্রজন্ম, তারা জন্মাবধি শুধু সত্য-মিথ্যে জড়ানো সংলাপ শুনেছে। কোন্টা সত্য, কোন্টা মিথ্যে তা’ বুঝতে যথেষ্ঠ বেগ পেতে হয়েছে। আবেগের বশবর্তী হয়ে কখনো এদিক কখনো ওদিক সমর্থন করে। কিন্তু জীবনের এক পর্যায়ে এসে আসল সত্যকে জানার জন্যে উদগ্রীব হয়। জানতে চায় এ জাতির জন্যে বুকের তাজা রক্তে রাঙ্গিয়ে কে লিখেছে ‘সোনার বাংলা’। কে সেই মহান মানুষ? এক সময় আবিষ্কার করে সে আর কেউ নয়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমাদের অতি আপনজন, বাঙালি জাতির স্থপতি।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদ, চাঁদপুর জেলা শাখা।

ফেসবুকে মন্তব্য করুন
165 জন পড়েছেন