738

চাঁদপুরে গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে উধাও এনজিও ‘‘অগ্রগতি সংস্থা’’ ॥ বিপাকে এলাকার নিরীহ জনগন

মোঃ কামরুজ্জামান সেন্টু :
চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে গ্রাহকদের কোটি টাকা নিয়ে রাতের আঁধারে উধাও হয়েছে অগ্রগতি নামে এক এনজিও সংস্থা। স্বল্প সময়ে নিজেদের ভীত গেঁড়ে এলাকার সহজ-সরল লোকদের ঋণ দেয়ার নামে প্রতারণা ফাঁদে ফেলে এ অর্থ হাতিয়ে নেয়। এতে বিপাকে পড়েছে এলাকার সাধারণ নিরীহ জনগন।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের শুরুতে পৌর শহরের ঠাকুর বাজার-নাওড়া সড়কের পাটওয়ারী বাড়ির সম্মুখে জনৈক এনায়েত হোসেনের বাড়িতে ভাড়ায় অগ্রগতি সংস্থা নামে এনজিওটি তাদের কার্যক্রমের পদযাত্রা শুরু করে। এরই মধ্যে ওই সংস্থায় কিছু সংখ্যক জনবল নিয়োগ করা হবে মর্মে একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বিভিন্ন স্থানে লিফলেট আকারে সাঁটিয়ে দেয়া হয়। ওই সুবাদে স্থানীয় কিছু সংখ্যক লোক তাদের সংস্থায় নিয়োগ আবেদন করেন এবং বেশ কয়েকটি পদে স্থানীয়দের জামানতের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়।

ইতোমধ্যে সংস্থার নিজস্ব কিছু কর্মী বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সাধারণ নিরীহ মানুষদের প্রলোভনে ফেলে ঋণ দেয়ার কথা বলে জামানতের টাকা উত্তোলন করতে থাকে। শিঘ্রই সংস্থার কার্যক্রম শুরু করা হবে মর্মে প্রচার করলেও হঠাৎ করে গত ১১ ডিসেম্বর রাতের আঁধারে ওই সংস্থার কর্মরত লোকজন পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার সংবাদে আশপাশের গ্রামের লোকজন এনজিওটিতে ভীড় জমায়। স্থানীয়দের রোষানলে পড়ে কোন জবাব দিতে না পারায় বিষয়টি বাড়ি মালিক থানাকে অবহিত করেন। ওই সুবাদে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সৈকত দাস গুপ্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শণ করেন এবং স্থানীয়দের ধৈর্য্য ধারণ করার অনুরোধ করেন। এদিকে ক্ষতিগ্রস্থ বেশ কয়েকজন গ্রাহক ঘটনার বিবরণ জানিয়ে আইনী সহযোগিতা কামনা করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

বাড়ির মালিক এনায়েত হোসেন জানান, আমি ও আমার ভায়রা জাকির হোসেন যৌথভাবে এ ভবনটি নির্মাণ করি। গত নভেম্বর মাসের শেষের দিকে অগ্রগতি সংস্থা নামে একটি এনজিও তাদের অফিস ভাড়ার জন্য আসেন এবং ভাড়া নেয়ার বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানান। ওই ভাড়াটিয়া চুক্তিনামায় সংস্থার এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে লক্ষ্মিপুর জেলার ভবানীগঞ্জ গ্রামের বশির উল্যাহ’র পুত্র মোঃ হানিফ স্বাক্ষর করেন। ওই সুবাদে ডিসেম্বরের শুরুতে সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা তাদের অফিস গোছানোর কাজ ও মাঠ পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় শুরু করেন।

তিনি আরো জানান, সংস্থাটি গ্রাহকদের ঋণ দেয়ার পূর্বেই প্রতি লাখে ১০ হাজার টাকা করে জামানত বাবদ উত্তোলন করে নিচ্ছে। তাছাড়া আমরা অগ্রগতি সংস্থাকে প্রতি মাসে ২২ হাজার টাকা ভাড়া ধার্য্য করে ভাড়াটিয়া অন্তর্ভূক্ত করি। স্বল্প সময়ের মধ্যে তারা এ প্রতারণা করবে বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুলছে। তারা তাদের ভাড়াটিয়া তথ্য সম্পূর্ণ করতে পারেনি। যার ফলে চুক্তিনামা ব্যতিত অন্য কোন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

সংস্থায় ঋণ সুবিধার জন্য জামানত প্রদানকারী ভোলদিঘী গ্রামের সাবিকুন্নাহার নিপা মনি জানান, আমি ৫ লক্ষ টাকা ঋণ সুবিধা পেতে জামানত হিসেবে ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়েছি। এছাড়া পূর্ব উপলতার নাজমা আক্তারের ৫০ হাজার, কাজির কাপ গ্রামের স্বপ্না ১০ হাজার ৪ শত টাকা, ভোলদিঘী গ্রামের রেজিয়া ১০ হাজার ৫ শত ৫০ টাকা, একই গ্রামের রোকেয়া ৪০ হাজার টাকা, ছায়েদ ১৫ হাজার টাকা, নিজমেহার গ্রামের মমতাজ ২০ হাজার টাকা, সাহাপুরের ফাতেমা ১৫ হাজার ২ শত টাকা, নিজমেহার গ্রামের আমেনা আক্তার ৩০ হাজার ৫ শত ৫০ টাকা, সাহাপুরের ফরিদা আক্তার ২০ হাজার টাকা, ভোলদিঘীর মোতালেবের ১২ হাজার টাকা, বাবুল হোসেনের ৩০ হাজার টাকা, নিজমেহারের সাহিন আক্তারের ২১ হাজার টাকা, কাজির কাপের আমেনা বেগমের ২৫ হাজার টাকা, ভোলদিঘী গ্রামের ফরিদা বেগমের ৫০ হাজার টাকা, কাজির কাপের কবির হোসেনের ৬৮ হাজার টাকা সহ প্রায় ১৯৬ জন গ্রাহকের টাকা নিয়ে পালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কাউন্সিলর প্রহল্লাদ দে জানান, কি ভাবে প্রতারক চক্র সাধারণ জনগনের টাকা হাতিয়ে চলে গেলো তার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। আমি দোষিদের শাস্তি কামনা করি।

কাউন্সিলর কাজী আঃ কুদ্দুস রানা জানান, আমি ২-৩ দিন পূর্বে এনজিওটি’র নাম শুনে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য উপজেলা প্রশাসনের লোকদের মাধ্যমে খোঁজ খবর নেয়ার চেষ্টা করি। এনজিও কর্মীরা খুব অল্প সময়ে সাধারণ মানুষদের ধোঁকার মধ্যে ফেলে টাকার লোভ দেখিয়ে আত্মসাৎ করে পালিয়েছে। আমি দোষী এবং এর সাথে যারা জড়িত তাদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে শাস্তির দাবী জানাই।

অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) সৈকত দাস গুপ্তা জানান, অভিযোগের আলোকে ঘটনার তদন্ত চলছে। প্রাথমিক ভাবে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।

থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ শাহ আলম জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। অপরাধিদের ধরার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।

এলাকাবাসীর দাবী নিরীহ জনগনের টাকা নিয়ে উধাও হওয়া এনজিও কর্মীদের খুঁজে আইনের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং নিরীহ জনগনের আত্মসাৎকৃত টাকা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মাধ্যমে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা।

প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ, রবিবার

চাঁদপুর রিপোর্ট-এমকেজেড

1,190 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন