বাঙালির বিজয় : স্বমহিমায় বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

0
13

মিজানুর রহমান রানা :
ব্রিটিশ বেনিয়াদের সাথে এদেশীয় মীরজাফর, ঘসেটি বেগম চক্রের ষড়যন্ত্রের ফলে বাংলার আকাশে নেমে আসে দুর্যোগের ঘনঘটা। বাংলায় ঝেঁকে বসে বিদেশী বেনিয়া চক্র, চলে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার, বঞ্চনার স্টিমরোলার। মানুষ ক্রমে ক্রমে নির্যাতিত, নিষ্পেষিত হতে হতে পৌঁছে যায় সহ্যের চরম সীমানায়। তখন তারা নিজেরাই সংগঠিত হয়ে বিদেশীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে থাকে। ইতিহাসে সেসব আন্দোলনের নায়কদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যতম।

ইংরেজরা প্রায় দু’শ বছর এদেশ শাসন করার পর বাংলার মানুষের সংগ্রাম-আন্দোলনে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট শেষ পর্যন্ত তল্পিতল্পা গুটিয়ে নেয়। যাবার সময় ক‚টচাল দিয়ে যায়। ভারতীয় উপমহাদেশকে এমনভাবে দু’টি ডোমেনিয়নের ভিত্তিতে ভাগ করে দিয়ে যায়, যার মধ্যে লুক্কায়িত ছিলো বিভেদের বিষবাষ্প।

http://picasion.com/

পাকিস্তানীরা পদে পদে বাঙালিদেরকে অবহেলা, নির্যাতন, নিষ্পেষণ, শোষণ করে পশ্চিম পাকিস্তানে এদেশের ধন-সম্পদ দিয়ে গড়ে তুলতো শিল্প-কারখানা। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষরা হতো বঞ্চিত। ফলে বিভেদের দেয়াল ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে। এদেশের জনগণ তখন স্রষ্টার কাছে কামনা করতো এমন একজন মানুষ; যিনি এদেশের নির্যাতিত মানুষদের দেবেন সঠিক পথের সন্ধান।

ঠিক সেইক্ষণে এদেশের মানুষের জন্য ত্রাণকর্তারূপে আবির্ভাব হন আপামর মানুষের মুক্তিদূত শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগের সাথে আদর্শগত মতবিরোধের কারণে মাওলানা ভাসানী মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানসহ আরো কতিপয় বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতায় গঠন করেন আওয়ামী মুসলিম লীগ।

শেখ মুজিবুর রহমানের অন্তর বাল্যকাল থেকেই মানুষের প্রতি, মানবতার প্রতি কাঁদতো। নিজের গোলার ধান পর্যন্ত তিনি দুঃখী মানুষের কল্যাণে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। যেখানে অন্যায়, অত্যাচার আর বঞ্চনা সেখানেই মুজিবের পদচারণা। শুধু অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদই নয়; বাল্যকাল থেকে শেখ মুজিবের ভেতর অনেক সুন্দর মানবিক গুণাবলীরও বিকাশ ঘটেছিলো। উদারতা, মহত্ত¡, গরীব-দুঃখীর প্রতি মমত্ববোধ এবং সবাইকে আপন করে নেবার এক মহাবিস্ময়কর ক্ষমতা তার মধ্যে ছিলো। শেখ মুজিব শুধু নিজের কথাই ভাবতেন না। তিনি সব সময় ভাবতেন সবার কথা। তাঁর জীবনের শুরু হয়েছিলো আন্দোলন, প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। কিশোর বয়সে স্কুল পড়–য়া অবস্থায় তিনি স্কুলের হোস্টেলের ছাদ মেরামতের জন্য শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সামনে পথ আগলে দাঁড়িয়েছিলেন। শেরে বাংলা তাঁর সাহস আর ব্যবহার দেখে সত্যি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তখন সে অবস্থায়ই তাঁর স্বেচ্ছাধীন তহবিল থেকে বারশো টাকা মঞ্জুর করে দিয়েছিলেন হোস্টেলের নামে। এভাবে ক্রমে ক্রমে শেখ মুজিব তার আরো বিভিন্নমুখী কার্যকলাপ ও চরিত্রের কল্যাণে পরিণত হন রাজনীতির একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে কর্মের মাঠে সবাইর সমান অধিকার থাকার কথা। কাউকে বাদ দিয়ে বিশেষ কোনো একটি গোষ্ঠীকে নিয়ে কখনো কোনো মহৎ কর্ম হয় না। মাওলানা ভাসানীর সাথে শেখ মুজিবের দ্ব›দ্ব বাঁধল দলের ‘মুসলিম’ শব্দটি থাকাতে। এর দ্বারা একটি সা¤প্রদায়িক দল বুঝায়। এখানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী কর্মীর প্রবেশাধিকার নেই। তাই শেখ মুজিবের প্রস্তাব ছিলো দলকে ধর্মনিরপেক্ষ ও সর্বজনীন করার জন্য দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হোক। মাওলানা ভাসানী তা’ মানতে নারাজ হওয়ায় শেখ মুজিব মাওলানা ভাসানীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে গঠন করলেন আওয়ামী লীগ।

বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একজন কর্মী হিসেবে এসেছিলেন। তিনি কর্মী হিসেবে তার দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন। কোনোদিন নেতা হবার আকাক্সক্ষা তাঁর ছিলো না। তবুও নেতৃত্ব তাঁর আপনা হাতেই এসে গিয়েছিলো। তাঁর কর্মদক্ষতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং সর্বোপরি দেশপ্রেমই তাকে যোগ্যতার আসনে বসিয়েছিলো। নেতা হওয়ার জন্য তাঁকে কখনো পেছনের দরজা খুঁজতে হয়নি।

এদেশের মানুষ যখন পাকিস্তানীদের অত্যাচার, বঞ্চনায় হতাশ হয়ে মুক্তির পথ খুঁজছিলো তখনই মুজিব এদেশের মানুষের ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে শুরু করলেন আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে কায়দে আযমের বক্তব্যের প্রতিবাদে তিনি ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ গ্রেফতার হন। স্বাধীন পাকিস্তানে শেখ মুজিবের এটাই প্রথম কারাবরণ। তারপর তিনি কারাবরণ করেন ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীগণের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি সক্রিয় সমর্থনের কারণে।

বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমান এভাবে একের পর এক আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে লাগলেন। সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল। অথচ ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলো না। চললো নানা ষড়যন্ত্র।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সে ঘোষণা করেন, ‘….এদেশর মানুষকে খতম করা হচ্ছে, বুঝে-শুনে চলবেন, দরকার হলে সমস্ত চাকা বন্ধ করে দেয়া হবে। আপনারা নির্ধারিত সময়ে বেতন নিয়ে আসবেন। বেতন যদি না দেয়া হয়, যদি একটি গুলিও চলে, তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলÑ যার যা আছে তাই দিয়ে শত্র“র মোকাবেলা করতে হবে। রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিতে হবে। আমরা তাদের ভাতে মারবোÑ পানিতে পানিতে মারবো। আমি যদি হুকুম দেবার জন্য নাও থাকি, যদি আমার সহকর্মীরা না থাকেন, আপনারা সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন।… সাত কোটি মানুষকে আর দাবায়ে রাখতে পারবা না। বাঙালিরা যখন মরতে শিখেছেÑ তখন কেউ তাদের দাবাতে পারবে না…..।’

বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাঁকে জীবনের প্রায় অধিকাংশ সময়ই কারাবরণ করতে হয়েছিলো। সইতে হয়েছিলো অপরিসীম অত্যাচার, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। রেসকোর্স ময়দানে পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা ঘোষণাকালের কিছু পরে রাত ১টা ২০ মিনিটের সময় একদল পাকসেনা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘেরাও করে ফেলল। তারা বাসভবনের চারদিক থেকে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে করতে এগিয়ে গেলো বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তখন দোতলার ঘরে। তিনি নেমে এলেন নিচের তলায়। ধম্কে বললেন, ‘স্টপ ফায়ারিং’। সঙ্গে সঙ্গে গুলীবর্ষণ বন্ধ হয়ে গেলো। টিক্কাখানের তত্ত¡াবধানে গ্রেফতার করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। তার তিনদিন পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় করাচিতে। বাঙালি জাতি আর বসে থাকলো না। দেশমাতাকে রক্ষার জন্যে তারা শুরু করলো মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে পাকিস্তানীরা বাঙালিদের ওপর যথেষ্ট অত্যাচার, নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ করেছে। তাদের এসব বিবরণ শুনলে গা শিউরে ওঠে। মানুষ বাকহারা হয়ে যায়। শুধুমাত্র গণহত্যা এবং নারী নির্যাতনে সাড়ে বার লক্ষ বাঙালি নিশ্চিহ্ন হয়। ৪ লক্ষ ৬০ হাজার নারী হয় ধর্ষণের শিকার। এ যাবৎ ৯৩০টি গণহত্যা ও গণকবরের স্পট আবি®কৃত হলেও সারাদেশে মূল কবরের সংখ্যা ৫ হাজারেরও বেশি বলে মনে করা হয়। ৮৮টি নদীর তট ও ৬৫টি ব্রীজের নিচে পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের দোসরদের দ্বারা সংগঠিত হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ পাওয়া গেছে। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানীরা যখন দেখলো তাদের আত্মসমর্পন ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তখন তারা জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্যে এদেশের সূর্যসন্তান হাজার হাজার বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করতে থাকে। বুদ্ধিজীবীদের হত্যা প্রসঙ্গে জেনারেল রাও ফরমান আলী বলেন, ‘১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর পরাজয়ের মাত্র ৭ দিন পূর্বে ৯/১০ ডিসেম্বর তারা কতিপয় ব্যক্তিত্বকে গ্রেফতার করতে পরিকল্পনা করেছিলেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন ও গোয়েন্দা বিভাগের প্রণীত তালিকা অনুযায়ী এ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও পরে হত্যা করা হয়। তার সাক্ষ্যনুযায়ী পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় বুদ্ধিজীবী হত্যার সহায়তা পেয়েছিলো তাদের এদেশীয় এজেন্ট আলবদর গোষ্ঠীর দ্বারা। ব্যাপকহারে বুদ্ধিজীবী হত্যার ফলে বাঙালি জাতি প্রায় মেধাশূন্য অবস্থায় পতিত হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সারাজীবনের সংগ্রাম, আন্দোলন, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও বাংলার আপামর মানুষের মুক্তিসংগ্রামে ১৯৭১ সালে বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হলো স্বাধীনতা। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এলেন স্বাধীন বাংলাদেশে। ফিরে এসে তিনি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, …আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার সোনার বাংলা আজ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার উদ্দেশ্যে আমি সালাম জানাই।…বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছে, তারা বীরের জাতি, তারা নিজেদের অধিকার অর্জন করে মানুষের মত বাঁচতে জানে। ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক ভাইয়েরা আমার, আপনারা কত অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেছেন, গেরিলা হয়ে শত্র“র মোকাবেলা করেছেন, রক্ত দিয়েছেন দেশমাতার জন্যে। আপনাদের এ রক্তদান বৃথা যাবে না।….৭ মার্চ আমি … বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলুন। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রামÑ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আপনারা সেই স্বাধীনতা এনেছেন। আজ আবার বলছি, আপনারা সবাই একতা বজায় রাখুন। ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। একজন বাঙালির প্রাণ থাকতেও আমরা এই স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেব না।…এখন যদি কেউ বাংলাদেশের স্বাধীনতা হরণ করতে চায়, তাহলে সে স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্যে মুজিব সর্বপ্রথম প্রাণ দেবে।’

বিধ্বস্ত এক বাংলাদেশের আপামর মানুষের দায়িত্বভার পেলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানীরা যুদ্ধের সময় খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ করে দেশকে করেছে চারখার ও মেধাশূন্য। মুক্তিযোদ্ধারা দেশের প্রয়োজনেই ব্রিজ-কালভার্ট ইত্যাদি উড়িয়ে দিয়েছিলো। এছাড়া তাঁর শাসনামলে ’৭৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে নেমে আসে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রবল বন্যায় সারাদেশ ভেসে যায়। অন্ন-বস্ত্রসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দুষ্প্রাপ্যতা এবং দূর্মূল্য দেখা দেয়। শেখ মুজিবুর রহমান দেশের মানুষের দুর্দশা লাঘবে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি সাহায্য-সহযোগিতা প্রেরণের আহŸান জানান। তাঁর আহŸানে সাড়া দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা আসতে থাকে। এছাড়া দেশের ভেতর থেকেও প্রচুর সাহায্য আসে। সব সাহায্য তিনি সুষ্ঠুভাবে বন্যার্তদের মাঝে বিতরণের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু তা’ সত্তে¡ও সবদিক সামাল দেয়া সম্ভব হয়নি। দেশে বন্যাজনিত কারণে নেমে আসে চরম দুর্ভিক্ষ। দুর্ভিক্ষে অনেক মানুষ না খেয়ে মারা যায়।

দেশের অভ্যন্তরে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। প্রথমে শুরু হয় রাজনৈতিক, পরবর্তীতে তা’ সেনাবাহিনীতেও ছড়িয়ে পড়ে। সেনাবাহিনীর কতিপয় বিশ্বাসঘাতক, লোভী ও তাদের দোসর দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের হীনবাসনাকে চরিতার্থ করতে পরিকল্পনা করে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার নীল নক্শা।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৪ আগস্ট ’৭৫ রাত্র ১১টায় মেজর ডালিম, মেজর রশিদ, নূর, শাহরিয়ার, মেজর পাশা, মেজর হুদা মধ্যরাতে মেজর ফারুকের সাথে মিলিত হয়। মেজর ফারুক সকলকে তাদের পরিকল্পাটি বুঝিয়ে বলে। ধর্ম, রাষ্ট্র এবং জাতীয় প্রয়োজনে এই মহৎ ঘটনা (!) (তাদের মতে) ঘটানোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলে এবং সর্বময় কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। ফারুক একে একে সকলের সম্মতি গ্রহণ করে ঢাকা নগরীর একটি টুরিস্ট ম্যাপ নিয়ে স্কোয়াডন অফিসের টেবিলে রাখে। যে সকল স্থানে ব্লক তৈরি করতে হবে সে সকল স্থানে দাগ কেটে সকলকে বুঝিয়ে দেয়।

পরিকল্পনা অনুসারে একটি ট্যাঙ্ক বিমান বন্দরের রানওয়ে আটকাবে, আর সৈন্যদের একটি অংশ মিরপুর ব্রীজের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। অন্যান্য দলগুলো কিছু সৈনিককে রেডিও স্টেশন, বঙ্গভবন এবং পিলখানায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ৭৫ থেকে ১৫০ জনের বড় তিনটি দলকে সাজানো হয় তিনটি প্রধান টার্গেটে আঘাত হানার জন্যে। এ টার্গেটগুলো হলো: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মনির বাসা।

ভোর ৪:৪০ মিনিটে ফারুক বাহিনী ২৮টি ট্রাক, ১২টি ট্যাঙ্ক, ৩টি জীপ, একটি ১০৫ মি. মি. হাউটইজার এবং এগুলোর সঙ্গে ৪০০ সৈন্যের ঘাতক বাহিনী নিয়ে শুরু করে তাদের অপারেশন। ফারুক নিজে বঙ্গবন্ধুর অনুগত রক্ষী বাহিনীকে মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ছিলো অত্যন্ত দুরুহ এবং জটিল কাজ। তবুও ২৮টি ট্যাঙ্কের গোলা-গুলিবিহীন কিছু ট্যাঙ্ককে মনস্তাত্তি¡ক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, ধোঁকা দিয়ে ৩০০০ রক্ষী বাহিনীকে আত্মসমর্পনে বাধ্য করে। প্রকৃতপক্ষে তার কাছে শুধুমাত্র একটি স্টেনগান ছাড়া কিছুই ছিলো না। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় ছিলো, বঙ্গবন্ধু যে রক্ষী বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন, তাদের কাছ থেকে সামান্য প্রতিরোধের কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি।

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ভোর ৫:৪০ মিনিটে ঘাতকদের গুলিতে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু ঘটে। গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়া হয়েছিলো তাঁর বুক। বঙ্গবন্ধুর বুকে, দেহে ২৮টি গুলি লেগেছিলো। গুলির প্রচণ্ড শব্দে বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব দৌড়ে আসেন বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরার জন্যে। কিন্তু বেড রুমের দরজার সামনেই নির্দয় ঘাতকদের স্টেনগানের ব্রাসফায়ারে তিনি লুটিয়ে পড়েন। এরপর হত্যাকারীরা রুমে ঢুকে একের পর এক গুলি করতে লাগলো। শেখ জামাল, জামাল, দুই পুত্রবধু, শিশু পুত্র রাসেল, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসের, আবদুর রব সেনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মণি, বেগম আরজু মণি, সুলতানা কামাল খুকু, পারভীন জামাল রোজী, কর্ণেল জামিল উদ্দিন আহমেদ, বেবী সেরনিয়াবাত, আরিফ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু, ডিএসপি ও আরো কিছুসংখ্যক দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী সহ সবাইকে হত্যা করে ঘাতকরা। পৈশাচিক এ ঘটনার প্রায় ৪ ঘণ্টা পর তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন চিত্রগ্রাহককে নিহত বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্যদের ছবি তোলার জন্যে নিয়ে আসা হয়েছিলো। সাথে ছিলো বঙ্গবন্ধর বাসভবনে আক্রমণকারীদের কয়েকজন। পরবর্তীতে তারা বঙ্গবন্ধুকে তড়িঘড়ি করে তাঁর জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় কবর দেয়। সেই সাথে কবর দেয়া হয় বাঙালি জাতি সত্ত¡ার এক জীবন্ত ইতিহাস। এমন একজন দেশপ্রেমিক মানবসন্তানকে হারিয়ে আজো বাঙালিরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি বিশ্বদরবারে। বিশ্বের মানুষ যখন প্রশ্ন করে, তোমাদের জাতির সুমহান বন্ধুকে কেন তোমরা হত্যা করলে? তখন বাঙালি জাতি বিব্রতবোধ করে। কী দেবে এর জবাব? যে জাতির সন্তানরা তাদের পিতৃত‚ল্য একজন মানুষকে নিজের হাতে খুন করে তারা তো মহা অভিশপ্ত। তাদের কী আর কিছু বলার থাকতে পারে?

একটি জাতিকে ভালোবেসে যিনি তার প্রাণকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন, জীবনের অধিকাংশ সময়টাই জেলখানায় কাটিয়েছেন, সে জাতির কিছু বিশ্বাসঘাতকের হাতেই প্রাণ বিসর্জন দিলেন এ মহান পুরুষ। অথচ পাকিস্তানীদের নির্জন কারাগারে যার জন্যে কবর পর্যন্ত খোঁড়া হয়েছিলো সেখানেও তাঁর মৃত্যু হয়নি। হয়েছে তার দেশেরই কিছু দুষ্ট, বিশ্বাসঘাতক ও এবনরমাল প্রকৃতির মানুষের হাতে; যা গোটা জাতিকে করেছে কলঙ্কিত।

এ প্রসঙ্গে বর্তমানকালের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যক হুমায়ুন আহমেদের ‘সম্রাট’ থেকে একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘মানুষ ঘৃণা করার অপরাধে কখনো কাউকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়নি, অথচ মানুষকে ভালোবাসার অপরাধে অতীতে অনেককেই হত্যা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও হয়তো হবে।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও এদেশের মানুষকে ভালোবাসার অপরাধেই কিছু কুলাঙ্গার চরিত্র তাকে সপরিবারে হত্যা করে। তাদের স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে তারা দেশের আপামর মানুষের কথা চিন্তা করেনি।

বর্তমানকালে অনেককে বলতে শোনা যায়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কেন দেশের একটি মানুষও প্রতিবাদের ভাষা উচ্চারণ করেনি। বঙ্গবন্ধুর অবদানকে খাটো করে দেখার জন্যে নানা কুৎসা প্রচার করে থাকে স্বার্থান্বেষী লোকেরা। আবার এও বলতে শোনা যায়, ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা চায়নি। তিনি নিজেই পাকিস্তানীদের কাছে ধরা দিয়েছিলেন।’

এসব কথা যে তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্যে প্রচার করা, তা’ এ প্রজন্মের সন্তানরা কী বুঝতে পারে? আমি (লেখক) রাজনীতি করি না, করার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু আমি এ প্রজন্মের একজন মানুষ; যে কি না স্বাধীনতার পরে জন্মগ্রহণ করেছি। কিন্তু আমার মধ্যে জানার অদম্য ইচ্ছা বিদ্যমান থাকায় প্রকৃত সত্য অনুসন্ধানে তৎপর হই এবং চেষ্টা করি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করার।

কবি শামসুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু কথা প্রবন্ধে বলেন, ‘তখন কান্নার আওয়াজও নিষিদ্ধ ছিলো বাংলাদেশে। শোকার্তদের ওপর যে কোনো মহূর্তে নেমে আসতে পারে উৎপীড়নের খাঁড়া। তাই…জোরে কাঁদতেও পারিনি। এই নির্মম হত্যাকান্ডের সংবাদ অপরিশীলিত, কর্কশ কণ্ঠে বেতারে উচ্চারিত হওয়ার পরই বুঝতে পারলাম, আমরা প্রবেশ করছি এক অন্ধকার যুগে..। কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে মাটির তলায় চাপা দিয়ে রাখা যায়নি। এক অর্থে তিনি সগৌরবে উঠে এসেছেন কবর থেকে, উঠে এসেছেন তাঁর প্রিয় বাংলাদেশে, ফসলের আভায়, কৃষকের হাসিতে, নদীর স্রোতে, মাঝির ভাটিয়ালী গানে, উত্তর বঙ্গের গাড়িয়াল ভাইয়ের ভাওয়াইয়া গানে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সঞ্চারী মিছিলে, সভায়। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি আজ উদ্ভাসিত স্বমহিমায় মহিমান্বিত।’

যারা স্বাধীনতা চোখে দেখেনি, ভালোভাবে এদেশের স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানে না। তারা কী করে বুঝবে? তারা তো স্বীয় পার্টির অন্ধ টানে নিজ পার্টিকে বড় করে দেখার প্রবণতায়, নিজের স্বার্থের খাতিরে দেশের মহান এই বন্ধুকে অস্বীকার করছে, তার নামে কুৎসা রটনায় বিশ্বাস স্থাপন করছে অথবা নিজেও তা’ প্রচার করছে।

নীলিমা ইব্রাহীম তার ‘১৫ আগস্টের আগে ও পরে’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগগুলো ছিলো এ ধরনের: আকাক্সিক্ষত মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙ্গে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করা, ভারতের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ চুক্তি আত্মসমর্পণতুল্য, দ্রুত সংসদীয় গণতন্ত্র থেকে রাষ্ট্রপতি শাসন প্রবর্তন এবং নিজে রাষ্ট্রপতি হয়ে সর্বক্ষমতা কুক্ষিগতকরণ, একদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা এবং কম্যুনিজমের প্রতি অতি আকর্ষণ, সংবাদপত্রের সংকোচন, ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীনতা এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ।

কেউ তার যতো সমালোচনাই করুক, তাঁর স্বদেশপ্রীতি সম্পর্কে কটাক্ষ করার সুযোগ তিনি কাউকে দেননি এবং তিনি মনেপ্রাণে দেশকে ভালোবাসতেন। রাজাকার-আলবদরদের তিনি পুনর্বাসিত করেছিলেন এ কথা সত্য কিন্তু তাদের মাথা তুলতে দেননি। ওপরের অভিযোগগুলো ছাড়াও আরো কিছু বিষয় দেখতে পাই যা মুজিব সরকারকে লোকচক্ষে হেয় করেছিলো। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা দূরে সরে গেল। সংগ্রামে যারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলো তাদের বিভক্ত করা হলো মুজিব বাহিনীর জন্ম দিয়ে। নিয়মিত সেনাবাহিনীকে সামনে রেখেও উন্নততর ব্যবস্থায় রক্ষীবাহিনী সৃষ্টি করা হলো। এ দরিদ্র দেশে দুটোর একটাকে অবলম্বন করা প্রয়োজন ছিলো। ফলে সামরিক বাহিনীতে অসন্তোষ দেখা দিলো। শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের নামে লুটপাট শুরু হয়ে গেল। যারা এ চৌর্যবৃত্তিতে লিপ্ত ছিলেন তারা রটনা করলেন, ভারতীয়রা সব নিয়ে গেছে। অথচ মুক্তিযোদ্ধার আবরণে যারা আরামে দিল­ী-কলকাতায় অবস্থান করেছে তারা নিজেদের ইচ্ছেমত পদে যোগ দিলেন মুক্তিযোদ্ধার অধিকার নিয়ে। আর যারা শরণার্থীরূপে দশমাস অফিস-আদালত, ঘরে-বাইরে সংগ্রাম করে বেঁচেছিলেন তারা হয়ে গেলেন দালাল, কিছু কিছু লোভাতুরের স্বার্থে। এভাবে সর্বত্র সর্বক্ষেত্রে যে নৈরাজ্য চললো তার দায়ভার গিয়ে পড়লো শেখ মুজিবের ওপর। বাড়ি দখল, বাড়ির ফার্ণিচার ও অন্যান্য জিনিস নিয়েছেন যারা, তারা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। এরা সংখ্যায় কম হলেও শেখ মুজিবের ওপর কম কালিমা লেপন করেননি। যারা ক্ষুব্ধ ছিলেন, তারা এ সুযোগ গ্রহণ করলেন। রাতারাতি অনেকে মুজিববাদী বনে গেলেন। মন্ত্রিসভার ভেতরে যারা ছুরি শান দিচ্ছিলেন তারা পুলকিত হলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হলো আত্মীয় পোষণের অপবাদ, আত্মীয়েরা নিজেরাই নিজেদের তোষণ করেছেন শেখ মুজিবের অগোচরে কিন্তু অপরাধী সাব্যস্ত হলেন শেখ মুজিব।’

তৎকালীন সময় খুনীরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেই দেশকে এমন পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গেছে, যেখানে দেশের আপামর মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলো। এছাড়া ঘাতকচক্রের ক্ষমতার ভয়ে মানুষ সেদিন প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলো। এ প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়, ‘বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর অনেকদিন চলে গিয়েছিলো, দেশের ভেতরে কোথাও প্রকাশ্যে কেউ তাঁর নাম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে উচ্চারণ করতে পারছিলাম না। এ ব্যাপারে সামরিক শাসকদের কোনো বিধি-নিষেধ আরোপিত না থাকলেও, তাদের আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয়া অলিখিত বিধি-নিষেধ দেশের মানুষের মধ্যে একটা ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে রেখেছিলো। যার ফলে ১৯৭৬ সালের সালের একুশে ফেব্র“য়ারিতে প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কোনো কবিতা পাঠ করার সাহস অর্জন করতে পারিনি। ১৯৭৬ সালে আমি একুশের কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে পড়েছিলাম ‘ভয় নেই’ নামের একটি কবিতা। ’৭৫-এর নির্মম-নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর যে ভয় চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো, তার চাপ থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করাটাই ওই কবিতার উদ্দেশ্য। সেই সঙ্গে নিজেকেও ভয়ের আগ্রাসন থেকে মুক্ত করা।’

বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার্থে সে সময় সকল ভীতি উপেক্ষা করে নিজে গাড়ি চালিয়ে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে গেটের নিকটে দায়িত্বশীল অফিসার কর্ণেল জামিল ঘাতকদের গুলিতে নিজ প্রাণ বিসর্জন দেন। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে কর্ণেল জামিলের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।

বঙ্গবন্ধুর খুনীরা প্রচার করেছিলো যে, দেশের স্বার্থেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে, অথবা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা বা দেশের শাসনতন্ত্রের প্রয়োজনে পরিবর্তনের জন্য তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে লন্ডন টেলিভিশনে মেজর রশিদ ও মেজর ফারুক সাংবাদিক এ্যান্থনী মাসকার্নহার্সকে এক সাক্ষাৎকার প্রদান করে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো যে, তারা কেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিলো। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা ছাড়া কী তাদের বিকল্প কোনো পথ খোলা ছিলো না?

রশিদ বলেছিলো, বঙ্গবন্ধু সবাইকে দুর্নীতিপরায়ণ হবার সুযোগ দিয়েছিলেন। তিনি অমানবিক ও নীতিবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগের জন্য নিজের দলীয় সদস্য এবং অন্য কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।

তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যে, এ ধরনের প্রেক্ষাপটে তারা কি বঙ্গবন্ধুকে জোর করে পদত্যাগের কথা বলতে পারতো না? নাকি তাকে হত্যা করাটা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিলো?

জবাবে মেজর রশিদ জানায়, তাকে যদি বাঁচিয়ে রাখা হতো, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলো না।

তাদের প্রশ্ন করা হয় যে, মুজিব ও তার পরিবারের সদস্যদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেয়া কী উচিত ছিলো না?

উত্তরে তারা জানায়, মুজিব, শেখ মনি এবং আবদুর রব সেনিয়াবাত এই তিনজনের প্রত্যেককেই নিজ নিজ ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বিপ্লবীদের কাছে আত্মসমর্পণ করার অনুরোধ জানিয়েছিলো। কিন্তু আত্মসমর্পণের পরিবর্তে তারা গোলাবর্ষণ করতে থাকেন। এতে বেশ ক’জন বিপ্লবী সৈনিক ও অফিসার আহত হন এবং ক’জন মৃত্যুবরণ করে। ফলে তারা আত্মরক্ষার প্রয়োজনে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের গুলিবর্ষণ করে দুর্গগুলো বিধ্বস্ত করে দিতে বাধ্য হয়। অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং এই অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির শিকার হয়ে অনেকেই মৃত্যুবরণ করে।

সকল তর্ক-বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে আজ একথাই প্রমাণিত হয় যে, আসলে খুনীচক্রের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বঙ্গবন্ধুকে খুনের নেশাই বড় হয়ে ধরা দিয়েছিলো তাদের। দেশের বা তাদের প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধুকে ও তার পরিবারবর্গের সবাইকে হত্যার প্রয়োজন কোনোকালেই ছিলো না। তারা যদি দেশের শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রয়োজনে কিছু করে থাকতো তাহলে যে কোনো উপায়েই বঙ্গবন্ধুকে জীবিত রেখে তা’ করতে পারতো। কিন্তু তারা জানে বঙ্গবন্ধুকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। কারণ তারাই বলেছে যে, বঙ্গবন্ধু আত্মসমর্পণ করেনি। কারণ আত্মসমর্পণ তার চরিত্রের মধ্যে নেই। শুধু বাঙালির কাছে কেন, তিনি শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কারো কাছে আত্মসমর্পণ করতে শিখেননি। তারা জানে, বঙ্গবন্ধুকে জেলে আটক রেখে তাদের মানসিক ইচ্ছা পুরণ করতে পারবে না। ফলে তারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে খুন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে খুন করে তাদের কী স্বার্থ হাসিল হয়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে তারা জানায়, ‘না, কিছুই হয়নি।’ কারণ বঙ্গবন্ধু হচ্ছে একটি ইতিহাস। তাই ‘শেখ মুজিবের নামে ইতিহাসের দরজা খুলে যায়’। তাকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে কল্পনা করা বড়ই কঠিন। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশÑ এ দু’টি স্বত্ত¡া একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল; যা আমরা এখনো প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছি।

লেখক পরিচিতি: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদ, চাঁদপুর।

প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ, রোববার :

চাঁদপুর রিপোর্ট : এমআরআর

ফেসবুকে মন্তব্য করুন
198 জন পড়েছেন
http://picasion.com/