দান-সাদাকাহ সংক্রান্তে ইসলামের নির্দেশনা

লিখেছেন : অ্যাড. শাহজাহান শাওন, বাংলাদেশ সুর্প্রীম কোর্ট

দান-সাদাকাহ কেয়ামতের দিন কঠিন বিপদে দানদাতাকে চিন্তামুক্ত করবে। তবে শর্ত হলো দান করে খোঁটা, দান গ্রহীতা হইতে প্রতিকার প্রাপ্তি, লাভ প্রত্যাশা বা কটু কথা বলা যাবে না। আজ আমরা দেখি কোয়ারান্টাইনে অসহায় গরিব মানুষকে ত্রাণের প্যাকেট দেওয়ার সময় ভিডিও করছে, সেল্ফি উঠাচ্ছে, দানের মাল গ্রহণের সময় ক্যামেরার দিকে না তাকানোর কারণে ধমকানো হচ্ছে। এসব সত্যিকারভাবে সাদাকাহ বা দানের শিষ্টাচার নয়। ইসলামে ভদ্রতা, আদাব ও মুক্তহস্তে দান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দান, সদকা, যাকাত সংক্রান্তে পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আলামীন অসংখ্য আয়াত নাযিল করেছেন,
সুরা- বাকারা, আয়াত নং ১৭৭, “ভালো কাজ এটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে; বরং ভালো কাজ হল যে ঈমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবসে, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি এবং যে সম্পদ প্রদান করে তার প্রতি আসক্তি সত্বেও নিকটাত্মীয়গণকে, ইয়াতীম, অসহায়, মুসাফির ও প্রার্থণাকারীকে এবং বন্দিমুক্তিতে এবং যে সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করে, যারা ধৈর্য্যধারণ করে কষ্ট ও দূর্দশায় ও যুদ্ধের সময়ে। তারাই সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাকী”।

সুরা বাকারা, আয়াত ২১৫, “ তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে? বল, তোমরা যে সম্পদ ব্যয় করবে, তা পিতা-মাতা, আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য। আর যে কোন ভাল কাজ তোমরা কর, নিশ্চয় সে ব্যাপারে আল্লাহ সুপরিজ্ঞাত” ।

সুরা বাকারা, আয়াত ২৬২, “যারা আল্লাহর রাস্তায় তাদের সম্পদ ব্যয় করে, অতঃপর তারা যা ব্যয় করছে, তার পেছনে খোঁটা দেয় না এবং কোন কষ্টও দেয় না, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট তাদের প্রতিদান রয়েছে এবং তাদের কোন ভয় নেই, আর তারা চিন্তিত হবে না।”

এছাড়াও পবিত্র কোরআনে দান, সদকা, যাকাত সংক্রান্তে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য আয়াত নাযিল করেছেন,
সুরা বাকারা, আয়াত নং ৪৩, ১১০, ১৭৭,১৯৬, ২১৯, ২৬৩, ২৬৪, ২৭১, ২৭২, ২৭৪, ২৭৬, ২৭৭
সুরা আল ইমরান, আয়াত নং ৯২ “তোমরা কখনো সওয়াব অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না ব্যয় করবে তা থেকে, যা তোমরা ভালবাস। আর যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত”।
সুরা আল ইমরান, আয়াত নং ১৩৪, ১৮০,
সুরা নিসা, আয়াত নং ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৯২, ১১৪,
সুরা মায়িদাহ, আয়াত নং ১২ “আর অবশ্যই আল্লাহ বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং আমি তাদের মধ্য থেকে বারজন দলনেতা পাঠিয়েছিলাম এবং আল্লাহ বলেছিলেন, নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি, যদি তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও, আমার রাসুলদের প্রতি ঈমান আন, তাদেরকে সহযোগীতা কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তবে নিশ্চয় আমি তোমাদের থেকে তোমাদের পাপসমূহ মুছে দেব। আর অবশ্যই তোমাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। তোমাদের মধ্য থেকে এরপরও যে কুফরী করেছে, সে অবশ্যই সোজা পথ হারিয়েছে” ।

সুরা মায়িদাহ, আয়াত নং ৪৫, ৫৫,
সুরা তাওবাহ, আয়াত নং ৫, ১৮, ৫৮, ৭১, ৭৫, ৭৬, ৭৯, ১০৩, ১২১,
সুরা নাহল, আয়াত নং ৭১,
সুরা আল আম্বিয়া, আয়াত নং ৭৩,
সুরা আল হাজ্জ, আয়াত নং ৩৬, ৪১, ৭৮,
সুরা আন নুর, আয়াত নং ৩৭, ৬১,
সুরা আল ফুরকান, আয়াত নং ৬৭,
সুরা আন নামাল, আয়াত নং ৩,

সুরা আর রুম, আয়াত নং ৩৮ “ অতএব আত্মীয় স্বজনকে তাদের হক দিয়ে দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরকেও। এটি উত্তম তাদের জন্য, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি চায় এবং তারাই সফলকাম।”
সুরা আর রুম আয়াত নং ৩৯,
সুরা লুকমান, আয়াত নং ৪,
সুরা আহযাব, আয়াত নং ৩৫,

সুরা ইয়া সীন, আয়াত নং ৪৭, “আর যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ তোমাদেরকে যে রিজিক দিয়েছেন তা থেকে তোমরা ব্যয় কর; তখন কাফিররা মুমিনদেরকে বলে, আমরা কি তাকে খাদ্য দান করব, আল্লাহ চাইলে যাকে খাদ্য দান করতেন? তোমরা তো স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় রয়েছ।”

সুরা ফুসসিলাত, আয়াত নং ৭ “যারা যাকাত দেয় না। আর তারাই আখিরাতের অস্বীকারকারী।”
সুরা মুহাম্মদ, আয়াত নং ৩৬, ৩৭, ৩৮,
সুরা আয যারিয়াত, আয়াত নং ১৯ “ আর তাদের ধনসম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক”।
সুরা আল হাদীদ, আয়াত নং ৭, ১০, ১১ এবং ১৮ “নিশ্চয় দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী এবং যারা আল্লাহকে উত্তম কর্জ দেয়, তাদের জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়া হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনত প্রতিদান”।
সুরা আল হাদীদ, আয়াত নং ২৪,
সুরা আল মুনাফিকুন, আয়াত নং ১০,
সুরা আত তাগাবুন, আয়াত নং ১৬, ১৭ “যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তিনি তা তোমাদের জন্য দ্বিগুণ করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী, পরম ধৈর্য্যশীল”।
সুরা আল মুযযাম্মিল আয়াত নং ২০,
সুরা আল ইনসান, আয়াত নং ৮, “তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্বেও মিসকীন, ইয়াতীম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে”।
সুরা আল ফাজর, আয়াত নং ১৮,
সুরা আল লাইল, আয়াত নং ৮, ১৮, ১৯,
সুরা আল বাইয়্যিনাহ, আয়াত নং ৫,
সুরা আল মাউন, আয়াত নং ৩ “ আর মিসকীনকে খাদ্য দানে উৎসাহ দেয় না”।
সুরা আল মাউন, আয়াত নং ৭।
এছাড়াও আরো অসংখ্য আয়াত পবিত্র কোরআনে এতদসংক্রান্তে রয়েছে।

নির্ভেজাল ভাবে দান করার মধ্য দিয়ে মহান আল্লাহকে খুশি করার মাধ্যমেই ব্যক্তির তাকওয়ার প্রকাশ ঘটে থাকে। দানের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমার সৌভাগ্যও হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ ‘শয়তান তোমাদিগকে অভাব অনটনের ভীতি প্রদর্শন করে এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়, আর আল্লাহ তাআলা দান করার বিনিময়ে ক্ষমা করা ও সম্পদ বৃদ্ধি করার ওয়াদা করেন।

মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিৎ। আল্লাহর ভান্ডারে কোনো কিছুর অভাব নেই। দান, সাদকাহ এর শর্ত হলো খাঁটি নিয়্যাতে দান করতে হবে। নাম যশের নিয়্যাত থাকলে চলবে না। প্রকাশ্য দান করার কোনো প্রয়োজন দেখা না দিলে গোপনে দান করাই উত্তম। তবে যেখানে এরূপ প্রয়োজন দেখা দেয়, সেখানে প্রকাশ্যে দান করাই শ্রেয়।

যে যেখানে আছি, যার যা সাধ্য আছে তার সাধ্যমতো অসহায় প্রতিবেশীর দিকে সাহায্যের হাত বাড়ানো দরকার। অল্প হউক, বেশী হউক। ইচ্ছা ও পরিশুদ্ধ আন্তরিকতাই গুরুত্বপূর্ণ, যা আল্লাহর দরবারে কবুলের অন্যতম শর্ত । কেননা কোন সাদাকাহ উত্তম তা বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, তিনি রাসূল (সা.) এর নিকট আরজ করেন, ইয়া রসূলুল্লাহ (সাঃ)! কোন সদকা উত্তম? তিনি বললেন, সে সদকা উৎকৃষ্টতম সদকা, যা গরীব ব্যক্তি আপন উপার্জন থেকে করে। আর প্রথমে তাদের উপর ব্যয় করে সে যাদের জিম্মাদার (অর্থাৎ আপন স্ত্রী ও সন্তানাদির উপর) (সুনানে আবু দাউদ, মাআরিফুল হাদীস) এ ছাড়াও দানের গুরত্ব কোন অবস্থার দান উত্তম এ সম্পর্কে রাসূলের আরো অনেক নির্দেশনা রয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর নবী! কোন অবস্থায় দান ফলাফলের দিক দিয়ে সর্বোত্তম? রাসূল (সাঃ) বললেন, তোমার সুস্থ ও উপার্জনক্ষম অবস্থার দান। যখন তোমার দরিদ্র হওয়ারও ভয় থাকে এবং ধনী হওয়ারও আশা থাকে। তুমি নিয়তই দান-খয়রাত করতে থাকবে। এমনকি তোমার প্রাণ গ্রীবাদেশে পৌঁছা পর্যন্ত বলতে থাকবে অমুকের জন্যে এটা, অমুকের জন্যে এটা; আর তোমার বিশ্বাস আছে যে, তা পৌঁছান হবে। (বুখারী, মুসলিম)

আবু হুরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেন- ‘যখনই আল্লাহর বান্দারা প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করে, তখনই দুজন ফিরিশতা অবতীর্ণ হন। তন্মধ্যে একজন বলতে থাকেন, হে আল্লাহ! তুমি দাতা ব্যক্তিকে প্রতিদান দাও।
দান সদকায়ে জারিয়াহ, দানে বালা মুসিবত দূর হয় এবং দানে সম্পদ কমে না বরং বাড়ায়। তবে এমনভাবে দান করা উচিত নয় যেন দাতা নিঃস্ব হয়ে যায়।

200 জন পড়েছেন

Recommended For You

অনুমতি ব্যতীত এই সাইটের কোনো সংবাদ, ছবি অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশ আইনত দণ্ডনীয়