স্বাস্থ্যবিধি মেনে যেভাবে কোরবানি করব

মুহসিন মাশকুর
ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় কোরবানি একটি বিশেষ ইবাদত। নিজের প্রিয় জিনিসকে আল্লাহ তাআলার জন্য উৎসর্গ করে আল্লাহ ইচ্ছাকে নিজের ইচ্ছের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার নামই হলো কোরবানি। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র, নিঃসন্দেহ আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আমি তোমাকে কোরবানি করছি। এখন বলো, এ ব্যাপারে তোমার মত কী? তিনি বললেন, হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের একজন পাবেন।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত ১০২)

কোরবানির ক্ষেত্রে পশুর আকার, দাম, রং, জাত এগুলো আল্লাহ্‌ তায়ালার কাছে কোন বিবেচ্য বিষয়ই নয়। বরং আল্লাহর কাছে বিবেচ্য হলো, মানুষের ‘তাকওয়া’ তথা আল্লাহর ভয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, তবে তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের মনের তাকওয়া”। (সূরা হজ, আয়াত :৩৭)

স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোরবানি

প্রতিবছর ২ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ পবিত্র হজ পালন করতে যান এবং হজ উপলক্ষে মক্কায় ১.২ মিলিয়নেরও বেশি গবাদিপশু; যেমন ভেড়া, ছাগল, দুম্বা এবং উট জবাই করা হয়। ইসলামী আইন ও জনস্বাস্থ্যের নির্দেশিকা মেনে গবাদি পশুগুলোকে কুরবানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য কোরবানির সময় মক্কার স্লটারিং হাউজে প্রায় ১৬ হাজারেরও বেশি কর্মচারী ২৪ ঘন্টা কাজ করে থাকে। পশু কুরবানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কার্যপ্রণালিতে ইসলামের পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা প্রতিফলিত হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারী ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২২)

আবু মালেক আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।’ (মুসলিম, হাদিস নং: ২২৩)।

গরুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ

আগে যেমন বাজারেই গরুর হাট বসানো হতো, এবার তেমন না করে খোলা মাঠে গরুর হাট বসাতে হবে। একটা পশু থেকে আরেকটা পশুর দূরত্ব কমপক্ষে ৪ ফিট রাখতে হবে। আগের চেয়ে তুলনামূলক কম মানুষ কোরবানির পশু কিনতে হাটে যাবে। বৃদ্ধ কিংবা যাদের কোন রোগ আছে তারা কুরবানির পশু কিনতে হাটে যাবেন না। কারণ এতে অন্যরা ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।

আবূ সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন: ‘অন্যের ক্ষতি করা উচিত নয়, আর ক্ষতির সম্মুখীন হওয়াও উচিত নয়।’ (ইবনু মাজাহ, হাদিস নং : ২৩৪১, আদ দারু-কুতনি, ৪/২২৮)

যারাই হাটে আসবেন সবাই মাস্ক ও গ্লাভস পরে যাবেন। আগের মত অত্যাধিক দরদাম করা উচিত হবে না। সম্ভব হলে আগেই খামারীর সাথে কথা বলে যাবেন। বাচ্চাদেরকে এবার হাটে না আনাই উচিৎ। কুরবানির পশু কিনে আনার পর সবাই দল বেঁধে দেখতে যাবে না। একটি পশু থেকে আরেকটি পশুকে নিরাপদ দূরত্বে বেঁধে ঘাস খাওয়াতে হবে।

কোরবানির সময় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ

যিনি কোরবানির পশু জবাই করবেন তিনি অবশ্যই মাস্ক ও গ্লাভস পরে জবাই করবেন। কোরবানির পশুকে ধরার জন্য ১-৩ জনের বেশী লোক যেন না থাকে। অভিজ্ঞ লোক দ্বারা পশুকে শোয়ানো ও জবাই করা উচিৎ, নতুবা পশুর কষ্ট হয়।

আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দয়ালু লোকদের উপর দয়ালু আল্লাহ অনুগ্রহ করেন, তোমরা দুনিয়াবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানে যিনি আছেন তিনি তোমাদের ওপর দয়া করবেন। (আবু দাউদ, তিরমিজি)

যারা কোরবানির পশুর গোশত প্রক্রিয়াজাত করবেন তারা যেন অবশ্যই মাস্ক ও গ্লাভস পরে কাজ করেন। পশুর গোশত প্রক্রিয়াজাত করার দুটি চাটাইর মাঝে কমপক্ষে যেন তিন ফুট জায়গা থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে ও গোশত প্রক্রিয়াজাতকরণে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধির প্রতি যত্নবান হতে হবে।

ডিজিটাল গরুর হাট

ইবাদত আল্লাহ সন্তুষ্টির জন্য রাসুল (সা.)-এর নির্দেশিত পন্থায় করতে হবে। অন্যথায় এটি গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে কুরবানি না করে কোরবানির টাকা দান করলে কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, নিঃসন্দেহে আমার সালাত ও আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ, আল্লাহর জন্য যিনি পুরো বিশ্বজগতের প্রভু।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৬২)

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সরকারের সহযোগিতায় ই-কমার্স এসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত ‘ডিজিটাল গরুর হাট’ সূবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে। শুধু গরু কেনাই নয়, চাইলে দক্ষ কসাই দিয়ে কোরবানি করিয়ে বাসায় মাংস নিয়ে আসার সুযোগও আছে এই অনলাইন হাটে। সেক্ষেত্রে অতিরিক্ত কিছু চার্জ যুক্ত হবে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে যারা পশু কোরবানি না করে দান করার কথা ভাবছেন তাঁদের জন্য এটি বিকল্প পন্থা হতে পারে। তাছাড়া ঢাকা শহরের যে সব নির্দিষ্ট স্থানে কুরবানি কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, সেখানকার অধিবাসীরা অনায়াসে পশু স্পর্শ না করে অনলাইন কোরবানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কুরবানি করতে পারবে। নিজ উদ্যোগে কোরবানির পশু ক্রয় ও গোশত প্রক্রিয়াজাতকরণের বিকল্প পন্থা হতে পারে এটি। তবে নিজের কোরবানি নিজেই সম্পন্ন করা সুন্নাত।

শেষ কথা

প্রতি বছর ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য ও উৎসব মুখর পরিবেশে কোরবানির ঈদ উদযাপন করা হয় ও পশু কোরবানি করা হয়। করোনা ভাইরাস শুধুমাত্র আমাদেরই নয়, বরং পুরো বিশ্ববাসীকে কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন করেছে। মানুষের শক্তি-সামর্থ্যের বড়াই আল্লাহর ছোট্ট ভাইরাসের সামনে কিছুই নয়। তাই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের সময় এসেছে। সময় এসেছে নিজেদের কৃতকর্মের হিসাব করার।

কোরবানির শিক্ষা আমাদেরকে সত্যিকারের তাকওয়া তথা খোদাভীতি অর্জন করে আল্লাহর দিকে ফেরার সুযোগ করে দিক। কুরবানির আত্মত্যাগের মহীমায় জেগে উঠুক লাখো মুমিনের প্রাণ। পৃথিবীর সকল মানুষকে এই কোরবানির উসিলায় আল্লাহ করোনা ভাইরাসের মহামারী থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, খতিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

78 জন পড়েছেন

Recommended For You

অনুমতি ব্যতীত এই সাইটের কোনো সংবাদ, ছবি অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশ আইনত দণ্ডনীয়