report editorial

উত্তরপত্র দেখার দাবিতে ষোল বছর ধরে আদালতে লড়ছেন মুস্তারী

সম্পাদকীয় …

আত্মবিশ্বাস ও নির্ভরতার প্রবল আকাঙ্ক্ষার কারণেই মেয়েটির মনে জেদ চেপে রয়েছে। কেননা সে জানে, সে কতোটা ভালো পড়াশোনা করেছে, কতোটা ভালো পরীক্ষা দিয়েছে। তার বিশ্বাস ছিলো, খুবই ভালো রেজাল্ট তার আসবে। ভালো ফলাফলের গুণে তার নিজের জীবন সুন্দর হবে। পরিবারের সকলের মুখ উজ্জল করবে। কিন্তু সেই আশায় তার গুঁড়ে বালি হয়ে গিয়েছিলো।

প্রিয় সময়ে ‘উত্তরপত্র দেখার দাবিতে ১৬ বছর ধরে আদালতে লড়ছেন মুস্তারী’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে, রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় সে খুব হতাশ হয়েছিলো। আমরা এমনও জানি যে, রেজাল্ট খারাপ হলে কেউ কেউ হঠাৎই করেই আত্মহত্যা করে বসে। কিন্তু মুস্তারী সে রকম কিছুই করেনি। তবে সে সত্যিটা জানতে চেয়েছিলো।

সেই ২০০৪ সালে তেঁথুলিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেন মুস্তারী। এতে তাকে অকৃতকার্য দেখানো হয়। সে সময় নাবালিকা থাকায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র দেখার দাবিতে তার পক্ষে আদালতে মামলা করেন বাবা মুনসুর। তা’ না দেখাতে শিক্ষা বোর্ড মামলাটি হাইকোর্টে নিয়ে যায়। সেখান থেকে মামলাটি আবার নিম্ন আদালতে আসে।

এভাবেই চলতে থাকে ষোলটি বছর। এই ষোলটি বছর কোনোভাবেই কম সময় নয়। প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, এতে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড, বোর্ডের চেয়ারম্যান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও পরীক্ষাকেন্দ্রের সচিবকে বিবাদী করা হয়। আমরা মাত্র কয়েকদিন পরেই আগামী ১ নভেম্বর ২০২০ মামলাটি ১৭ বছরে পড়বে।

আমরা প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে, ‘মুস্তারী বিদ্যালয়ের নির্বাচনী পরীক্ষায় ৮৭ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাস করেন। ওপরের কভার ঠিক রেখে উত্তরপত্র বদল করার কারণে তার ফলাফল অকৃতকার্য এসেছে।’ তার পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হবে ভেবেছিলো, নিশ্চিত হবে ভেবেছিলো; কিন্তু আশানুরূপ না হওয়ায় মনে খুবই আঘাত পেয়েছিলো। স্বাভাবিকভাবে মোটেও মেনে নিতে পারেনি।

প্রকৃত সত্য জানার অধিকার আছে। আর এখানে মুস্তারীর শতভাগ পাশ করার কথা থাকলেও তার রেজাল্ট খারাপ হওয়াতে চ্যালেঞ্জ করার সঠিক প্রতিদান না পাওয়াতে আদালতের আশ্রয় নিতে হয়েছিলো। প্রত্যেকেরই সত্য জানার অধিকার রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ ষোলটি বছর পার হয়ে গেলেও আজো মুস্তারী তার সত্য জানতে পারেনি। আমরা প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জেনেছি যে, ‘মুস্তারীর বাবা মুনসুর রহমান জানান, মামলাটি আমলে নিয়ে আদালত উত্তরপত্র হাজির করার নির্দেশ দেন। আদালত মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উত্তরপত্র নষ্ট না করার ব্যাপারেও আদেশ দেন।

এজন্য তিনি আদালতের নির্দেশে ট্রাংক ও তালাচাবি কেনার জন্য নির্ধারিত ফি জমা দেন। ওই আদেশের বিরুদ্ধে শিক্ষা বোর্ড হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন করেন। সেখানেও নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখা হয়। পরে শিক্ষা বোর্ড আপিল বিভাগে যায়। ২০০৯ সালের ১২ মার্চ আপিল বিভাগ নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রেখে উত্তরপত্র হাজির করার নির্দেশ দেন।

মামলার ৭ বছর পর ২০১১ সালে শিক্ষা বোর্ড আদালতকে জানায়, ছয় মাসের বেশি শিক্ষা বোর্ডে উত্তরপত্র সংরক্ষণ করা হয় না। তবে এ শিক্ষার্থীর খাতার ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু না বলায় ২০১১ সালের ২১ জুন আদালত বোর্ডের চেয়ারম্যানকে পরবর্তী ধার্য দিনে সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। চেয়ারম্যান সশরীরে হাজির হতে পাঁচ বছর সময় নেন। তারপরও খাতা দেখানো হয়নি।’ তবে বর্তমানে ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকাটা হয়তো যথার্থ; কিন্তু মুস্তারী তার সত্য আজো জানতে পারেনি। তবে কথা হলো, কবে সে তার সত্য জানতে পারবে সেটাও একটা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমরা প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, ‘মুস্তারী দাবি করেন, খারাপ শিক্ষার্থী প্রমাণ করার জন্য পরের বারও তার উত্তরপত্র পরিবর্তন করে দেয়া হয়। ফলে তার ফলাফল আবার খারাপ হয়। তিনি কোনোমতে পাস করেন। হতাশ হয়ে উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা করে এ গ্রেড পেয়ে পাস করেন। এসএসসির ফল খারাপ হওয়ার কারণে তিনি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনই করতে পারেননি। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করেছেন। তিনি বলেন, তার জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি করা হয়েছে। তবে তিনি এই আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চান, যাতে আর কোনো শিক্ষার্থীর জীবনে এ অভিশাপ না নেমে আসে।’

এটা পরিস্কার যে, মুস্তারী ভবিষ্যতে লেখাপড়া করে চিকিৎসক হতে চেয়েছিলো। কিন্তু সেটা তার কপালে জুটলো না। ফলে তার মনে দারুণ কষ্ট ছিলো। একটা চাপা কষ্ট নিয়ে দীর্ঘ ষোলটি বছর লড়াই করে চলেছে মুস্তারী। দীর্ঘ ষোল বছর লড়ে যাওয়ার মাধ্যমে সে তার প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। আইনী লড়াই এখনো চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা হয়তো তার মধ্যে প্রবল। একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মানসে সে এগিয়ে চলেছে। সে চায় না যে, তার মতো আর কোনো শিক্ষার্থীর এমন করুণ পরিস্থিতি ঘটুক। এভাবে অভিশপ্ত জীবন যেন কারো না আসে। সত্যি আমরা কেউ চাই না এভাবে কোনো শিক্ষার্থী জীবনে কষ্ট নিয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুক। মস্তুারীর আইনী লড়াই যেন সফল হতে পারে, যথার্থ হতে পারে-আমরা সেই প্রত্যাশাই করছি।

আমরা খবরের বস্তুনিষ্ঠতায় বিশ্বাসী, সঠিক সংবাদ পরিবেশনই আমাদের বৈশিষ্ট্য

১৭ অক্টোবর ২০২০ খ্রি. ০১ কার্তিক ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৯ সফর ১৪৪২ হিজরি, শনিবার

Add piles sex Diabeties all

 37 সর্বমোট পড়েছেন,  1 আজ পড়েছেন

শেয়ার করুন