report editorial

মা ইলিশ সংরক্ষণে জেলেদের সচেতনতা প্রয়োজন

সম্পাদকীয়…

প্রশ্নটা এভাবে করলে মন্দ হয় না যে, আমরা কবে বুঝবো কোনটাতে আমাদের লাভ বেশি? সেটা আমরা অনেকেই মোটেও চিন্তা করি না। মা ইলিশ ধরে খেয়ে ফেলতে পারলে বুঝি আমাদের তৃপ্তি মিটে যায়। এটা যে আমাদের জন্যে কতোটা ক্ষতিকর, সেটা আমরা বুঝতে চাই না। নদী থেকে জাটকা ধরা ও বাজারে বিক্রি করাতে সাময়িক আমাদের চাহিদাপূরণ হয় মাত্র। কিন্তু সেই জাটকা না ধরে যদি তাদের বড় হতে দেয়া হয়, তাহলে একসময় তা বড় হয়ে জেলেদের মুখে আরো বেশি হাসিফোটাতে পারে। আর আমরাও পরিপূর্ণ হতে পারি ও তৃপ্তিতে ইলিশ খেতে পারি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, মা ইলিশ ধরাতে আমাদের আরো বেশি ক্ষতির শিকার হতে হয়। মা ইলিশ যে ডিম ছেড়ে বাচ্চা দেবে, আর তা বড় হয়ে প্রচুর মাছ আমরা পাবো, সেটা যেমন জেলেরা বুঝে না, তেমনি আমরা যারা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত অর্থাৎ কিনে খাই তারাও বিষয়টি উপলব্ধি করি না।

প্রিয় সময়ে ‘ শিবচরে মা ইলিশ সংরক্ষণ ও সচেতনতায় মানববন্ধন’ শিরোনামে প্রকাশিমা ইলিশত সংবাদের মাধ্যমে ইলিশের প্রতি গুরুত্বের বিষয়টি ফোটে উঠেছে। ‘সচেতনতায় মানববন্ধন’ কথাটির মধ্যে একটা শক্তি লুকিয়ে আছে। মানুষের মাবতাকে জাগিয়ে তুলতে হবে, তাহলে ইলিশ রক্ষা পাবে, আমরা ইলিশ পাবো। এই কথাটির মধ্যে সচেতনতা বিষয়টি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সচেতনতা না থাকলে ইলিশ রক্ষা পাবে না। জেলেদের সচেতন করতে না পারলে হয়তো ইলিশ হারিয়ে যেতে পারে একসময়। নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি না হলে যে ধ্বংস হয়ে যাবে ইলিশের মতো সম্পদ! সুতরাং ইলিশকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। তাই সচেতনতা বাড়াতে মানববন্ধন! সেই সাথে ‘মা ইলিশ ধরব না, দেশের ক্ষতি করব না।’ এই শ্লোগানটিও আমাদের সকলের মনে রাখা উচিত। পাশাপাশি যারা জেলে রয়েছে, তারা হয়তো এই শ্লোগানের গুরুত্ব বুঝেই না। তারা হযতো পেটের দায়ে, আরো লাভের আশায় নদীতে অবৈধ কারেন্ট জাল নিয়ে নেমে যায়। তাদেরকে বেশি বেশি সচেতন করতে হবে।

আমরা প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জেনেছি, ‘ মাদারীপুর জেলাধীন শিবচর উপজেলায় আজ মা ইলিশ সংরক্ষণ ও সচেতনতায় মানববন্ধন করেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ডেভেলপমেন্ট এফর্টস ফর সোসাইটি এন্ড হিউম্যানিটি “দেশ (উঊঝঐ)”। এটি সত্যিই অত্যন্ত প্রশংসার দাবিদার। শুধু তারা নয়, এই সচেতনতা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষেরই হওয়া উচিত। ইলিশ সম্পদকে রক্ষায় আমাদের সকলেরই এগিয়ে আসা উচিত।

অপরদিকে অবাধ্য জেলেদের বাধ্য করাতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ অতীব জরুরী। ক্ষেত্রবিশেষে সাধারণ জনগণ দুষ্টু জেলেদের প্রতিরোধ করতে পারবে না। এতে হিতেবিপরীত হতে পারে। সংঘর্ষ, কিম্বা বড় ধরনের অঘটন ঘটে যেতে পারে। সে হিসেবে প্রশাসনকেই এগিয়ে আসাটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।

প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে আমরা আরো জেনেছি যে, ‘বাংলাদেশ সরকার ১৪ অক্টোবর ২০২০ থেকে ৪ নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ অথবা ক্রয়-বিক্রয় করা নিষিদ্ধ করেছে।’ কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, এই নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও দুষ্ট জেলের দল চুপিসারে নদীতে মাছ ধরতে চলে যায়। সেই সাথে সাধারণ মানুষও এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে। প্রকাশ্যে কিম্বা গোপনে ইলিশের ধ্বংস সাধনে উঠে পড়ে লেগে যায়। তাদের অনেকেই সরকারি আইন মেনে চলেন না। অথচ, আমাদের সকলকেই সচেতন করতে এগিয়ে আসা উচিত।

সেই মানবন্ধনে শোভা পেয়েছে আকর্ষণীয় সব শ্লোগান। যা’ প্রত্যেকটি মানুষকে সচেতন করতে যথেষ্ট।
ধরব না মাছ ২২ দিন,
মা ইলিশ ছাড়বে ডিম,
মা ইলিশ রক্ষা করি,
ইলিশ মাছের মজুদ গড়ি।’
এ ধরনের শ্লোগান সম্বলিত ব্যানার, লিফলেট, প্ল্যাকার্ডসহ সচেতনতা মূলক উপকরণ ও বার্তা নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দেশ (উঊঝঐ) এর সদস্যরা মানব বন্ধনে অংশগ্রহন করেছেন। এই শ্লোগানে আমাদের সকলকে জেগে উঠা উচিত।

আমরা মনে করি, দেশের বিভিন্ন সংগঠন যদি সাধারণ জনগণকে সচেতন করতে এগিয়ে আসে তাহলে দেশের প্রতিটি মানুষ ইলিশ সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্ব দিবে। ইলিশ রক্ষা মানে-সম্পদ রক্ষা করা; আর আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে ইলিশকে বাঁচাতে পারবো। অন্যথায়, ইলিশ বিলুপ্ত হলে হয়তো আমাদের নতুন প্রজন্ম ইলিশের কাল্পনিক গল্পই শুনবে। তারা স্বচক্ষে ইলিশ না দেখে ছবি দেখে ইলিশের চিত্র আঁকবে। কিন্তু বাস্তবে তারা ইলিশের স্বাদ পাবে না! আমরা এমনটা মোটেও আশা করি না।

এটা সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, ‘প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশের পেটে ডিম থাকে প্রায় ২.৫ লক্ষ। শুধু তাই নয়, ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে আমরা প্রথম। বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের ৭৫ ভাগ বাংলাদেশ থেকে হচ্ছে। প্রতি বছর ৯-১০% বাড়ছে উৎপাদন এবং নয় বছরে ৬৬% বেড়েছে। আগামী মৌসুমে ৬ লাখ মেঃ টন উৎপাদন হবে আশা করা হচ্ছে। যার বাজার মূল্য ১৮ হাজার কোটি টাকা’ হবে। সুতরাং আমাদের দেশের জন্যে বিশাল অর্জন এই মা ইলিশ রক্ষা করা। সত্যিই আমরা যদি মাত্র ২২টা দিন মা ইলিশকে ডিম ছাড়তে দেই; না ধরি, তবে, আগামী কয়েক বছরে প্রচুর ইলিশ খুব কম দামে আমরা পাবো। সেই সাথে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আসবে, বাড়বে কর্মসংস্থান। এমনিতে এখন এ খাতে ২০-২৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্ট হয়েছে।’ এটা বিশাল বাস্তবতা ও সম্ভাবনার কথা আমাদের জন্যে। সুতরাং আসুন আমরা দেশের এই মূল্যবান সম্পদকে বাঁচাতে এগিয়ে আসি। নিজে সচেতন হই, প্রতিবেশী এবং বন্ধুদের সচেতন করে সুনাগরিকের দায়িত্ব পালন করি।

পরিশেষে বলতে চাই যে, ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। ইলিশকে নিয়ে অনেক কবিতা আছে, গল্প আছে, প্রবন্ধ রয়েছে ভুরি ভুরি; শিল্পীদের কণ্ঠে শুনি চমৎকার গান। সুতরাং ইলিশকে বাঁচাতে পারলে নতুন প্রজন্মকে আমরা উপহার দিতে পারবো ইলিশের স্বাদ। সেই সাথে রক্ষা করতে পারবো ইলিশকে নিয়ে কবির লেখা কবিতা ও গল্প, লেখকের ভুরি ভুরি লেখা, আর শিল্পীর গাওয়া গান। সুতরাং আসুন, আমরা মা ইলিশকে রক্ষায় এগিয়ে আসি; নিজে সচেতন হই, অন্যকেও সচেতন করি।

 39 সর্বমোট পড়েছেন,  1 আজ পড়েছেন

শেয়ার করুন