chandpur report 1451

কুমিল্লায় অধিকাংশ বধ্যভূমি অরক্ষিত!

৫০টিরও বেশি বধ্যভূমির ইতিহাস জানা নেই নতুন প্রজন্মের! 

জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল, কুমিল্লা ব্যুরো:
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে কুমিল্লার তৎকালীন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে। এরপর দীর্ঘ নয় মাসে কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় পাকবাহিনী। এদের বর্বর হত্যাকা-ের শিকার হয় কুমিল্লার হাজার হাজার নিরীহ জনতা। আজও পাক বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানের অরক্ষিত বধ্যভূমি ও গণকবর গুলো।

কুমিল্লা জেলা জুড়ে রয়েছে ৬০টিরও বেশি বধ্যভূমি। এরমধ্যে কিছু আবিষ্কৃত হলেও অধিকাংশেরই এখনো কোনো চিহ্ন নেই। এমনকি এসব বধ্যভূমিগুলোতে মাটি চাপা দেয়া শহীদদের সংখ্যাও নির্ণয় করা যায়নি। তাই নতুন প্রজন্মের সিংহভাগই জানে না এসব বধ্যভূমির ইতিহাস ও ভয়ানক স্মৃতির কথা। জেলাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব বধ্যভূমির ইতিহাস ও ভয়ানক স্মৃতির কথা অজানা রয়ে গেছে নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগ তরুণ-তরুণীর কাছে।

স্বাধীনতা পরবর্তী ৫ দশকে কুমিল্লায় আবিষ্কৃত গণকবর ও বধ্যভূমির মধ্যে- সদর রসুলপুর বধ্যভূমি, রামমালা বধ্যভূমি, সদর দক্ষিণের জগতপুর গণকবর, চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথ দীঘি ইউনিয়নের বেতিয়ারা গণকবর, নাঙ্গলকোট বধ্যভূমি, দেবিদ্বার বধ্যভূমি, লাকসামের বেলতলী বধ্যভূমি, কৃষ্ণপুর ধনঞ্জয় বধ্যভূমি, ডাকাতিয়া নদীর চিতোষী খেয়াঘাট বধ্যভূমি, মুদাফফরগঞ্জ বধ্যভূমি, চান্দিনার হাড়ং গণকবর, কুমিল্লা সদর উপজেলার আমড়াতলির গণকবর, কোটেশ্বর যুদ্ধ স্মৃতি, জগতপুর গণকবর, চিতোষী খেয়াঘাট বধ্যভূমি, কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের এমআর চৌধুরী গ্রাউন্ডের পাশের বধ্যভূমি উল্লেখযোগ্য।

এর মধ্যে কিছু বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক লাগানো হয়েছে, কোনোটায় নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। তবে, সংরক্ষণ করা গণকবর আর বধ্যভূমিগুলোর বেশিরভাগই এখন বেহাল অবস্থায়। নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতিফলকগুলো যথাযথ পরিচর্যা, সংস্কার ও দেখভালরে অভাবে ম্লান হতে বসেছে এসবের সৌন্দর্য। অবকাঠামোগত দিক থেকে কোনোটা অবস্থা একেবারেই নাজুক। আবার অরক্ষিত অবস্থায় থাকায় কোনো কোনো বধ্যভূমি পরিণত হয়েছে গোচারণ ভূমিতে।

কোটেশ্বর যুদ্ধ স্মৃতি:
ভারতীয় সীমান্তবর্তী কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর উপজেলার কোটেশ্বরে হানাদার বাহিনীর এক সদস্যকে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধারা। এর পর মরিয়া হয়ে উঠে পাক হানাদার বাহিনী। হামলা চালায় ওই গ্রামের নীরিহ জনতার উপর। হত্যা করে বেশ কয়েকজনকে। পরবর্তীকালে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা এ.এন.এম ওয়াহিদুর রহমানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মহানমুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০১০ সালে ২৭ মার্চ তৎকালীন প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব ওমর ফারুকের উদ্যোগে কোটেশ্বর গ্রামের ত্রিমুহনায় ‘প্রতিরোধ’ নামে একটি স্মৃতি ভষ্কর্য প্রতিষ্ঠা করে জেলাপরিষদ। যথাযথ যতেœর অভাবে এর সৌন্দর্য ম্লান হতে চলেছে।

কৃষ্ণপুর ধনঞ্জয় বধ্যভূমি:
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে সদর উপজেলার পাচঁথুবী ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় এলাকায় হানা দিয়ে শিশু-নারীসহ ৩৭ জনকে নির্বিচারে হত্যা করে পাক বাহিনী। পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১৬ জুন জায়গাটি চিহ্নিত করে এখানে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহমুদ হাছান। এটি চিহ্নিত হওয়ার পর থেকে আর কোনো সংস্কার হয়নি।

সদর রসুলপুর বধ্যভূমি:
জেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার রসুলপুর রেলস্টেশনের অদূরে ৫ শতাধিক সাধারণ নারী-পুরুষকে ও মুক্তিযুদ্ধাকে হত্যা করে মাটি চাপা দেয় পাকাহানাদার বাহিনী। পরে ২০০৫ সালে এটিকে বধ্যভূমি হিসেবে স্বীকৃত দেয়া হয় এবং এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

রামমালা বধ্যভূমি:
নগরীর রামমালা এলাকায় অবস্থিত সার্ভে ইন্সটিটিউটের ভেতরে আশ্রয় নেয়া ৫ শতাধিক সাধারণ মানুষ ও আনসার সদস্যকে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। পরে গর্ত করে গণকবর দেয়া হয়। ১৯৯৪ সালে কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শফিউল আহমেদ বাবুল এ বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক স্থাপন করেন। বছর জুড়ে এ বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভটি অযতœ অবহেলায় থাকলেও বিজয় দিবস এলে এটি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে রং করা হয়।

বেলতলী বধ্যভূমি:
কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশনের দক্ষিণে প্রায় দুই হাজার ফুট এলাকা জুড়ে বেলতলী বধ্যভূমি। এ বধ্যভূমিতে কমপক্ষে ১০ হাজার বাঙ্গালিকে নির্মমভাবে হত্যার পর মরদেহ মাটি চাপাঁ দিয়েছিল পাক হানাদার বাহিনী। এই সময় পাক বাহিনী পাশের সিগারেট ফ্যাক্টরিতে শতশত নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করে মরদেহ বধ্যভূমিতে মাটি চাপাঁ দেয়।

স্থানীয় শ্রীধাম চন্দ্র দাস জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি লাকসাম জংশনের পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। ওই সময় তিনি ও তার মামা উপেন্দ্র চন্দ্র দাস হানাদারদের নির্দেশে লাশ মাটি চাপা দিতেন। কুমিল্লা জলার দক্ষিণ এলাকা, চাঁদপুর, ফেনী ও নোয়াখালী অঞ্চল। এসব অঞ্চল থেকে পাক হানাদার বাহিনী শত শত যুবক-যুবতীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষকে ট্রাকে করে তুলে নিয়ে আসত। এদের মধ্যে যুবতীদের উপর যৌন নিপীড়ন শেষে দেহের বিভিন্ন অঙ্গ কেটে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করত।
এ বধ্যভূমি খুঁড়লেই বেরিয়ে আসে মানুষের হাড় কঙ্কাল। দীর্ঘ দিন অযতেœ অবহেলায় পড়ে থাকার পর রেল কর্তৃপক্ষ ২০১৪ সালে স্বাধীনতার ৪২ বছর পর প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে এখানে একটি স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করে।

দেবিদ্বার বধ্যভূমি:
১৯৭১ সালের ২৪ জুলাই পাক হায়ানারা মুরাদনগর উপজেলার বাখরাবাদ গ্রামে হত্যাযজ্ঞ চালায়। এসময় ১৪২ জনসহ আরও ১৯ জনকে ব্রাশফায়ারে নির্মমভাবে হত্যা করে দেবিদ্বার উপজেলা সদরের ডাক বাংলোর সামনে মাটি চাপা দেয়। এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

নাঙ্গলকোট বধ্যভূমি:
জেলার নাঙ্গলকোটের পরিকোট বধ্যভূমিতে নোয়াখালী, নাঙ্গলকোট ও আশপাশের অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে তিনটি কবরে গণ সমাহিত করে পাক হানাদার বাহিনী। এ বধ্যভূমিতে কতজনের মরদেহ সমাহিত হয়েছে তা অজানা রয়ে গেছে।

চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারা গণকবর:
১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগন্নাথ দীঘি ইউনিয়নের বেতিয়ারা নামক স্থানে ন্যাপ- কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর ৯ জন বীরযোদ্ধা পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। সেখানে শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।

চিতোষী খেয়াঘাট বধ্যভূমি:
কুমিল্লার ডাকাতিয়া নদীর চিতোষী খেয়াঘাট বধ্যভূমিতে প্রতিদিন অনেক নারী-পুরুষকে হত্যা করা হয়। স্থানীয় মানুষজন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসজুড়ে চলে এখানে হত্যাযজ্ঞ। তা এক দিনও বাদ পড়েনি।

ময়নামতি সেনানিবাসের বধ্যভূমি:
১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসে চলে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘কুমিল্লা ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে মোট ১২টি গণসমাধি খনন করে এ পর্যন্ত সাত হাজার নরকঙ্কাল পাওয়া গেছে।’ সেনানিবাসে অবস্থানরত বাঙ্গালি সেনা কর্মকর্তা, সেনা সদস্য, বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ এবং বাংলা ভাষার অবিসংবাদিত নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত্বসহ কুমিল্লা শহর থেকে ধরে নেয়া ব্যক্তিবর্গ মিলিয়ে ৫ শতাধিক লোককে হত্যা করা হয়। তবে, পুরো সেনানিবাস এলাকাটাকে পাকিস্তানি বাহিনী বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিল। তবে, এমআর চৌধুরী গ্রাউন্ডের পাশের বধ্যভূমিটি সংস্কার করে সুন্দর ভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছে সেনানিবাস কর্তৃপক্ষ।

জগতপুর গণকবর:
এদিকে একটি অমীমাংসিত ইস্যু হয়েই রয়েগেছে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার জগতপুর গণকবর। ১৯৭১ সালের ওই দিনে একটি যাত্রীবাহী বাসে হামলার ঘটনায় বেশকিছু লোক নিহত হয়। ওইসব বেওয়ারিশ মরদেহ পরিচয় নিয়ে রয়েছে ভিন্ন মত। স্বাধীনতার এত বছর পরও জগতপুর গণকবরের মরদেহের পরিচয় নিয়ে ধোয়াশা কাটেনি। কারও কারও মতে ওই বাসে রাজাকাররা পালাচ্ছিল। আবার অনেকের দাবি বাসে ব্যবসায়ীসহ মুক্তিকামী মানুষ ছিল। সব মিলিয়ে বিষয়টি এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেলো।

কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার শফিউল আহমেদ বাবুল জানান, ইতিমধ্যেই প্রায় ৩০টির মত বধ্যভূমি চিহ্নিত করে সেখানে ফলক উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেন, আমি চেষ্টা করেছি বধ্যভূমির ইতিহাস টিকিয়ে রাখার জন্য। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান তারিকুর রহমান জুয়েল বলেন, আমার পিতা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ফেণী জেলায় শহীদ হয়েছেন। একজন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ হলে আমি সবচে বেশি আনন্দিত হই। সুতরাং একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে অন্তত: আমার নির্বাচনী এলাকার যুদ্ধ স্মৃতিগুলো সংরক্ষণে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা অব্যাত থাকবে।

উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ ৯ মাসের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হায়েনাদের পিছু হটতে বাধ্য করে বীর মুক্তিযোদ্ধারা। অবশেষে ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লাকে মুক্ত করতে সক্ষম হন তারা। ওই দিন বিকেলে মুক্ত কুমিল্লার প্রথম প্রশাসক অ্যাডভোকেট আহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে কুমিল্লা নগরীর ঐতিহাসিক টাউন হল মাঠে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।

শেয়ার করুন