saddam bongobondu

আমার শেখ মুজিব : আমার ছেলেবেলা

বঙ্গবন্ধুর ১০১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ রচনা

এ এম সাদ্দাম হোসেন :
শিক্ষার গণ্ডি বেশি দূর পেরুতে না পারলেও আদর্শলিপির হাতে খড়ি বাবার হাতেই প্রথম পেয়েছিলাম। সময়টা তনখন ’৯৭/৯৮ হবে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাবা পড়তে বসাতেন; কখনো সকালেও। সত্যি বলতে আমার পড়ালেখায় তেমন আগ্রহ ছিলো না, হতে পারে সেটি বয়সের দোষ। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের খবর মায়ের মুখেই প্রথম শুনি। যদিও তখনো বুঝিনি মুক্তিযুদ্ধ কী।

মায়ের মুখে আরো শুনলাম একজন মহান মানুষের কথা। যার গর্জণে পুরোদেশবাসী জেগে উঠেছিলো। আদর্শলিপির পাতায় সেই মানুষটির ছবি দেখিয়ে মা বলতেন- “ইনি-ই সেই মহান ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমান, যার নেতৃত্বেই মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয় এবং দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।” আহঃ! কী মায়া ভরা চেহারা তাঁর!

মায়ের মুখে আরো শুনলাম ’৭৫-এর কালো রাতে কী নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে। মর্মাহত হলাম! মনটা খুব খারাফ হয়ে গেলো। ছোট্ট মনে আরো আঘাত পেলাম আমারই মতো ছোট্ট রাসেলের কথা শুনে, যার ছবি তখনো আমি দেখিনি। সেই থেকেই ছোট্ট মনে বিষাদের মেঘ জমতে শুরু করে, যার অবদান রবে আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।

মূলত সেই থেকেই বঙ্গবন্ধুর দল করবো- মনে মনে স্থির করলাম। তখনো আমার জানা ছিলো না- তাঁর দলের নাম ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’, শুধু এইটুকুই ভাবতাম- শেখ মুজিব যেই দলের, আমিও সেই দলের। তাই আমি রাস্তায় কোনো মিছিল মিটিং দেখলেই “জয় বাংলা” বলে দৌঁড়ে সেখানে যেতাম।

এর অর্থ এই না যে, আমি টোকাই ছিলাম। কিছু কিছু মানুষ আছেন যারা মিছিল মিটিংয়ে ছোটদের টোকাই বলে আখ্যায়িত করে।

নির্ঘাত তারা বোকা! কারাণ, শেখ মুজিব এমন একটি নাম, যার প্রেমে ছোটবড় সবাই পড়তে পারে। এর অর্থ এই না যে, ছোটরা টোকাই, আর বড়রা কর্মী কিংবা নেতা। আর এই “জয় বাংলা” বলায় খেসারত দিতে হয়েছে আমার ৭/৮ বছর বয়সে। আমার আবছা মনে আছে- সময়টা তখন ’৯৮ কিংবা ’৯৯ হবে। তারিখ বার মনে না থাকলেও এটি মনে আছে যে- সেদিন হরতাল ছিলো।

হরতাল কী, তা বুঝার মতো বয়স তখনো আমার হয়নি। চাঁদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র শপথ চত্বর¯’ রেলওয়ে বাইতুল আমিন জামে মসজিদের পুরাতন অযুখানার সামনে অনেক মানুষের জটলা দেখতে পেলাম। তারা রিকশা চলাচলে বাধা দিয়েছিলো।

আমি দৌঁড়ে সেখানে গিয়ে চিৎকার করে বললাম- “জয় বাংলা।”

ব্যস, এটি আমার কাল হয়ে দাঁড়ালো। তাৎতক্ষণিক একটি চড় আমার বাম গালে এসে লাগলো। অনেক্ষণ আমার কানের চারপাশে ঘণ্টা বাজতে লাগলো। অনেক ব্যথা পেয়েছিলাম।

আরো কিছু যুবক এগিয়ে এসে হুংকার ছেড়ে বললো- কী বললি তুই? সেই থাপ্পরের জ্বালা আজো আমার বাম কান বয়ে বেড়াচ্ছে। সত্যি বলতে কী- সেই থেকে আমি বাম কানে কিছুই শুনি না!

কারো কাছে কখনো প্রকাশ করিনি সেই কথা, এমনকি মায়ের কাছেও না! স্বাধীন বাংলার মহান স্থপতি বাঙালি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখার সুযোগ পেয়ে- লেখনির মাধ্যমেই যা প্রকাশ করলাম। তখনো বুঝতে না পারলেও, পরবর্তীতে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি- হরতালটা কাদেও ছিলো ও কেন তারা আমায় থাপ্পর মেরেছিলো।

নীরবে কাঁদতে কাঁদতে বাসার দিকে এগুলাম আর মনে মনে বললাম- হে শেখ মুজিব! তোমার কথা বলেছি বলে আমার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। তুমি দেখতে পাচ্ছো কী!

হিতের বিপরীত ঘটলো, তাদের সেই থাপ্পরের পর থেকেই শেখ মুজিবের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আরো বেড়ে গেলো।

শেয়ার করুন