editorial chandpur report logo

শিশুদেরকে আদর-ভালোবাসার মাধ্যমেও শিক্ষা দেওয়া যায়

সম্পাদকীয় …

শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রকে পেটানোর বিষয়টি অত্যাচারের পর্যায়ে পড়ে। স্কুলে বেত নিয়ে যাওয়া ও ছাত্রদের মারধর করা অন্যায়। এটা আমরা সকলেই জানি। তবুও মাঝে মাঝে এ ধরনের খবর শুনে আমরা হতবাক হয়ে যাই-শিক্ষকেরা ছোট ছোট কোমলমতি শিশুদের বেতন দিয়ে মারধর করে থাকেন। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না সেটাই সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়।

আমরা অতীতে এমন অনেক ঘটনা দেখেছি যে, শিক্ষক কর্তৃক কোনো শিশুকে মারধর করলে বা অত্যচার করলে আইনের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। কিন্তু এমন একটি খবর আমরা জেনেছি, যে ঘটনা আমাদের দারুণভাবে শিক্ষা দিয়েছে যে, কীভাবে ক্ষমা করতে হয় ও প্রতিবাদ জানাতে হয়। কোনো ঝামেলা ছাড়াই, বরং উল্টো ক্ষমা করে দেয়ার লিখিত ভাষা প্রকাশ করেছেন শিশুদের মা-বাবা।

চাঁদপুর রিপোর্টে‘ শিক্ষার্থীকে বেধড়ক পিটুনি : ভাইরাল সেই শিক্ষকের শাস্তি চান না শিশুটির বাবা-মা’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদটি শান্তি প্রিয় মানুষদের ভালো ব্যবহার সম্পর্কে পাঠকবৃন্দ জানতে পেরেছেন। এরচেয়ে আর ভালো ব্যবহার কী হতে পারে। আমরা ঘটনার মাধ্যমে জেনেছি যে, ইচ্ছা করলেই শিশুর মা বাবা আইনের আশ্রয় নিতে পারতেন, মামলা করে শাস্তির দাবি জানাতে পারতেন। কিন্তু ক্ষমা করে দেয়ার মধ্য দিয়ে একটি উদাহরণ স্থাপন করেছেন শিশুর মা বাবা। অথচ কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আবেদন না করে, ক্ষশা করে দিয়ে শিক্ষকের বিবেকে দারুণভাবে আঘাত করেছেন। ক্ষমা করে দেয়ার মধ্যদিয়ে ঐ শিক্ষককে মানবতার দিক দিয়ে লজ্জায় ফেলেছেন বলে আমরা মনে করছি।

তবে প্রাথমিকভাবে ক্ষমা করে দিয়েও তার শেষ রক্ষা হয়নি। সেই শিক্ষককে গ্রেপ্তারের পর আবার অভিভাবকদের মামলায় পুনঃরায় গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।

প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, ‘চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এক শিশু শিক্ষার্থীকে বেধড়ক পিটুনি দিয়ে আহত করেছে। অভিযুক্ত সেই মাদ্রাসা শিক্ষকের শাস্তি চাইলেন শিশুটির মা বাবা। উপরন্তু ঐ শিক্ষককে আটক করার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গিয়ে আইনগত ব্যবস্থা না নিতে লিখিতভাবে অনুরোধ জানান। এতে এটা পরিস্কার যে, শান্তিপ্রিয় মানুষরা এমনই হয়। অর্থাৎ আর এ বিষয়ে এগিয়ে না গিয়ে পরাজিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শান্তি স্থাপন করে জয়কে ছিনিয়ে নিয়ে আসা।

ঘটনার বিবরণে জানা যায় যে, ‘মায়ের কাছে যাওয়ার অপরাধে ওই শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে পিটিয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষক। নির্যাতনের ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, শিক্ষক ইয়াহিয়া তার ছাত্র ইয়াসিন ফরহাদকে মাদ্রাসার বাইরে থেকে ধরে একটি কক্ষে নিয়ে বেত দিয়ে নির্মমভাবে পেটাচ্ছেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে হাটহাজারী পৌরসভার ফটিকা গ্রামের মারকাজুল কোরআন ইসলামিক একাডেমিতে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষক হাফেজ ইয়াহিয়াকে আটক করে পুলিশ। তবে ওই শিক্ষার্থীর বাবা-মা অভিযুক্ত ওই মাদ্রাসাশিক্ষককে ক্ষমা করে দিয়েছেন মর্মে একটি লিখিত বক্তব্য দেওয়ায় প্রশাসন এ ঘটনায় দোষী শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি।’

এ থেকে অবশ্য সেই শিক্ষকের এটা শিক্ষা নেয়া উচিত যে, তার আচরণের জন্যে তাকে ক্ষমা করে দিয়ে তাকে পরাজিত করা হয়েছে। তাকে সংশোধনের একটি দারুণ সুযোগ করে দেয়া হয়েছে; যেন ভবিষ্যতে আর অন্য কোনো শিশুকে এভাবে না পেটানো হয়। কিন্তু অন্য অভিভাবকরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন। শিশুটির মা-বাবা ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নিতে রাজি না হলেও অন্যান্য অভিভাবকরা ঠিকই নিন্দা জানিয়েছেন। নির্যাতিত শিশুটির মা-বাবা অতি দুঃখ পেয়েছেন তাদের শিশুর প্রতি অত্যাচার করায়, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা তারা কান্নাকাটি করেছিলেন ও মা বাবা দুইজন আমার অফিসে গিয়ে শিক্ষককে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। তারা ওই শিক্ষককে ক্ষমা করে দিয়েছেন জানিয়ে মামলা করবেন না বলে জানান। তারা ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে লিখিতভাবে অনুরোধ করেছেন। এতে ঐ শিক্ষককে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তবে আদালতের আদেশে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।

আমরা চাই, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও শিক্ষকদের জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর জন্যে আমূল সংস্কার। কারণ সবাই শিক্ষক হতে পারে না। তিরিক্ষি মেজাজের মানুষ শিক্ষক হওয়ার উপযোগী নয়। শিশুদেরকে শিক্ষাদানের জন্যে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ মাদ্রাসা শিক্ষকদের নিতে হবে। তবেই তিনি শিক্ষক হতে পারবেন।

অন্যায় নির্যাতনকারী শিক্ষকের বোধোদয় হোক। অন্তত মানবিক দিক দিয়ে তার লজ্জা হওয়া উচিত। কেননা একটি শিশুকে অত্যাচার করার কারণে তার মানসিক বিকারের বিষয়টি স্পষ্ট। কোমলমতি শিশুদের সাথে এভাবে অত্যাচার করা মোটেও উচিত নয়-এসব ঐ শিক্ষকের বোঝা উচিত।

শিশুদের সেন্টিমেন্ট সম্পর্কে ঐ শিক্ষকের জ্ঞান থাকা দরকার বলে আমরা মনে করি। তাছাড়া আমরা বলবো যে, শিশু নিরাপত্তা নীতিমালা ও শিশু সুরক্ষা সম্পর্কে এ ধরনের শিক্ষকদের জন্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। কোমলমতি শিশুদের সাথে কোনোভাবেই ক্ষিপ্ত হওয়া উচিত নয়। বরং ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে ভালোবাসা দিয়ে শিশুদের আগলে রাখতে হয়। ক্ষমাই মহত্বের লক্ষণ ও প্রতিবাদের নীরব ভাষা!

তবে এ ক্ষেত্রে ক্ষমা কতটুকু করতে হবে, তারও পরিধি আছে। মাদ্রাসাগুলোতে ব্রিটিশ আমল থেকে যা হচ্ছে, নির্মমভাবে পেটানোর মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার রীতি তা রহিত করতে হবে।

শিশুদেরকে আদর-ভালোবাসার মাধ্যমেও যে শিক্ষা দেওয়া যায়, তা মহানবী (সা.)-এর জীবনী পড়লে বুঝা যাবে। মহানবী (সা.) শিশুদের সাথে সব সব সময় কোমল ব্যবহার করতেন, তাদেরকে কোমলতার সাথে আদর-স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু বুঝিয়ে দিতেন। তাই আমরা মহানবী (সা.)-এর জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, তদানুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থাকে গড়ে তুলবো।

সুতরাং আমরা চাই, মাদ্রাসাগুলোতে সঠিক পন্থায় শিক্ষক নিয়োগ প্রদান করা হোক এবং কর্তৃপক্ষের উচিত, এ ধরনের শিক্ষকদের মোটিভেশন দেয়া ও তাদের জন্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। যেন তারা শিশুদের সাথে কেমন আচরণ করবে সে বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে পারে।

শেয়ার করুন