7 march bongobondu

৭ মার্চ : নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন

মিজানুর রহমান রানা :

বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থপতি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে এসেছিলেন। তিনি কর্মী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন। কোনোদিন নেতা হবার আকাক্সক্ষা তাঁর ছিলো না। তবুও তাঁর কর্মদক্ষতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং সর্বোপরি দেশপ্রেমই তাকে যোগ্যতার আসনে বসিয়েছিলো। তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য ছিলো শোষিতের গণতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। বাংলার সর্বশ্রেণীর জনসাধারণের আশা-আকাক্সক্ষা বেদনা-বিক্ষোভ সর্বোপরি আবহমান বাংলার সর্বময় বৈশিষ্ট্যকে তিনি তার হৃদয়ে ধারণ করেছিলেন।

এদেশের মানুষ যখন পাকিস্তানীদের অত্যাচার বঞ্চনায় হতাশ হয়ে মুক্তির পথ খুঁজছিলো তখনই তিনি এদেশের মানুষের ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে শুরু করলেন জাতির মুক্তির সংগ্রাম। বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের সার্থক উত্তরণের ক্ষেত্রে তাঁর যুগান্তকারী ভূমিকা স্বদেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিকভাবে নিপীড়িত মানুষের শোষণ মুক্তির সংগ্রামে সহমর্মী এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছিলো। বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমান একের পর এক আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিতে লাগলেন।

এর ফলে বাংলার মানুষের মুক্তিদূত ও গণমানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল। অথচ ষড়যন্ত্রের ক‚টকৌশলে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলো না। চললো সীমাহীন ষড়যন্ত্র।

১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানের এক জনসমুদ্রে ঘোষণা করেন, ‘আজ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সকলে জানেন এবং বোঝেন আমরা আমাদের জীবন দিয়া চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা চট্টগ্রাম খুলনা রাজশাহী রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে।

আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ অধিকার চায়। কী অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে ও আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্লি বসবে আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো এবং এদেশের ইতিহাসকে আমরা গড়ে তুলবো। এদেশের মানুষ অর্থনীতি রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবেন। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলছি বাংলাদেশের করুণ ইতিহাস বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস এই রক্তের ইতিহাস মুমূর্ষু মানুষের করুণ আর্তনাদÑ এদেশের করুণ ইতিহাস, এদেশের মানুষে রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।

১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খাঁ মার্শাল ল’ জারি করে ১০ বছর আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের সময় আমাদের ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬১ সালের আন্দোলনে আযুব খাঁর পতনের পর ইয়াহিয়া এলেন। ইয়াহিয়া খান বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেনÑ আমরা মেনে নিলাম। তারপর অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হলো। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে তাকে অনুরোধ করেছিলাম ১৫ ফেব্র“য়ারি তারিখে আমাদের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। ……আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। দেশের মানুষের অধিকার চাই।….এদেশের মানুষকে খতম করা হচ্ছে, বুঝে-শুনে চলবেন, দরকার হলে সমস্ত চাকা বন্ধ করে দেয়া হবে। আপনারা নির্ধারিত সময়ে বেতন নিয়ে আসবেন। বেতন যদি না দেয়া হয়, যদি একটি গুলিও চলে, তাহলে বাংলার ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলÑ যার যা আছে তাই দিয়ে শত্র“র মোকাবেলা করতে হবে। রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিতে হবে। আমরা তাদের ভাতে মারবোÑ পানিতে পানিতে মারবো। আমি যদি হুকুম দেবার জন্য নাও থাকি, যদি আমার সহকর্মীরা না থাকেন, আপনারা সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন।… সাত কোটি মানুষকে আর দাবায়ে রাখতে পারবা না। বাঙালিরা যখন মরতে শিখেছেÑ তখন কেউ তাদের দাবাতে পারবে না…..। এই বাংলা হিন্দু মুসলমান যারা আছে আমাদের ভাই। বাঙালি অ-বাঙালি তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমদের ওপর। আমাদের যেন বদনাম না হয়।…….রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো। দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল­াহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’

বস্তুতঃ বঙ্গবন্ধুর এ ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকেই বাঙালি জাতি একটা সত্যিকার অর্থে দিক-নির্দেশনা খুঁজে পায়। বঙ্গবন্ধুর জ্বালাময়ী ভাষণে এমন অনেক কিছুই লুকায়িত ছিলো যা বুঝতে একটু সময় লেগেছিলো। তিনি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি জনগণের মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই। কারণ তিনি যদি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন, তাহলে পাক বাহিনী তাৎক্ষণাৎ দেশের অপ্রস্তুত সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণের একটা অজুহাত পেয়ে যেত।

বস্তুতঃ তিনি ৭ মার্চেই অন্যভাবে বলে দিয়েছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ঘোষণাটা যদি স্বাধীনাতার জন্যে না-ই হতো তাহলে কেন তিনি বলেছিলেন, ‘এবাবের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’? কেন বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তি সংগ্রাম’?

বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাঁকে জীবনের প্রায় অধিকাংশ সময়ই কারাবরণ করতে হয়েছিলো। সইতে হয়েছিলো অপরিসীম অত্যাচার লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। রেসকোর্স ময়দানে পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা ঘোষণাকালের কিছু পরে রাত ১টা ২০ মিনিটের সময় একদল পাকসেনা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘেরাও করে ফেলল। টিক্কাখানের তত্ত¡াবধানে গ্রেফতার করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। তার তিনদিন পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় করাচিতে। বাঙালি জাতি আর বসে থাকলো না। দেশমাতাকে রক্ষার জন্যে তারা শুরু করলো মুক্তিযুদ্ধ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সারাজীবনের সংগ্রাম, আন্দোলন, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও বাংলার আপামর মানুষের মুক্তিসংগ্রামে ১৯৭১ সালে বহু রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হলো স্বাধীনতা। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে এলেন স্বাধীন বাংলাদেশে। ফিরে এসে তিনি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘…আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে। আমার সোনার বাংলা আজ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার উদ্দেশ্যে আমি সালাম জানাই।…বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছে, তারা বীরের জাতি, তারা নিজেদের অধিকার অর্জন করে মানুষের মত বাঁচতে জানে। ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক ভাইয়েরা আমার, আপনারা কত অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেছেন, গেরিলা হয়ে শত্র“র মোকাবেলা করেছেন, রক্ত দিয়েছেন দেশমাতার জন্যে। আপনাদের এ রক্তদান বৃথা যাবে না।….৭ মার্চ আমি … বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলুন। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রামÑ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আপনারা সেই স্বাধীনতা এনেছেন। আজ আবার বলছি, আপনারা সবাই একতা বজায় রাখুন। ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। একজন বাঙালির প্রাণ থাকতেও আমরা এই স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেব না।…এখন যদি কেউ বাংলাদেশের স্বাধীনতা হরণ করতে চায়, তাহলে সে স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্যে মুজিব সর্বপ্রথম প্রাণ দেবে।’
তিনি সত্যিই প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতেও রাজি ছিলেন। তিনি বাঙালির জন্যে, বাংলার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে লিখে গিয়েছিলেন, ‘সোনার বাংলা’। নব প্রজন্মের চোখে তাঁর সুমহান ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আদর্শ থাকবে চিরভাস্বর ও প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে। আজকের নব প্রজন্ম তাই জেগে ওঠেছে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকের মধ্যখানে লালন করে।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তাই তারা মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে কথায় কাজে এবং সবখানে। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নব প্রজন্মের মূল্যায়ন চিন্তাধারা যদি ক্রমশঃ বুকের গহীনে লালন করে সে অনুযায়ী দেশের জন্যে অর্থপূর্ণ কাজ করা যায় তাহলে আমাদের দেশটা হয়ে ওঠবে সত্যিকার সোনার বাংলা, যার সম্পর্কে কোনো বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

শেয়ার করুন