chandpur report 1993

আমরা সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকিতে আছি

মিথেন গ্যাস নিঃসরণের হটস্পট মাতুয়াইল ‘ময়লার ভাগাড়’

উপগ্রহ চিত্রে ধরা পড়া ঢাকার আকাশে রহস্যময় মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি। ছবি: সংগৃহীত

 

বাংলাদেশের বায়ুমণ্ডলে মিথেন গ্যাসের রহস্যময় ধোঁয়া শনাক্ত করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা। মিথেন একটি গ্রিনহাউস গ্যাস, বর্ণহীন, গন্ধহীন এই গ্যাসটি কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায় প্রায় ৮৪ গুণ বেশি মাত্রায় বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি করতে পারে। আর এই ভয়াবহ গ্যাস নিঃসরণের হটস্পট হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। বিজ্ঞানী ও সরকারি কর্মকর্তারা তাপমাত্রা বৃদ্ধিকারী গ্যাসগুলোর নিঃসরণরোধে দ্রুত এবং সবচেয়ে সাশ্রয়ী উপায়ের সন্ধান করছেন।

বিশ্বখ্যাত ব্লুমবার্গ নিউজে গত ২৫ এপ্রিল একটা খবর প্রকাশিত হয় জিএইচজিস্যাট ইনক-এর বরাত দিয়ে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কোনো এক অংশ থেকে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে ক্ষতিকর ভূমিকা রাখা গ্রিনহাউজ গ্যাসগুলোর একটা, মিথেন গ্যাসের একটা বিশাল নিঃসরণ চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ ঢাকার কোনো এক অংশ থেকে প্রচুর পরিমাণে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হচ্ছে যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে বাংলাদেশকে এই মুহূর্তে মিথেন গ্যাসের অন্যতম প্রধান কন্ট্রিবিউটর বানিয়ে দিয়েছে।

১৭ এপ্রিল সংস্থার হুগো স্যাটেলাইটের পর্যবেক্ষণে ঢাকার অদূরে মাতুয়াইল ময়লার ভাগাড় থেকে উদ্ভূত একটি মিথেনের উৎসের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট স্টিফেন জার্মেইন। সংস্থাটির অনুমান, মাতুয়াইল ময়লার ভাগাড় থেকে প্রতিঘণ্টায় ৪০০০ কেজি মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে যাচ্ছে, যা ১,৯০,০০০ গাড়ির বায়ুদূষণের সমান দূষণ। পৃথিবীর ১২টা মিথেন এমিসন হটস্পটের একটি বাংলাদেশ অনেক আগে থেকেই ছিল, কিন্তু স্রেফ একটা স্থান থেকে এই বিপুল পরিমাণে মিথেন নিঃসরণের উদাহরণ এই মুহূর্তে খুবই বিরল।

জিএইচজিস্যাট অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের মিথেন হটস্পট নিয়ে কাজ করছিল, এই প্রথমবারের মতো তারা পিনপয়েন্ট করতে পেরেছে নির্দিষ্ট কোনো জায়গা থেকে মিথেন গ্যাস নিঃসরিত হচ্ছে। এখন গ্যাসের নির্গমণ এতই শক্তিশালী যে সেটা স্যাটেলাইটে ধরা পড়ার মতো যথেষ্ট এবং মোটামুটি অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশের চাইতেও এই ক্লাস্টার অনেক বড়। তবে বাংলাদেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে তারা এটি তদন্ত করে দেখছে।

জার্মেইন বলেছিলেন, আমরা প্রথমবারের মতো একটি নির্দিষ্ট উৎসকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। এটি একটি বৃহৎ উৎস, তবে শহরজুড়ে শনাক্ত করা এই বৃহৎ উৎস মিথেন গ্যাস নিঃসরণের উৎস পুরোপুরি ব্যাখ্যা করার জন্য এখনও যথেষ্ট নয়। পরিস্থিতি রহস্য হিসাবে রয়ে গেছে এবং আমরা এই অঞ্চলটি আরো পর্যবেক্ষণ করব।

মন্ট্রিয়ালভিত্তিক জিএইচজিস্যাট জানিয়েছে, মাতুয়াইল বর্জ্য সাইটটি এমন বেশ কয়েকটি উৎসগুলোর মধ্যে একটি যা সম্ভবত এই বছর বাংলাদেশজুড়ে মিথেন গ্যাসের নিঃসরণের অন্যতম উৎস। বিশ্লেষক সংস্থা কায়রোস এসএএস জানিয়েছে, স্যাটেলাইটের তথ্যে দেখা গেছে এই বছর বাংলাদেশে ১২ গুণ বেশি মিথেন নিঃসরণের হার ধরা পড়েছে।

 

বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এবং সমস্যার মাত্রা নির্ধারণের জন্য একটি প্রযুক্তিগত কমিটি গঠন করেছে বলে ব্লুমবার্গের প্রশ্নের জবাবে ইমেইলে জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, কমিটি মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল সাইট থেকে মিথেন নির্গমন মূল্যায়ন করার জন্য এবং প্রশমন ব্যবস্থার জন্য পরামর্শক নিযুক্ত করেছে। এক মাসের মধ্যে তারা এর প্রতিবেদন দেবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়ার মতে, মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ১৮১ একর জমিতে অবস্থিত এবং সেখানে দিনে প্রায় ২৫০০ টন বর্জ্য গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে তরল বর্জ্য এবং গ্রিনহাউস গ্যাস উৎপাদন করে এমন বর্জ্য রয়েছে। তবে সেখান থেকে কী পরিমাণ মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয় সে সম্পর্কে সঠিক কোনে ডাটা নেই।

মিথেন গ্রিনহাউজ গ্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান ডেডলিয়েস্ট গ্যাস, যা কি-না গত দুই দশকে কার্বন ডাই অক্সাইড (যেটাকে উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হয়) এর চেয়েও ৮৪ গুণ বেশি ক্ষতি করেছে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের। এই ঘ্রাণহীন বর্ণহীন গ্যাস সূর্যের যে তাপ পৃথিবীতে আসছে, সেটাকে পৃথিবীতেই ধরে রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে, যা পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণে এবং খুব দ্রুত। ফলে বাড়তি তাপমাত্রা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে, আমাদের মতো সমুদ্রতীরবর্তী দেশের জন্য যা অনিবার্য অভিশাপ। ক্লাইমেট চেঞ্জের ফলে গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর মাধ্যমে এভাবেই আমরা সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকিতে আছি।

 

16 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন