mizan rana som

একজন হিন্দু ধর্মালম্বীর রক্তে রঞ্জিত হলো আমার হাত!

 

মিজানুর রহমান রানা :
গতকাল ৭ এপ্রিল ২০২১ খ্রি. রাত প্রায় সাড়ে ১১ টা বাজে। আমি ঘুমিয়েছি প্রায় দশ মিনিট পূর্বে। হঠাৎ করে আমার মেয়ে তাসনিম আমার ঘুম ভাঙালো।

সে বললো, বাবা পাশের ঘরে বিরাট শোরগোল লেগেছে। তুমি যাবে নাকি?

আমি তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে পাশের ঘরের কোণে গেলাম। বিরাট শোরগোল। মারামারির শব্দ। আমার স্ত্রী ও মাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ওই ঘরে গিয়ে দেখি, বাবা (পুলিন সাহা) ও ছেলের (পলাশ) মারামারি।

ওই ঘরে গিয়ে দেখলাম পলাশের বাবা পুলিন সাহার মাথা ফেটে প্রচন্ড রক্ত বের হচ্ছে। তারপরও তারা ঝগড়ায় লিপ্ত। লোকটার মাথা থেকে রক্ত বের হয়ে পুরো ঘর ভেসে গেছে। কিন্তু তার ছেলে পলাশ ও পলাশের স্ত্রীর সেদিকে ভ্রæক্ষেপ নেই। ঝগড়া চলছেই। আমি তাদেরকে ধমক দিয়ে থামিয়ে বললাম, পলাশ তুমি কাজটা ঠিক করা নাই। কাজটা ঠিক কর নাই।

এর মধ্যে পাড়ার সমস্ত হিন্দু মুসলমান চলে এসেছে। পাশের বাড়ির একজন (বাবুল) পলাশকে তার বাবার প্রতি অমানবিকতা প্রদর্শনের জন্যে মারতে উদ্যত হলে আমি বাধা দিয়ে বললাম, এখন মারামারি-শাসনের সময় নাই। আগে পুলিন সাহাকে বাঁচাতে হবে। দেরি হলে লোকটা রক্তক্ষরণে মারা যাবে।

দেখলাম পুলিন সাহার মাথায় বোতল দিয়ে আঘাতের ফলে কমপক্ষে চার ইঞ্চি ফেটে ভেতরে কাঁচের টুকরো প্রবেশ করেছে। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে ফাস্ট এইড এনে লোকটার মাথার ফাটা অংশের রক্ত আমার হাত দিয়ে মুছে (তখনও গজ পাইনি) সেখানে ‘ভায়োডিন’ দিয়ে নিজের পরিবারের একজন মানুষের মতো  পরিস্কার করলাম।

আমার হাত একজন হিন্দুর রক্তে রঞ্জিত। এই রক্ত একজন সৃষ্টিকর্তাই তৈরি করেছেন, যিনি সকল মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।

আমি লোকটার রক্ত পরিষ্কার করে, এগিয়ে আসা আরো মুসলমান ছেলেদেরকে ডেকে পুলিন সাহাকে হাসপাতালে পাঠানোর কথা বললাম। কিন্তু তার ছেলে পলাশ নির্বিকার। বাবার এ অবস্থায়ও সে তার বাবার প্রতি দয়ার মনোভাব নিয়ে চিকিৎসার জন্যে এগিয়ে এলো না। এমনকি তার বাবা যে এখন মৃত্যুমুখে পতিত সে অবস্থায়ও সে চুপ মেরে বসে আছে। তার বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার কোন উদ্যোগেই সে গ্রহণ করলো না।

এ সময় আমাদের পাশের বাড়ির যুবলীগ কর্মী সাখাওয়াত এগিয়ে এলো। সে তখন একটা ভালো ভূমিকা নিল। পুলিন সাহার ছেলে পলাশকে ধমক দিয়ে সিএনজি ডেকে বাজারে গিয়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসা নিয়ে আবার ফিরে এলো।

পরবর্তীতে যুবলীগ কর্মী সাখাওয়াত হোসেন সুমন বেপারী সহ আরো লোকজন এলো। তার তত্ত¡াবধানে পলাশ ও তার স্ত্রীকে পুলিশ সাহার পায়ে ধরে মাফ চাওয়াতে বাধ্য করা হলো। এবং আমরা সেই পরিবারের মধ্যে একটা শান্তির ফায়সালা তৈরি করে তাদেরকে ঝগড়া-বিবাদ না করার পরামর্শ দিয়ে ঘরে ফিরে এলাম।

আমি আমার হাতে লাগা রক্ত পানিতে ধুয়ে ফেললাম। আর মনে মনে বললাম, আল্লাহ হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই তোমার সৃষ্টি। আমি যেন তোমার এই সৃষ্টিকে সব সময় এভাবে সহযোগিতার মাধ্যমে দয়া প্রদর্শন করে, সেবা করে তোমার কাছে আমার গুনাহের জন্যে ক্ষমা পেতে পারি সেই তৌফিক দাও। আমিন।

ঘটনাটি গতকাল ৬ এপ্রিল ২০২১ খ্রি.। চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ থানার ৪নং কালচোঁ ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের। মানুষের সেবায় জাত যায় না। মানুষের সেবায় স্রষ্টাকে পাওয়া যায়, সেটা যে ধর্মেরই হোক। আমাদের মহানবী (সা.) সব মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে ইসলামকে পৃথিবীবে শ্রেষ্ঠ ধর্ম হিসেবে কায়েম করে গেছেন। আমাদেরকেও তাই করতে হবে।

সব মানুষের প্রতি উদার মনোভাব পোষণ ও মানবীয় আচরণ প্রদর্শন ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। কারণ মানুষ হিসেবে সবাই সমান। আল্লাহ সব মানুষকে সম্মানিত করেছেন।

হাদিসে এসেছে, একদিন সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.) ও কায়েস ইবনে সাদ (রা.) কাদেসিয়াতে বসা ছিলেন। তখন তাঁদের পাশ দিয়ে একটি লাশ নিয়ে কিছু লোক অতিক্রম করল।

তাঁরা দাঁড়িয়ে গেলেন। তখন তাঁদের বলা হলো, লাশটি অমুসলিমের। তাঁরা বলেন, মহানবী (সা.)-এর পাশ দিয়ে একসময় একটি লাশ নেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। তাঁকে বলা হলো, এটা তো এক ইহুদির লাশ। তখন তিনি বলেন, ‘তা কি প্রাণ নয়?’ (বুখারি, হাদিস : ১২৫০)

পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা ও অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে আসা ইসলামী সমাজব্যবস্থার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এটি মুসলিম-অমুসলিম সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আল্লাহ বলেন, ‘দ্বিনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করেনি তাদের সঙ্গে মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : মুমতাহিনা, আয়াত : ৮)

অমুসলিম রোগীকে দেখতে যাওয়াও সুন্নত। নবী (সা.) অমুসলিম রোগীদের দেখতে যেতেন এবং তাদের ঈমানের দাওয়াত দিতেন। তাদের সেবা করতেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইহুদি নবী (সা.)-এর খেদমত করত। সে অসুস্থ হলে নবী (সা.) তাকে দেখতে গেলেন। তার মাথার দিকে বসে নবীজি বলেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো। তখন সে তার পিতার দিকে তাকাল। পিতা বলেন, তুমি আবুল কাসেমের (নবীর) অনুসরণ করো। ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করল। তখন নবী (সা.) এই বলে বের হলেন, ‘আল্লাহর শুকরিয়া, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ১২৯০)

সব ধর্মের মানুষ প্রতিবেশী হতে পারে। প্রতিবেশী যে ধর্মেরই হোক প্রতিবেশী হিসেবে তাদের প্রতি সদয় আচরণ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শনে কোনো প্রকার ত্রুটি করা যাবে না। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষায় ইসলাম অত্যন্ত তৎপর। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জিবরাঈল (আ.) আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে অবিরত উপদেশ দিচ্ছিলেন, এমনকি আমি ধারণা করলাম যে, আল্লাহ তাদের ওয়ারিশ বানিয়ে দেবেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৬৬৮; মুসলিম, হাদিস : ৬৮৫৪)

শেয়ার করুন