somoyer dairy1

নিজের অপকর্ম ঢাকতে অন্ধকার জগতের মায়াবী জালে …

মিজানুর রহমান রানা : পৃথিবীতে কত ঘটনাই ঘটে। কত ঘটনা চাপা পড়ে থাকে, আবার কিছু কিছু ঘটনা আগ্নেয়গিরির মতো লাভাসহ ছড়িয়ে পড়ে অনলে অনলে। তবে কালের পরিক্রমায় আজকের সময়ের ডায়েরিতে লিখতে যাচ্ছি এমন একটি বিষয়, যা আমাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ছাড়াও আর্থসামাজিক বিষয় ইঙ্গিত করে।

মানুষ বেশিরভাগই অন্ধের মতো চলতে চায়। সে চায় তাকে কেউ রুজি-রোজগার করে খাইয়ে দেবে। কোনো কাজ কর্ম করবে না। কোনো মেধা-শ্রম খাটাবে না বা রিস্ক নিবে না। কিন্তু লাভ হবে। কারো কারো কাছে, কিছু অসৎ মানুষের কাছে এমনই এক লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে ধর্ম। ধর্মকে বর্ম করে কিছু কিছু পথভ্রষ্ট মানুষের সব ধর্মের মাঝে চলে পুঁজি ছাড়া ব্যবসা। এই ব্যবসা অনেক লাভজনক। সুবিধাজনক। শুধু প্রয়োজন কিছু ধর্মান্ধ মানুষের সহযোগ। এদের সহযোগ পেলেই ধীরে ধীরে তা মহিরুহে পরিণত হয়।

তখন অজ্ঞ কুসংস্কারপ্রিয় মানুষ এসে দলে দলে ভীড় করে পরকালের মুক্তির আশায়। হ্যাঁ পরকালের মুক্তির প্রয়োজন আছে। আর পরকাল বলে আমাদের একটা বিশ^াসের জায়গা আছে, কিন্তু সেই বিশ^াসের জায়গাটাতেই চলে অবিশ^াসীদের, ভন্ডদের প্রতারণা।

এই জন্য প্রয়োজন ধর্মের আবরণ। এসব মানুষ ধীরে ধীরে ধর্মকে গ্রাস করে নেয়। ধর্মের আসল কথা থেকে তারা ধীরে ধীরে মানুষকে দূরে সরিয়ে কুসংস্কার বিশ^াস করিয়ে, প্রকৃত ধর্মের বাণী থেকে মানুষকে ভিন্নপথে চালিত করে।

এই জন্যে তারা মানুষের মাঝে একটা মোহ তৈরি করে। সেই মোহ হচ্ছে মানুষের বিশ^াসের আধার। যেমন ধরুন
ভারতের ধর্মগুরু রাম রহিমের কথা। বড়ই আমুদে মানুষ ছিলেন রাম রহিম সিং। তাঁর বিরুদ্ধে ২ হাজারের বেশি সেবিকাকে ধর্ষণের খবর বেরিয়েছিল ভারতীয় মিডিয়ায়। ভক্তকুল তাঁকে ভীষণ ভালোবাসে। তাই সেবিকারা বিপক্ষে বেশি মুখ খোলেনি। মাত্র দুজন মামলা করেন। সে মামলা সিবিআই তদন্ত করে রিপোর্ট পেশ করলে শাস্তি হয় রাম রহিমের। আশ্রমের নাম ছিল ‘বাবা কি গুফা’। গুফায় ‘বাবাকে’ ঘিরে রাখত ২ হাজারের বেশি শিষ্য। নারী ভক্তদের নিয়ে তিনি ধ্যান করতেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে গোপন অভিযোগের চিঠির সূত্র ধরে সিবিআই নামে তদন্তে। প্রথম নারী অভিযোগ করেন, বাবাজি তাকে গুফার গোপন কক্ষে ডাকেন। তারপর ধর্ষণ করেন। বিষয়টি তখনই তার ভাইকে জানিয়েছিলেন। ভাই তাকে নিয়ে পালিয়ে যান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রাম রহিম খুন করেন তার ভাইকে। আর এ খবর প্রকাশের কারণে এক পত্রিকা সম্পাদককেও খুন করান। দ্বিতীয় নারীর ঘটনাও একই রকম। ধর্ষণের পর এই নারীও পালিয়ে যান। পরে আদালতে গিয়ে তার কাহিনি শোনান পুরো দুনিয়াকে। এই ধর্মগুরু ছিলেন ভীষণ ধোপদুরস্ত। দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি ছিল শতাধিক। বেশির ভাগ বুলেটপ্রুপ। নিজস্ব ফ্যাশন ডিজাইনার ছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিত গুরু কী পরবেন। হরিয়ানার সিরসা শহরে ১ হাজারের বেশি একর জমিতে স্থাপিত গুরুর ডেরাটি ছিল ছোটখাটো শহরের মতো। ভিতরে চালডাল আনাজের চাষ হতো। ছিল রিসোর্ট, সিনেমা হল, স্কুল, রেস্তোরাঁ, পেট্রোল পাম্প, নিজস্ব ছাপাখানা, পত্রিকা, স্টুডিওসহ অনেক কিছু। ১০ হাজার কাপড়কাচার ওয়াশিং মেশিনও ছিল। এ আশ্রমের বাইরে দেশ-বিদেশে আরও ৪৬টি আশ্রম ছিল তাঁর। নিজের ঘরসংসার পুত্র-কন্যা ছিল। সবাইকে নিয়েই তিনি থাকতেন। তবে পালিত মেয়ে হানিপ্রীতের ছিল বেশি প্রভাব। গুরুও পালিত কন্যাকে এক দিনের জন্যও স্বামীর সংসার করতে দেননি। রাখতেন নিজের কাছে।

গুরমিত রাম রহিম সিংয়ের মামলা চলে ১০ বছর। শুনানি হয় ২০০ বারের বেশি। এর ২০ বছর পর জেলের রায় ঘোষণা করে আদালত। তদন্তকালে সিবিআই ডেরার অনেক নারীর সঙ্গে কথা বলেন। অনুরোধ করেন মুখ খুলতে। কিন্তু তারা মুখ খোলেননি। রায় ও তাকে আটকের খবর ভালোভাবে নেননি শিষ্যরা। তারা ব্যাপক বিক্ষোভ করেন। আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দেন অনেক শহর। এতে ৩৮ জন নিহত হন। ৬ কোটি সমর্থক আর ৫ লাখের বেশি সরাসরি শিষ্য ছিল তার। রাজনৈতিক প্রভাবও ছিল অনেক। অনেকের ধারণা ছিল প্রভাবশালী এ ধর্মগুরুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ডেরাতে অভিযান চালায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। রাম রহিম সিং নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। কিন্তু অভিযান চালাতে গিয়ে চমকে ওঠে পুলিশ। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ কনডম ও জন্মনিরোধক ওষুধ। রাম রহিমের নিজস্ব রুম থেকে গোপন সুড়ঙ্গের মাধ্যমে যাতায়াত করা যেত সাধ্বী বা সেবিকাদের হোস্টেলে। আর সুইমিংপুলের নিচে ছিল যৌনগুহা। এ গুহায় নারী ভক্ত ও সাধ্বীদের সঙ্গে তিনি মিলিত হতেন। নারীদের তিনি বোঝাতেন তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক হলে ঈশ্বর খুশি হবেন। ভগবানকে খুশি করার কথা বলে রাম রহিম নিজের ৪০০ অনুগামী পুরুষকে নির্বীজকরণ করেছেন। তাদের বলতেন, ঈশ্বরকে পেতে হলে সবাইকে এমন হতে হবে। তদন্তে জানা যায়, ডেরায় অবস্থানকারী অনুসারীরা যাতে সেবিকাদের সঙ্গে সম্পর্ক করতে না পারে সে কারণেই নির্বীজকরণ। এত কিছুর পরও কেউ প্রতিবাদ করেনি। ধর্মের অন্ধত্বের আড়ালে সবকিছু চাপা পড়ে যায়। ভারতের প্রভাবশালী অনেক নেতা যেতেন রাম রহিমের ডেরায়। তাদেরও আনন্দ-ফুর্তির ব্যবস্থা ছিল। নিয়মিত কনসার্ট হতো। বসত গানবাজনার আসর। অভিনেতা-অভিনেত্রী, ক্রিকেটারদেরও পদচারণ ছিল। এ প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে সবাই ভেবেছিল কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। কিন্তু সিবিআই ছিল সাহসী ভূমিকায়। এ ঘটনার পর ভারতের আরও অনেক ধর্মগুরুর মুখোশ উন্মোচন করে দেয় মিডিয়া। এ কারণে মিডিয়ার ওপর ক্ষুব্ধ হয় অন্ধ ভক্তরা। তারা মিডিয়ার ওপর হামলা চালায়। ব্যক্ত করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।

মিডিয়া এক সময় হয়ে যায় এদের প্রধান টার্গেট। কারণ এই মিডিয়াই তাদের পাপের কথা জনসম্মুখে তুলে ধরে এদের ব্যবসাটা শিকোয় তুলে দেয়। তাই মিডিয়ার ওপরই এদের বেশি আক্রোশ। তবে সময়ের ডায়েরিতে এসব ভন্ডদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে যায়। এরা কালের বিবর্তনে মানুষের চিন্তাচেতনার পরিক্রমায় আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।

12 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন