সেতু tamanna setu2

পুরুষের শরীরে নারীর মন! কীভাবে বাঁচব?

তামান্না সেতু :  সহজ যখন পেটে তখন বাতিঘরে আনন্দ সবুজ দলের (১৪ বছর) সাথে আমার একটা ক্লাস নিতে হলো। বিষয় – থার্ড জেন্ডার।

শৈশবে আমাদের ফরিদপুরের বাড়িতে অনেক বৃহন্নলারা আসতেন। নানা কমিশনার ছিলেন। ওদের নিয়ে তিনি অনেক উন্নয়ন মূলক কাজ করতেন, সেই সূত্রে আসা৷
এসে সারাদিন থাকত। নানুর সাথে গেরস্থালির কাজে সাহায্য করত। আমাদের খাওয়াতো, গোসল করাতো।

এসব কারণেই হয়ত তাদের প্রতি আমার আচরণ সবসময় সহজ স্বাভাবিক ছিলো।
বিজয় সরণির সিগন্যালে ইদানীং যারা থাকে ওরা আমাকে খুব ভালো করে চেনে। আমাকে দেখলে শশা কিনে দেয়। রূপনগরে ওদের বাড়িতে যেয়ে আমি দাওয়াত খেয়ে আসি।
যা হোক, যা বলছিলাম৷ বাতিঘরের ক্লাস নিলাম। যা বলার তা তো বলতেই হয়। বললাম, স্বাভাবিকভাবেই যেভাবে সন্তান পেটে আসে সেভাবেই ওরা আসে। জন্মের পর মা যখন তাকিয়ে দেখে ছেলে বা মেয়ে সন্তান নয় তার পেট থেকে তৃতীয় পরিচয়ের কেউ একজন জন্ম নিয়েছে, তখন মায়ের সাথে সেই সন্তানের যে সম্পর্ক তা মিথ্যা হয়ে যায় না। ছোট্ট একটা বাচ্চার যেই যেই খেলনা দিয়ে খেলতে ভালোলাগে এর বেলায় সেই চাহিদা বদলে যায় না৷ একটু বড় হয়ে আরো যা কিছু মানসিক- শারীরিক চাওয়া তা বদলে যায় না। কাজিনদের সাথে ঘুরতে যাওয়া, ঈদের দিন নতুন জামা পরে বাড়ির সবাইকে সালাম করে সালামি চাওয়ার আনন্দ পাওয়ার অধিকার এক ফোটাও কমে যায় না।’

বললাম, ‘এই যে আমার পেটে এখন একজন বেড়ে উঠছে সেও তেমন কেউ হতেই পারে’!
এ কথা বলার সময় যখন নিজের পেটের ওপর হাত রেখেছিলাম, বলতে বাঁধা নেই আমি একটু কেঁপে উঠেছিলাম। তারপর নিজেকেই কেমন ছোটলোক মনে হলো। মনে হলো কেন কেঁপে উঠলাম!
যে তুমি আমাকে এ চিঠি লিখেছ, বাবারে তুমি যদি আমার পেটে জন্ম নিতে! বিশ্বাস করো তোমাকে জন্ম দিয়েই আমি শক্ত করে খোলা চুল খোপা করতাম। হাওয়ায় উড়ানো আচল কোমড়ে গুজতাম। এই যুদ্ধটা তোমার একার হতো না বাবা। আমি মা তোমার পাশে আমরণ থাকতাম।
তুমি তো শরীরে তৃতীয় লীঙ্গ নও! এই হলো আরেক জ্বালা!
নজরুল লিখেছিলেন “খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে”!

আল্লাহ, তুমি কতো খেলেছ এ বিশ্ব নিয়ে! কতো খেলার মাশুল আমরা দিয়ে যাই! আবার বানালে পুরুষের শরীরে নারীর মন!! তোমার খেলা তুমিই জানো, কিন্তু শিখিয়ে দাও আমার এই সন্তান কিভাবে এই দুনিয়ায় এই খেলায় জিতে যাবে।
তুমি যখন বানিয়েছ, বানিয়ে দুনিয়ায় পাঠিয়েছ, আমি বিশ্বাস করি এই খেলায় সে জিতবে তাই তুমি দেখতে চাও।
বাবা, তুমি যদি আমার সন্তান হতে আমি এ যুদ্ধে তোমার পাশে থাকতাম। আমার শাড়ি তোমার গায়ে জরাতাম। একসাথে কপালে টিপ পরে রিক্সা দিয়ে ঘুরতাম। এই যুদ্ধ আমি করতাম মাথা উচু করে।
তুমি যা, যে মন স্বয়ং স্রষ্টা তোমার ভেতরে দিয়েছে তুমি তাই। এটাই তোমার পরিচয়, তোমার প্রকাশ, তোমার গর্ব।

তুমি ধারণ করো সর্বাঙ্গে তোমার মন। তুমি প্রকাশ করো শরীরে তোমার আত্বিক পরিচয়। তুমি বাঁচো। তুমি বাঁচো। প্রতিদিন এত সহজ ভাবে বাঁচো যেন সকালের সূর্য উঠেছে।
এতো কঠিন হয়ে বাঁচো যেনো হিমালয় তুমি।
তুমি তোমার পরিচয় নিয়ে বাঁচো। লোকের হাসির আওয়াজ যেনো তোমার বাঁচার আনন্দের নীচে চাপা পড়ে যায়।

লোকের ছিঃ যেন স্রষ্টার সেচ্ছায় বানানো এই প্রানের হাসির নীচে চাপা পড়ে যায়।
এক সেকেন্ডের জন্য পরিচয় হারাবে না।
আমি বলছি তুমি নিজ পরিচয়ে সকল আনন্দ জয় করতে পারবে। শুধু যারা সৃষ্টির অর্থ না জেনে তোমাকে কষ্ট দিতে চায় তাদের ‘কিছু না’ মনে করো।

বিশ্বাস করো তারা আসলেই কেউ না, কিছু না।
তোমার দলে খুব বেশি মানুষ যদি না পাও, যে কজন পাবে তারাই মূলত মানুষ। তুমি তাদের নিয়ে, আলো নিয়ে, ফুল নিয়ে বাঁচবে।

মা ডেকেছ। মা হলাম৷ মা তোমার পাশে আছি।

শেয়ার করুন