রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে যেসব ভেষজ উপাদান

বিশ্বব্যাপী ছেয়ে গেছে করোনার থাবা। এ থেকে বেঁচে থাকতে মানুষজন প্রতিনিয়ত খুঁজছে কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখা যায়। ওষুধের ওপর নির্ভর না করে ভেষজ উপাদানও ব্যবজার করতে পারেন। এতে উপকারও বেশি ক্ষতির সম্ভবনাও কম।

জানা গেছে, বাইরে থেকে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস যখন শরীরে প্রবেশ করে তখন তাকে বধ করতে অ্যান্টিবায়োটিকই (Antibiotic) একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে এতে ইনফেকশন কমলেও এ ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। তাই প্রাকৃতিক উপায়ে যদি এ ধরনের ভাইরাস ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলা যায় তবে শরীরে তার প্রভাব স্বাস্থ্যকর। বর্তমানে সারাবিশ্বে হানা দিয়েছে করোনা মহামারি। এ ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন জরুরি।

লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শাহীনুল আলম বলেন, কোভিড একটি ভাইরাস রোগ, আর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে। অতএব, সব কোভিড রোগীর শুরুতেই অ্যাজিথ্রোমাইসিন (অ্যান্টিবায়োটিক) পাবেন এটা নয়, এটা আমাদের বলা যায় সবশেষ রিসোর্স। এক্ষেত্রে আমাদের অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহারের দিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার।

ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের তথ্য বলছে, ১০ জনের মধ্যে একজন অ্যান্টিবায়োটিক ট্যাবলেট সেবনের দরুণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভোগেন। কারও অ্যালার্জি, কারও হজমের সমস্যা হতে পারে। আয়ুর্বেদ মতে, বেশকিছু ভেষজ রয়েছে যেগুলো সারাবছর খেয়ে যেতে পারলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, আর কিছু রয়েছে রোগ বিশেষে দারুণ কাজ করে।

জ্বর-সর্দি-কাশি:

তুলসী– তুলসীপাতায় উপস্থিত বিশেষ ধরনের অ্যালকালয়েড বা জ্বর, সর্দিতে দারুণ কাজ দেয়। শরীরে শ্লেষ্মা বিনাশে উপকারী।

বাসকপাতা– শুকনো কাশি কমাতে, জমে থাকা কফ বের করে দেয়, কাশির সঙ্গে রক্তপাত হলে তা নিরাময়ে বাসকপাতার রস বা পাতা ফোটানো পানি পান খুবই উপকারী। লিভারের জন্যও খুব ভালো।

দারুচিনি– কোভিড প্রতিহত করতে আয়ুশ ক্বাথের একটি অন্যতম উপাদান হল দারুচিনি। শুধু কোভিড নয়, যে কোনও রোগজীবাণু প্রতিহত করতে পারে। সরাসরি জীবাণুকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রয়েছে। শ্বাসযন্ত্রের যে কোনও ধরনের সংক্রমণ বিনাশে কার্যকর।

লবঙ্গ– গলাব্যথা বা গলায় ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হলে তা প্রতিহত করে। গলাব্যথা, টনসিল বা ফ্যারিনজাইটিস, ল্যারিনজাইটিসের সমস্যায় উপশম দেয়। দাঁত ও মাড়ির ইনফেকশন কমায়।

পিপুল– এ ফলে উপস্থিত ‘পাইপারিন’ উপাদান অ্যান্টি ব্যাকটিরিয়াল। গলা, ফুসফুসের সংক্রমণ বিনাশ করতে কাজ করে। এটি ইমিউনো মডিউলেটর। মধু দিয়ে পিপুল চূর্ণ অল্প মাত্রায় দিনে দুবার খেলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।

গোলমরিচ– জ্বরনাশক। যে কোনও ব্যাকটিরিয়াল ইনফেকশন কমায়।

পেট ভালো রাখতে যা খেতে পারেন:

কালমেঘ– কালমেঘ পাতা লিভারের জন্য যেমন ভালো পাশাপাশি পেটের যে কোনও সংক্রমণ প্রতিহত করতে কার্যকর। জ্বরও কমায়।

থানকুনি পাতা– আমাশয়, জিয়ার্ডিয়ার জীবাণু মারতে সাহায্য করে। রোজ এই পাতা ১০টি চিবিয়ে খান। শিশুদের ক্ষেত্রে থেঁতো করে হাফ চামচ রস এ ধরনের সমস্যা দারুণ কাজ করে।

বিড়ঙ্গ– এই বীজের চূর্ণতে উপস্থিত অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল উপাদান। শরীরের যে কোনও ধরনের রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুকে ধ্বংস করতে পারে। গরম পানিতে বিড়ঙ্গ চূর্ণ দিয়ে পান করুন।

হরিতকি– পেটের মধ্যে জমে থাকা বায়ু বের করে দিতে পারে। পেট ফাঁপা কমাতে অতি কার্যকর। কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়। পেটের নানা রকম জীবাণুনাশ করতে সক্ষম। হজমশক্তি ঠিক রাখে ও শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। হরিতকী গুঁড়া গরম পানি দিয়ে রাতে পান করুন।

পলাশ বীজ– পলাশ ফুলের বীজও অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল ভেষজ। প্রাপ্তবয়স্করা ছোট চামচে এক চামচ করে দিনে দু’বার খেলে উপকার মিলবে। পেটের যে কোনও ইনফেকশন বা ডায়েরিয়া প্রতিহত করে।

আদা– আদা খেলেও শরীর গরম থাকে, যা শরীরের জীবাণুকে বিস্তারলাভ করতে দেয় না। শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাকক্ষমতা বাড়ায়।

চিতা– চিতাগাছের মূলের শুকনো চূর্ণ উষ্ণ জলে গুলে অথবা জলে ফুটিয়ে খেতে পারেন। এতে পেটের আম বা অতিসার কমে।

আনারস পাতা– এই পাতার নিচের দিকের সাদা অংশ রস করে খেলে পেটের কৃমি বা প্যারাসাইটকে ধ্বংস করে।

কুড়চী ছাল– এই ভেষজে ‘কুর্চিন’ নামক উপাদান রয়েছে। অ্যামিবিয়েসিস, ব্যাসিলারি ডিসেন্ট্রি বা পেটে আমাশয় হলে তা প্রতিহত করে কুড়চী ছাল। এই ছালের চূর্ণ সেবন করলে কাজ দেবে।

কচি বেল শোকানো এতেও রয়েছে অ্যান্টি-অ্যামিবিক উপাদান। এই বেল শুকিয়ে, চূর্ণ করে খেতে হবে।

মুথাঘাস– এই ঘাসের কন্দ পেটের যে কোনও ইনফেকশনে জন্য মহৌষধ হিসেবে কাজ করবে।

দারুহরিদ্রা– এতে ‘বারবেরিন’ নামক অ্যালকালয়েড রয়েছে। যা পেটের জন্য ভালো।

সর্বসংক্রমণ তাড়াতে যা থেকে পারেন।

হলুদ– এতে অ্যান্টি ফাংগাল ও অ্যান্টি প্যারাসাইটিক উপাদান ‘কার্কিউমিন’ রয়েছে। যা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ও রক্তকে পরিশুদ্ধ করে।

আমলকি–পেটের রোগ কমাতে কাজ করে। যে কোনও ধরনের ক্রনিক ইনফেকশনকে প্রতিহত করে।

আদ্রক শুকনো (শুকনো আদা)– এর গুঁড়ো দিয়ে ফোটানো পানি অ্যান্টিবায়োটিক গুণ সমৃদ্ধ। সকল সংক্রমণ রোধক ও নাশক।

ঘরে-বাইরে সহজলভ্য নিম। অপরিসীম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় সমৃদ্ধ। গাছের পাতা, ছাল কিংবা ফল, সব কিছুতেই ঔষধি গুণ বর্তমান। ত্বক, দাঁতের সংক্রমণকে বাগে আনে পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য ব্যাকটিরিয়া বা ভাইরাসকেও প্রতিহত করে নিমপাতা। রোজ খান। রক্তকেও পরিশুদ্ধ করে ভিতর থেকে শরীরকে সুস্থ রাখুন। সব বয়সেরই ন্যাচারাল অ্যান্টিবায়োটিকের পাশে থাকুন।

শেয়ার করুন

অনুমতি ব্যতীত এই সাইটের কোনো সংবাদ, ছবি অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশ আইনত দণ্ডনীয়