azha sultan inter report

আপনি যেখানে বড় সেখানে আমি কেন ছোট : খন্দকার আযাহা সুলতান

 

বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় কবি, লেখক ও গীতিকার খন্দকার আযাহা সুলতান। তিনি কবিতা, গল্প লেখায় সিদ্ধহস্ত। কিন্তু সেই সাথে একজন গীতিকার হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছেন।

সাহিত্যচর্চায় এবং গান লেখায় খন্দকার আযাহা সুলতান নিবেদিতপ্রাণ। সেই কারণে কবিতা, গল্প তথা শিল্প সাহিত্যে তার অনবদ্য অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। গান, কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস সাহিত্যের সব শাখায়ই তাঁর বিচরণ।

গুণী এই কবি-সাহিত্যিককে নিয়ে চাঁদপুর রিপোর্ট-এর বিশেষ আয়োজন পাঠকের জন্যে পত্রস্থ করা হলো।

চাঁদপুর রিপোর্ট : আপনার বর্তমান পেশা কী? লেখালেখি এবং গান লেখায় আগ্রহী হলেন কেনো?

খন্দকার আযাহা সুলতান : আমি একজন প্রবাসী, দীর্ঘদিন কেটেছে আমার আমিরাত নামক প্রবাসে; এখনো আছি। আসলে ভাই, আমি কোন জ্ঞানীগুণী মানুষ নই আর না, লেখালেখিতে আমার কোন ভাল জ্ঞান আছে। যা মনে আসে লিখে দি আরকি। আমি মনে করি, এটাই আমার প্রতি আল্লাহর দয়া ও দান। আমি এটাও মানি, তাঁর সহায়তা ছাড়া কোন মানুষ উপরে উঠতে পারে না। তিনি যাকে হিদায়াত দেন তাকে কেউ গুমরাহ করতে পারেন না। এভাবে তিনি যাকে জ্ঞানবান করেন, সে যত অজ্ঞানীই হোকনা কেন…ওনার সেই আলোকে একটা গানও লিখেছিÑ

‘অগায়কে গায়িকিগলা দাও
অশিল্পীকে বানাও মহাশিল্পী
অকবিকে কবিত্ব কী শিখাও
বুঝা দায় তোমার কারিগরিÑ
সত্যি বড় কারিগর প্রভু তুমি!।

বুদ্ধির সাগরে সাঁতারে কাকে
বোকার তকমা লাগাও পলকে
শিক্ষায় পাÐিত্য মস্তবড় করে
একটুতে দেখাও আবার মূর্খ্যামিÑ
সত্যি বড় কারিগর প্রভু তুমি!।

অজ্ঞানীকে জ্ঞানী করে যত
জ্ঞানীকে অজ্ঞানীতে নামাও
অসম্মানীকে সম্মান দিয়ে কত
সম্মানীকে কিযে লাঞ্ছিত করাওÑ
সাধ্য না তোমায় বুঝার মতো!।

কাঙালকে রাজ্যবান করে বড়
রাজ্যের মালিকে রাজ্যহারা কর
অহঙ্কারীকে ডুবায়ে জলে আরো
জগতীর জন্যে বানাও নিদর্শনীÑ
সত্যি বড় কারিগর প্রভু তুমি!।

চাঁদপুর রিপোর্ট : আপনি কীভাবে, কখন শিল্প-সাহিত্যচর্চা তথা লেখালেখি শুরু করেছিলেন?
খন্দকার আযাহা সুলতান : বলতে গেলে, বড় একটা আঘাত থেকে আমার সাহিত্যাঙ্গনে পদার্পণ। এমনিতেই ছোটবেলার থেকে কবিতা পড়া ভাল লাগত আমারÑভীষণ ভাল। শুরু করা বলতে গেলে, সেই অনেক লম্বা কথা। ছোট করে বলি, মনে বড় দুঃখ নিয়ে পথচলছি তখন। হঠাৎ এক আত্মীয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশি এক ভাইয়ের দোকানে চাকরির ডাক আসে আজমান নামক শহরে, গেলাম এবং চাকরি শুরু করলাম। সেখানে কয়েকদিন কাটারপর একদিনÑঅই ভাইটির বাসায় গেলে দেখি নজরুলের সঞ্চিতা! ওঁকে বললাম, দাদা, এ বই কোত্থেকে এল এখানে? ওনি বললেন, জানি না কে রেখে গেছে। আমি বললাম, আপনি পড়েন? ওঁ বললেন, প্রবাসে কি অই সময় আছে ভাই। আমি নিয়ে যাই? ‘যাও’। দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে আরবি-হিন্দির মাঝে নিজের ভাষা বাংলাকে একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিলেম বলা যায়! সঞ্চিতা পড়ে অবাস্তব কথা মনে হল, আরে এগুলো ত আমিও লিখতে পারি বোধহয়! তারপর ভাইবন্ধু যে আসে দেশ থেকে ভূরি ভূরি বই নিতে থাকি। এভাবে আবার আমার চলতে থাকে বাংলাচর্চা এবং তারপর সাহিত্যচর্চা। তবে অনেক জায়গায়, অনেক সময় এগুলো নিয়ে বেশ ঠাট্টাপরিহাসেও পড়তে হয়নি এমন নয়, অনেক পরিহাস আমাকে সইতে হয়েছেÑসেগুলো আজ থাকÑআবার কোন অবকাশে…

চাঁদপুর রিপোর্ট : একজন শিল্পী, কবি-লেখকের মতো মহান কর্মে আসার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন কারা?
খন্দকার আযাহা সুলতান : হায় হায়…অনুপ্রেরণা! বলতে গেলে অনেক কটূ কথাও শোনতে হয়েছে পরিবার থেকে এবং বাইর থেকে। আর এটাও বলা যায়, আমার চৌদ্দপুরুষেতে কোন সাহিত্যিক নেই। সেই অনেক কথাÑআজ থাক…

চাঁদপুর রিপোর্ট : আপনার পূর্বে, বর্তমানে কারা উৎকৃষ্ট সাহিত্যের জন্ম দিয়েছেন? বাংলাদেশ অথবা আন্তর্জাতিকভাবে কারা কতটুকু সাহিত্যকে মানুষের দুয়ারে কীভাবে পৌঁছে দিয়েছেন?
খন্দকার আযাহা সুলতান : পূর্বের কথা কারো পক্ষে অস্বীকার করার উপায় নেই। বঙ্কিম, মাইকেল, রবীন্দ্র, শরৎ, নজরুল, জসিম, জীবনানন্দ প্রমুখ বাংলাসাহিত্যকে যে উচ্চস্থানে নিয়ে গিয়েছে তার কোন তুলনা হয় না এবং কোন যুগে হবেও না। বর্তমানের কথা যদি বলি, কোথায় পড়েছিলাম মনে নেই, বোধহয় কোনেকটা প্রতিবেদনে হতে পারে, নাকি কোন্ জীবনীকারের প্যারাতে ‘বর্তমানের গল্প-উপন্যাস যেমন-তেমন কিন্তু কবিতা একবার পড়লে আর দ্বিতীয়বার পড়তেই ইচ্ছা হয় না’ বর্তমানের কবিতার এমন হাল কেন ভাই, আমারও কৌতূহল…আন্তর্জাতিকের কথা বললে, আমাদের মতো পুরোনোদের কথায় ঘুরেফিরে আসেÑআসবে। যাইহোক, বর্তমানের কবিতা কি আসলেই দুইবার পড়ার উপযোগী নয়? আজকাল বই পড়ার প্রতি মানুষের যে অনীহা, ভবিষ্যতে না জানি কী হবে, আল্লাহ্ই ভাল জানেন।

চাঁদপুর রিপোর্ট : লেখালেখি বা শিল্প-সাহিত্যচর্চা কি একটি চ্যালেঞ্জ, অথবা নতুন করে সমাজ বিনির্মাণের কোনো মাধ্যম হতে পারে?
খন্দকার আযাহা সুলতান : চ্যালেঞ্জ কী আমি বুঝি না। আর চ্যালেঞ্জ করে ত কেউ কোনদিন কোনকিছু জয় করতেও পারে না। পারে কী? তবে সাহিত্য ত আমি মনে করিÑসমাজের প্রতিবিম্ব। বিশ্বের সমাজগঠনে সাহিত্যের যে অবদান তা অস্বীকার করবে কে।

চাঁদপুর রিপোর্ট : শিল্প-সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সফল হওয়ার উপায় কী?
খন্দকার আযাহা সুলতান : সফল হওয়ার উপায় বলতে, সফল কি আপনি চাইলেই হয়ে যেতে পারবেন? তার জন্যে অধ্যবসায় ও চেষ্টা দুটোই বিশেষ জরুরিÑতারপর প্রচার ও গণমাধ্যম এবং ভাগ্য আপনার সাথ দিলেই ত আপনি সফল। তবে ভাগ্য সাথ দেয় তখনই যখন আপনি চেষ্টা করবেন, চেষ্টাই একমাত্র সফলতার চাবিকাটি।

চাঁদপুর রিপোর্ট : আপনার দৃষ্টিতে একজন যথাযথ শিল্পী, কবি-লেখক তথা সাহিত্যিকের মূল্যায়ন কী হওয়া প্রয়োজন?
খন্দকার আযাহা সুলতান : একজন সৃজনশীল মানুষের মূল্যায়ন অবশ্য হওয়া দরকারÑতা যেভাবেই হোকনা কেন।

চাঁদপুর রিপোর্ট : সাহিত্যচর্চায় আসার জন্যে আগ্রহী নতুনদের জন্যে আপনার পরামর্শ।
খন্দকার আযাহা সুলতান : ভাই, আমি নগণ্য এবং অখ্যাত একজন মানুষ কী পরামর্শ দিতে পারি বলেন? তবে এতটুকু বলতে পারি, সাহিত্য একটি মহান কাজ আর এ কাজের মধ্যেই মানুষ বেঁচে থাকতে পারে…

চাঁদপুর রিপোর্ট : জীবনের উল্লেখযোগ্য স্মরণীয় ঘটনা।
খন্দকার আযাহা সুলতান : সেই ত অনেক। তবে একবার কলকাতা দমদম বিমানবন্দরে ওয়েটিং রুমে বসে আছি। পড়ছি একটি খবরের কাগজ কি ম্যাগাজিন পুরোপুরি মনে নেই। সোফার একপাশে আমি অন্যপাশে অপরিচিত জনৈক। এমন সময় দেখি জনৈকা ভদ্রমহিলা হাইহিল সেন্ডেল, চোখে সানগøাস, টাইটফিট জিন্সপেন্ট ও টি-শার্ট-ধরনের কিছু পরে ঘোড়ার মতো টকটক করে এসে বসল একেবারে আমাদের সামনের সোফায়Ñমাঝখানে মাত্র একটা টি-টেবিল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আমার মতো ছোটখাটো একজন ভদ্রলোক। কেউ-ই কোন হাই-হ্যলো শব্দ আমাদেরকে বলেননি। আমিও পত্রিকা পড়ার থেকে ভাল করে চোখ তোলে তাকাইনি। একটুপর দেখি আমার পাশের জন গুঁতো দিয়ে আমাকে বলছে, ভাই, ইনি সুনেত্রা। আমি ওঁর দিকে একটু তাকিয়ে আবার পত্রিকা পড়াতে ব্যস্ত। আরেকটুপরÑআবার দেখি ফিসফিসানি বাড়িয়ে পুনরায় গুঁতো দিয়ে বলছে, ভাই ইনি চলচিত্রের সুনেত্রা। কেউ এভাবে গুঁতোর মাধ্যমে কথা বললে আমার খুবই বিরক্ত লাগত এবং এখনো লাগে। প্রথমবারের সহ্যের পর এবার রাগান্বিতকণ্ঠে বললাম, আপনার সমস্যা কী? বেশি ইচ্ছে হলে আপনি গিয়ে আলাপ করুননা, যতসব! আমাকে কেন বিরক্ত করছেন? ভদ্রলোক দেখি কাচুমাচু করে ওঠে চলে গেল অন্যত্র। সেও আর ওঁদের সঙ্গে প্যাঁচাল পাড়ার আগ্রহ দেখাননি। সেদিন নিজেকে খুব অপরাধী মনে হল। আমার কথা হল, আপনি যেখানে বড় সেখানে আমি কেন ছোট!

চাঁদপুর রিপোর্ট : শিল্প-সাহিত্যচর্চা কী অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হতে পারে?
খন্দকার আযাহা সুলতান : অর্থ উপার্জনের মাধ্যম কী ঠিক বুঝলাম না, টাকা কামাইয়ের লক্ষ্যে সাহিত্য কি, কোন সৃষ্টিশীল জিনিসই ত ভাল হয় নাÑআমার যদ্দূর মনে হয়। আর প্রত্যেক শিল্পেই ত অর্থের একটা বিরাট ভূমিকা থাকে। এখানেও যাঁরা অর্থোপার্জনের মাধ্যম করতে চায় বেশ আর কম করতে পারে। সেজন্যে তাঁকে বিশেষ জনপ্রিয় হওয়া চাই।

চাঁদপুর রিপোর্ট : একজন শিল্পী, লেখক মানুষ, সমাজ, জাতি, দেশের কল্যাণে কতটুকু কাজ করতে পারে?
খন্দকার আযাহা সুলতান : তাঁরা ত দেশের সম্পদ, সমাজের আয়না ও জাতির বিবেক; তাঁরা চাইলে সমাজনীতি রাষ্ট্রনীতি ও দেশের কল্যাণে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে।

চাঁদপুর রিপোর্ট : একজন সফল গীতিকার, কবি-লেখকের আদর্শগত দিক কী কী হওয়া উচিত?
খন্দকার আযাহা সুলতান : কঠিন প্রশ্ন! আদর্শগত দিক বলতে কী চালচলন? না চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য? দুনোটাই কিন্তু বিশেষ জরুরি। আর লেখাতে একটা গুণগত মান অবশ্য অবশ্য থাকতে হবে।

চাঁদপুর রিপোর্ট : সাংবাদিকতা, চিকিৎসাসেবা, আইনপেশা, শিল্প-সাহিত্য চর্চার মধ্যে সামঞ্জস্য, পার্থক্য ও সমন্বয় কতটুকু সম্ভব? একটি পেশা কি অন্যটির পরিপূরক?
খন্দকার আযাহা সুলতান : হাঁ, অবশ্য পরিপূরক। কোনটার চেয়ে কোনটা পেশা কিন্তু মহত্তে¡র দিক-বিবেচনা করলে কম নয়।

চাঁদপুর রিপোর্ট : আপনার প্রকাশিত/প্রকাশিতব্য গান, বইয়ের সংখ্যা ও নাম উল্লেখ করুন।
খন্দকার আযাহা সুলতান : আমার প্রথম কবিতার বই ছিল ‘ভাবনা’ দ্বিতীয় প্রকাশ ছিল ‘শেষচিটি’ ওটাও কবিতার। তৃতীয় ‘রৌশন জালাল’ ‘গীতিকুঞ্জ’ ‘ঝঙ্কার’ পরপর তিনটাই ছিল গানের বা গীতিকবিতার বই। তবে এগুলো প্রকাশের দিকথেকে আমারই ভুল ছিল বেশিÑতাই এগুলোর সব কয়টিকে আবার সম্পাদন করে ভেঙেচুরে নতুনভাবে ও নতুন-আঙ্গিকে প্রকাশ করার আশা আছে আমার; বাকি আল্লাহর হাতেÑহায়াতেজিন্দেগি কতটু মিলে জানি না। প্রকাশিতব্যÑ‘রৌজা’ এটি গজল-আকারে গীতিকবিতার বই, বলতে গেলে এটা রৌশন জালালের নতুনার্থে তৈরি তবে রৌশন জালালের কোনেকটি গান পূর্ণাঙ্গভাবে এখানে স্থান পায়নি। কোনটার এক লাইন এসেছে ত কোনটার দুই লাইন আবার কোনটা পুরাই বাদ। ধরা যায়Ñএটা পুরোটাই নতুন। গল্প উপন্যাস আরো দুয়েকটি আছে সেগুলোর নাম এখন প্রকাশ করা যাচ্ছে না। অনেক কথা নামক একটা নীতিবাক্যের বইও প্রকাশ করার আশা আছেÑজানি না…

চাঁদপুর রিপোর্ট : আপনার নিজের মতো করে কিছু বলুন।
খন্দকার আযাহা সুলতান : আমার বক্তব্য নাই বললে কিছুই নাই আবার আছে বললে অনেক কথাÑমানুষ পৃথিবীতে এসেছে সুনাম অর্জনের জন্যে, যে সুনাম অর্জন করতে পারেনি সে মানুষও হতে পারেনি।

খন্দকার আযাহা সুলতানের পিতার নাম জালাল আহমেদ, মাতা : রৌশন আরা, পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিন পুত্র ও এক মেয়ে। স্থায়ী ঠিকানা পশ্চিম কাঞ্চননগর, কাঞ্চননগর, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম।

33 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন