ক্ষুদীরাম দাসের ছোট গল্প : কুসুম নামের মেয়েটি

 

বিধবা নিতুর ছয় বছরের মেয়েটি ‘ভাত খাবো, ক্ষিধে পাইছে’ বলতে বলতে কান্নাকাটি করছে।
চারিদিকের প্রতিবেশী পরিবারগুলো ছোট মেয়েটির কান্নাকাটি শুনলেও কারো এতটুকু দয়া হয় না। কারো মনে দয়া জেগে উঠার মতো বোধশক্তি মনে জেগে না উঠলে কারো জন্যে কারো মনে জায়গা হয় না। এ পাড়ায় এসব কান্না একেবারে স্বাভাবিক। কেননা সকলেই দরিদ্র। কেউ কারো জন্যে ক্ষিধে মেটানোর মতো সামর্থ নেই। সেখানে ইচ্ছা জেগে উঠার প্রশ্ন আসে না। তাছাড়া এ পাড়াতে বেশ কিছু পরিবার অতিরিক্ত ধনাঢ্য। তাদের আবার টাকার পয়সার কোনো অভাবই নেই। কিন্তু তাদের মনে মানুষের জন্যে ভালোবাসা আর মায়ামমতার দারুণ অভাব রয়েছে।

নিতুর স্বামী আদর করে মেয়েটির নাম রেখেছিলো কুসুম। কুসুমের বয়স যখন তিন বছর হলো তখন নিতুর স্বামীর ক্যান্সার ধরা পড়লো। এরপর গত দুই বছর কোনো রকমে বেঁচে ছিলো। দারিদ্রতার কারণে কোনো চিকিৎসা করাতে পারেনি। তাছাড়া নিতুর স্বামী বলেছিলো, তার মৃত্যু নিশ্চিত। সুতরাং তার জন্যে ভিটেটুকু বিক্রির কোনো মানে হয় না। ভিটেটুকু বেঁচে থাকুক। এই ভিটে বিক্রি করে সাধারণ চিকিৎসা করে হয়তো কিছুদিন মরার মতো বেঁচে থাকা যাবে, কিন্তু দু’টি প্রাণের পায়ের তলার মাটি সরে যাবে। সেটা নিতুর স্বামী কোনোভাবেই সহ্য করতে পারেনি। তাই চিকিৎসা করার দরকার বলে মনে করেনি।

নিতুর স্বামী যেদিন মারা যায়, সেদিন নিতু মনের দুঃখে অনেক কেঁদেছিলো, সেই সাথে অবুঝ কুসুমও হাউমাউ করে কেঁদেছিলো। এরপর থেকে এই বাড়ি, সেই বাড়িতে মানুষের কাজে যায়; আর মানুষ দয়া করে খেতে দেয়, কিছু খাবার মেয়ের জন্যে নিয়ে আসে।

নিতু সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পরে বাড়িতে ঢুকতেই দেখে অতি আদরের কুসুম চিৎকার করে কান্নাকাটি করছে। প্রথম প্রথম মেয়ের জন্যে দুঃখ লাগতো। কিন্তু এখন দুঃখ হতে হতে আর দুঃখ মনে জেগে উঠে না, গা সয়ে গেছে। সেই সাথে মনের জোরও বেড়ে গেছে।

মানুষের বাড়িতে কাজ করতে যায় বলে, নিতুকে নিয়ে মানুষের আলোচনা আর সমালোচনার কোনো শেষ নেই। কিন্তু নিকৃষ্ট মানুষগুলোর কোনো দয়াই মনে জেগে উঠে না। শুধু বদনামই করতে জানে। এ পাড়ার মানুষগুলোর মধ্যে দয়ামায়া বলতে কিছু নেই। শিক্ষার দারুণ অভাব। তাই তাদের বিবেকের চোখ অন্ধ। সেই অন্ধ গলিতে আলোর আগমন হয় না বলে মানুষ চোখ থাকতেও ভালো মন্দের বিচার করতে জানে না। একজনের দুঃখ দেখলে তারা হো হো করে হাসে কখনো কখনো। এখানে কারো ব্যথা কেউ বুঝতে চায় না।

গত দু’দিন নিতুর ভালো কাজ হয়নি। ধনী মানুষগুলোর বাড়িতে কাজের অভাব রয়েছে। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিতু কান্নাকাটি করেছে। তবুও অন্তত রান্নাবান্নার জন্যেও নিতু রাখলো না। তাই গত দু’দিন কুসুমকে ভালো খাবার দিতে পারেনি। দিনশেষে পাশের বাড়ির প্রতিবেশী রাখালের বউ একবাটি খুদের খিচুড়ি দিয়েছিল। সেটা নিয়েও যেন মা-বেটিতে কাড়াকাড়ির মতো অবস্থা। কিন্তু নিজের সন্তানের পেটে না দিয়ে নিতু কোনোভাবেই খাবার মুখে দিতে মন চায় না। অথচ নিতুর পেটও ক্ষিধেয় চো চো করছে। সেই ক্ষিধের টানে ইচ্ছে করছিলো, বাটির সমস্ত খুদ একবারে মুখে দিয়ে খেয়ে ফেলতে। কিন্তু সন্তানের প্রতি মায়ায় সেটা করতে পারেনি। নিতু মনে মনে ভাবে, রাখালের বউ যদি আরেকটু বেশি করে দিতো, তাহলে আমিও খেতে পারতাম। কিন্তু রাখালের বউ কিভাবে দেবে? তাদেরও তো অভাব রয়েছে। তাছাড়া রাখাল কোনোভাবে জানতে পারলে বউকে আস্ত রাখবে বলে মনে হয় না। রাখালের লুকিয়ে লুকিয়েই বাটিতে ভরে খাবারটা দিয়েছিলো।

নিতুর একদিন কাজ থাকে তো, অন্যদিন কাজ হয় না। তাই খাবে কি, মানুষের বাড়িতে কাজ করে যে ক’টাকা আর খাবার পায় তাতে কোনো রকমে দু’দিন চলে যায়। তারপর আবার পেটে খাবার জোটে না।

একবার তালুকদার সাহেবকে অনুনয় বিনয় করে মাসিক বেতনের মতো একটা কাজ জুটিয়েছিলো। নিতু ভেবেছিলো, এখন থেকে দু’জনের দিনগুলো বেশ ভালোভাবেই কাটবে হয়তো। কিন্তু সেটাও বেশিদিন হলো না। তালুকদার সাহেবের নামে কারা যেন কুৎসা রটিয়েছে বিধবা নিতুকে নিয়ে। লোকলজ্জার ভয়ে তিনি আর কাজে রাখতে চাইলেন না। তাই তার বাড়িতেও কাজ করা বন্ধ হয়ে গেলো।

এই গ্রামের অর্ধেকেরও বেশি জমি তালুকদারদের।

এই তালুকদার যে শুধু অনেক জমির মালিকই তাই নয়, তিনি এই গ্রামের সমাজ প্রধানও বটে। দল পার্টি আর ক্ষমতা বলে চাউলের ডিলারশিপটিও তার হস্তগত করেছেন।

তালুকদার সাহেব একদিন কাঁচারি ঘরে বসেছিলেন। পাশের বাড়ির ওসমান তার সামনে এসে হাজির। কিন্তু তাকে দেখেই মনে মনে বিরক্তি হন তালুদার। কেননা, বিধবা নিতুকে নিয়ে সেই বদনাম রটিয়েছিলো। আর আজ ক্ষমা চাইতে ওসমান সোজা গিয়ে তার পায়ে পরে যায়। দুর্বল শরীরে কাতর কন্ঠে বলে হুজুর দু’দিন খাই নে, বড়ো মেয়েটা ভাতের জ্বালায় কেঁদে কেঁদে…….
কথা শেষ করতে দেয় না তালুকদার।

আর এদিকে ওসমান চোখের জল ফেলেই চলেছেন। বার বার বলছেন, আমি গরীব মানুষ। আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমাকে একটা কাজ দিন। তা না হলে আমার বাড়িতে বউ, মেয়ে না খেয়ে থাকবে। আমি বাঁচতে পারবো না।

তালুকদার সাহেব চেঁচিয়ে বলেন, এসব আগে ভাবতে পারলি না? একটা বিধবাকে নিয়ে বদনাম করতে তোর লজ্জা হলো না?

ওসমান আবারো কাতর কণ্ঠে বলে, আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি বড় অন্যায় করে ফেলেছি।
তালুকদার সাহেব শিক্ষায় আন্ডার মেট্রিক হলেও যোগ-বিয়োগের হিসাবটা ভালো’ই বোঝেন। সেই সাথে তার নীতিটাও বেশ ভালো রয়েছে। সবাই তার প্রশংসাও করেন।
একটু চিন্তা করে ওসমানকে বলেন, যা’ আমি তোকে মাফ করে দিলাম।
তারপর আবার একটু চিন্তা করে বলেন, তোর বাড়িতে ঘটি বাটি কিছু আছে নাকি রে?
ওসমান বলে, না, বাড়িতে কিচ্ছু নেই…..তবে আপনি যে যে কাজের কথা বলবেন আমি গায়ে খেটে সবগুলো কাজ ঠিকঠাক করে দেব, তবু আমাদের বাঁচান। আর সইতে পারছি না! ক্ষুধা যে বড় কষ্টের……

তালুকদার সাহেব এবার একটু রাগ হলেন। বললেন, আমার কাছ থেকে তাহলে দূরে চলে যা।
এবার দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় ওসমানের।
রেগে গিয়ে ওসমান বললো, সরকারি চাউল তো গরীবের জন্যেই আসে। আমরা তো গরীব। আমাদের কিছু দেবেন না?

কথাটি শুনেই তালুকদারের চোখ মুখটা রাগে লাল হয়ে যায়। তিনি অনেকটা উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘তুই কি মনে করিস, সরকারি চাল,ডাল আমি নিয়ে থাকি? আমি সবই খাই? তোমাদের মতো মানুষদের আমি–
কিঞ্চিত নীরব থেকে আবার বলে উঠলেন, শোন, ছোটলোক কোথাকার, আমি সারাদিন সৃষ্টিকর্তাকে ডাকি। আমি কোনো পাপ করি না। আমার নামে যদি এই কলঙ্ক দিস, তাহলে তোদের মরণ হবে রে, এই বলে রাখলাম।

ওসমান আরেকবার আবারো তালুকদারের পায়ে ধরতে যায়। কিন্তু করুনা পাওয়ার পথ তো ঐ কথা বলাতে বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করলে মানুষের মন পাওযা যায় না। মানুষের মন কঠোর থেকে কঠোর হয়ে গেলে, মানুষ মন গলে যাওয়ার বদলে আরো শক্ত হয়ে যায়।
বিকেল গড়িয়ে রাত আসে।
ওসমানের ঘুম আসে না।

রাত বারটার দিকে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠে একজন প্রতিবেশী তালুকদারের বাড়িতে ছুটে আসে। আর বলতে থাকে, তালুকদার সাহেব, ও তালুকদার সাহেব।
তড়িৎ গতিতে তালুকদার সাহেব ঘুম থেকে উঠে ‘কী হয়েছে, কী হয়েছে, এত চেঁচামেচি কীসের?’ বলতে বলতে ঘর থেকে বের হয়ে আসে।
‘ঐ ওসমান মারা গেছে’।

কথাটি শুনে তালুকদারের মনটা হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলো।
কারো সাথে দীর্ঘদিন সময় কাটানো মানুষটার মৃত্যু সংবাদে সকলেরই মন কেঁদে উঠে। তখন প্রতিটি মুহূর্তের ঘটনাগুলো একে একে মনে পড়তে থাকে। কিন্তু এই ওসমানই বিধবার নামে বদনাম রটিয়েছিলো। সেকারণে তার উপর রাগ হয়েছিলো তালুকদারের। অবশ্য একবার তালুকদার বিধবা নিতুর জন্যে পক্ষে কথা বলেছিলো। বলেছিলো, যেন তার জন্যে চিন্তা করি। অন্তত সেই কথাটা ভেবে বিধবার বাড়িতে যেতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু ওসমান যেভাবে বদনাম দিলো, তাতে তার বাড়িতে যেতেও মন চাইছে না।

তালুকদারের প্রচুর সম্পত্তি। তাই হঠাৎই বিধবা নিতুর জন্যে মনটা কেঁদে উঠলো। তালুকদারের মনে প্রচুর দয়ার সৃষ্টি হলো। নিজের তো কোনো ছেলে সন্তান নেই। এক মেয়ে রয়েছে। তার জন্যে যথেষ্ট সম্পত্তি। এখান থেকে কিছুটা সম্পত্তি বিধবাকে দিয়ে দিলে তাতে কোনো ক্ষতি হবে বলে মনে হয় না। এসব ভেবে সম্পত্তির তিন ভাগের একভাগ বিধবাকে দেবে বলে চিন্তা করলো।
গ্রামের কিছু গণ্যমান্য ডেকে বিষয়টি সকলের সামনে ঘোষণা দিয়ে দিলো। বিধবা নিতু মনের আনন্দে যে আকাশ থেকে পড়লো। এতো খুশি সে কোনো দিনই হয়নি।

এদিকে বিধবা নিতুকে সম্পত্তির তিন ভাগের একভাগ দিয়ে দেয়ায় চারিদিকে হৈচৈ পড়ে গেলো। নিন্দুকেরা তালুকদারের সমালোচনা শুরু করে দিলো। নিন্দার ঝড় শুরু হয়ে গেলো, এ খবর চারিদিকে বাতাসের মতো ছড়িয়ে গেলো। কাগজে কলমে লিখে দেয়ার পরের দিনই তালুকদার সাহেব নিখোঁজ হলেন। তাকে আর এলাকায় দেখা গেলো না। কানাকানিতে এই খবরও ছড়িয়ে গেলো। এখন আগের নিন্দার বিষয়টি চাপা পড়ে গেলো। কেননা বিধবা নিতু এলাকাতেই রয়েছে, কিন্তু তালুকদার সাহেব নেই। পরে অবশ্য জানা গেলো, ছোট বেলা থেকেই তালুকদার সাহেব বদনাম মাথায় নিয়ে বেঁচে ছিলেন। তার বাবা মানুষের কাছ থেকে জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করতেন। এসব মানুষের মুখে শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলেন তালুকদার সাহেব। তাই তিনি চিরদিনের মতো এলাকা ছেড়ে চলে গেলেন।

তালুকদারের দয়ায় বিধবা নিতু পায়ের তলায় মাটি পেয়েছে। কুসুম নামের মেয়েটির আর ভাতের অভাব রইলো না। কুসুম আর ভাতের জন্যে কান্নাকাটি করে না।
-সমাপ্ত –

শেয়ার করুন