তো এমনই

ক্ষুদীরাম দাসের ছোট গল্প : প্রথম দেখা

 

ইভা আজ শাড়ি পড়েছে। নীল শাড়ি। তাকে বেশ চমৎকার দেখাচ্ছে। এই প্রথম ইভা শাড়ি পড়েছে। তাই অন্যরকম দারুণ অনুভূতি ইভার মনের মধ্যে কাজ করছে। অবশ্য প্রথম শাড়ি পড়লে তরুণীদের মনের মধ্যে ভালো লাগার ঝড় বইতে থাকে। আর যদি হয় বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে তাহলে তো কথাই নেই। তার বান্ধবী স্মৃতির আজ জন্মদিন। তাই শাড়ি পড়ে উপহার প্যাকেট হাতে নিয়ে স্মৃতিদের ঘরে প্রবেশ করলো।

ঘরের দরজায় টোকা দিতেই স্মৃতি দরজাটি খুলে দিলো। শাড়ি পড়া দেখেই স্মৃতি চিৎকার দিয়ে ইভাকে জড়িয়ে ধরলো। আর বললো ঃ আজ তোকে কী যে দারুণ দেখাচ্ছে।
ইভা ঃ তাই নাকি? সত্যি আমাকে সুন্দর দেখাচ্ছে?
স্মৃতি ঃ হুম! তোকে বেশ সুন্দর লাগছে। এখন যদি কেউ তোকে দেখে তাহলে চোখ সরাতে পারবে না রে!
ইভা ঃ মানে! কী বলছিস এসব!
স্মৃতি ঃ কেনো বুঝিসনি আমি তোকে কী বললাম? এই সুন্দর দেখা অবস্থায় যদি তোকে কারো ভালো লেগে যায় তাহলে তুই নতুন সাগরে ভাসতে থাকবি!
ইভা ঃ বুঝতে পেরেছি! তো জন্মদিনের মূল অনুষ্ঠান কখন শুরু হবে!
স্মৃতি ঃ এই তো শুরু হয়ে যাবে। আমার ভাই কেক আনতে গেলো। হয়তো দশ মিনিটের মধ্যেই কেক নিয়ে ফিরে আসবে।
ইভা ঃ তোর আবার ভাই আসলো কোথা থেকে?
স্মৃতি ঃ আমার কাকাতো ভাই!
ইভা ঃ ও আচ্ছা! বুঝতে পেরেছি।
স্মৃতি ঃ আজ আমার অনেক আনন্দ। আমার নিজের জন্মদিন। তাছাড়া আমার ভাই এসেছে; আমার জন্যে অনেক সুন্দর সুন্দর ড্রেস নিয়ে এসেছে। সবমিলিয়ে খুবই ভালো লাগছে আমার কাছে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো তুই আমার জন্মদিনে উপস্থিত হয়েছিস।
ইভা ঃ হুম, বুঝতে পেরেছি, তোকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক আনন্দে আছিস!
স্মৃতি ঃ চেয়ারে বস। একটু অপেক্ষা কর। আমি তোর জন্যে কফি আনছি।

ঠিক দশ মিনিট পরই এক সুদর্শন যুবক স্মৃতিতে ঘরে ঢুকলো। হাতে একটি প্যাকেট করা কেক। ঢুকতেই ইভার চোখ সেই যুবকের দিকে চলে গেলো। গায়ে হালকা হলুদ টিশার্ট পরা, কালো প্যান্ট, চুলগুলো বাতাসে দুলছে। টেবিলের উপর কেকটা রেখেই সেই যুবকটি ভেতরে চলে গেলো। ইভার দু’টি চোখ সরাতেই পারছে না। এর আগে কখনো এমন সুদর্শন যুবক কোনোদিন কোথাও দেখেনি। না জানি, যুবতীদের কাউকে ভালো লেগে গেলে হয়তো এমনই হয় মনটা। ইভার মনের মধ্যে এলোপাথাড়ি বৈশাখী ঝড় হঠাৎ করেই বেড়েই গেলো। মুহূর্তের মধ্যে ইভা ভুলে গেলো যে, সে স্মৃতির জন্মদিনে এসেছে। এই যুবক ইভার মনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে, মনের গভীর থেকে আরো গভীরে চলে গেছে। ইভার ঠোঁট দু’টো কাপছে, ইভার যুব ধরফড় করছে। নিজেকে কোনোভাবেই সামলে নিতে পারছে না। মনের মধ্যে যুবকের ছবিটা মুহূর্তের মধ্যে এঁকে নিয়ে কল্পনার সাগরে ভেসে চলছে ইভা।

একটু পর ইভার চেতনা ফিরে আসলো। এদিক ওদিক তাকালো। তার দু’টি চোখ সেই যুবককে খুঁজছে। এজন্যে নিজে নিজেই লজ্জা পাচ্ছিলো। সে এখন বুঝতে পেরেছে, এতক্ষণ সে কোন জগতে চলে গেছে। নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে স্মৃতি কফি হাতে চলে এলো। এক কাপ ইভার হাতে দিয়ে, তার পাশেই স্মৃতি চেয়ার টেনে বসলো। স্মৃতি কিছু বলতে চাইছিলো, তখন ইভাকে দেখেই বুঝতে পারলো আগের মতো ইভা স্বাভাবিক নেই। তাকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে।
স্মৃতি আগবাড়িয়ে বললো ঃ তোর কোনো সমস্যা হয়েছে রে!
ইভা ঃ না রে! কিছু হয়নি।
ইভার ইচ্ছা করছিলো যুবকটি তার ভাই কিনা, কোথায় বাড়ি, কী করছে-ইত্যাদি। কিন্তু কিছুই জিজ্ঞাসা করতে পারছিলো না। তাছাড়া লজ্জা আর ভয়ে সঙ্কোচ মন নিয়ে স্মৃতিকে হঠাৎ করে কিছু বলাটাও শোভনীয় নয়। কথাচ্ছলে জেনে নেয়া যেতে পারে, সেটা নিজস্ব কৌশল খাটিয়ে।
স্মৃতি আবার জিজ্ঞাসা করলো ঃ না মানে, তোকে কেমন জানি চিন্তিত মনে হচ্ছে, তাই জিজ্ঞাসা করছি।
ইভা ঃ না রে, সে রকম কিছুই নয়।
স্মৃতি ঃ বাড়ি থেকে বলে আসিস নি!
ইভা ঃ অবশ্যই বলে এসেছি। তুই কি যে বলিস না! বাড়ি থেকে না বলে কোথাও কি যাওয়ার উপায় আছে?
স্মৃতি ঃ কেনো রে!
ইভা ঃ কী অদ্ভুত কথাবার্তা তোর। বাড়ি থেকে না বলে কি আসা যায়?
স্মৃতি ঃ অবশ্য ঠিকই।
ওরা দু’জন কফি খেতে গল্প করেই চলেছে। একটু পর যে রুমে যুবকটি ঢুকেছিলো সেই রুম থেকে বেড়িয়ে এলো। এবার যুবকটি খয়ের রঙের ফতুয়া পড়ে রুম থেকে বের হয়েছে। ইভার চোখ আবার চলে গেলো যুবকটির দিকে।
যুবকটি বের হয়েই বললো ঃ স্মৃতি, তোর কেকটি এনেছি! দেখেছিস কেমন হয়েছে?
কথাটি বলেই যুবকটি আবার নিজের রুমে চলে গেলো।
স্মৃতি ঃ না দাদা, এখনো দেখতে পারিনি। ধন্যবাদ দাদা। আমি দেখে নেবো।
ইভার দিকে তাকিয়ে স্মৃতি বললো ঃ এই হলো আমার দাদা।
ইভা স্মৃতির দিকে তাকালো মাত্র। তারপর স্মৃতি বললো ঃ এবার ডাক্তারী পাস করেছে। এই সুসংবাদটা দেয়ার জন্যে আমাদের বাড়িতে এসেছে। ভাবছি, গ্রামের বাড়িতে আমরাও দাদার সাথে যাবো।
ইভা ঃ কতদিন থাকবে?
স্মৃতি ঃ আমার সেখানে চার পাঁচদিন থাকবো।
ইভা ঃ সেটা বলিনি। বললাম, তোর দাদা কতদিন থাকবে তোদের বাসায়?
স্মৃতি ঃ আজ থাকবে, কালকের দিন থাকবে, পরের দিন চলে যাবে।
ইভা ঃ হুম!
স্মৃতি ঃ কেন রে!
ইভা ঃ এমনি জিজ্ঞাসা করলাম।
স্মৃতি ঃ না মানে, জিজ্ঞাসা করার ধরণটা অন্যরকম লাগলো, স্বাভাবিক মনে হলো না।
ইভা ঃ তার মানে, তুমি কী বলতে চাইছিস!
স্মৃতি কোনো কথা বলছিলো না। চুপ করে রইলো। কফি খেতে খেতে মুচকি হাসছিলো শুধু। আর ইভার দিকে তাকাচ্ছিলো। ইভা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। তারপর বললো ঃ ধুর, তোকে জিজ্ঞাসা করাটাই মনে হয় ভুল হয়েছে। তাছাড়া একজন নতুন মানুষের পরিচয় করিয়ে দিলি, আমি তার সম্পর্কে জানতে চাইলাম, তাতে এভাবে বলার কী আছে?
স্মৃতি ঃ আমি তো তেমন কিছুই বলিনি।
ইভা ঃ বলিস নি ঠিকই। কিন্তু কিছু ফাজিলামি করার চেষ্টা করছিস।
স্মৃতি ঃ আমি তো আর তোর মনের কথা বুঝতে পারি না। তাই তোকে সঠিক বলতে পারবো কীভাবে? কিছু অনুমান করলাম আর কী?
ইভা ঃ অতিরিক্ত হচ্ছে রে!
স্মৃতি ঃ আরে থাক, আমি একটু মজা করছিলাম। তবে আমার দাদাটা না খুবই ভালো। নিজের দাদা বলেই বলছি না। সত্যি আমার দাদা খুবই ভালো।

জন্মদিনের কেক কাটার সময় হলো। আশপাশ থেকে আমন্ত্রিত অতিথিরা চলে আসছিলো। স্মৃতিতে ঘর লোকে পরির্পূ হয়ে গেলো।

যখন কেক কাটার পর্ব অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো তখন স্মৃতিকে নিয়ে সকলেই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সকলেরই নজর স্মৃতির দিকে। তার বয়স আঠারোতে পূর্ণ হয়েছে আজ। তাই বেশ ঘটা করেই অনুষ্ঠান করছে স্মৃতি। তখন একসময় স্মৃতির নজর পড়লো ইভার দিকে। ইভা বার বার তাকাচ্ছিলো স্মৃতির দাদার দিকে। এটা স্মৃতি বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করেছে। স্মৃতিও বেশ মজা নিচ্ছিলো তাদের চোখাচোখি দেখে। অবশ্য স্মৃতির দাদা ডাক্তারী পাস করলেও ইভারও কিন্তু বেশ যোগত্যা ছিলো। ইভা পড়াশোনায় যথেষ্ট ভালো ছাত্রী। তাছাড়া দেখতে শুনতেও বেশ ভালো।

কেক কাটা পর্ব, বেলুন ফাটানো পর্ব, মিষ্টি খাওয়া ও নাস্তার পর্ব শেষে সকলে স্মৃতিকে আশির্বাদ করে উপহার দিয়ে চলে গেলো। সবাই চলে যাবার পর স্মৃতি প্রতিবেশীর এক ছোট ছেলেকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার জন্যে তাকে নিয়ে চলে গেলো।

এই মুহূর্তে ঘরে ইভা ও ঐ যুবক রয়েছে। কিছুটা সময় নীরব থাকার পর যুবকটি সাহস করে ইভার পাশে এসে বসলো।

ইভাকে জিজ্ঞাসা করলো ঃ আপনার নাম কী?
ইভার মনে ভীষণ ভয় জেগে উঠলো। মনে মনে ভাবলো, লোকটির যথেষ্ট সাহস। ঘরে কেউ নেই, তাই একটু ভয়ই লাগছিলো। আবার মনে মনে বেশ খুশিই হচ্ছিলো ইভা। ইভারও মনে মনে ইচ্ছা হচ্ছিলো যুবকটির সাথে একটু কথা বলতে। যেহেতু যুবকটি আগে থেকেই কথা বলছে সুতরাং এই সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না।
ইভা ঃ আমার নাম ইভা! আপনার নাম কী?
দ্বীপ ঃ আমার নাম দ্বীপ!
ইভা ঃ খুব সুন্দর নাম আপনার!
দ্বীপ ঃ আপনি খুব সুন্দরী।
ইভা ঃ সত্যি বলছেন তো! নাকি আমাকে খুশি করানোর জন্যে?
দ্বীপ ঃ সত্যি বলছি, আপনাকে নীল শাড়িতে দারুণ লাগছে। আমি তো আপনাকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ করে ফেলেছি।
ইভা ঃ আপনি তাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে দিলেন কেনো? আমি কিন্তু আপনাকে সন্দেহ করছি।
দ্বীপ ঃ স্মৃতি তো প্রতিবেশীর ছোট ছেলেটাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে গেলো। এতে সন্দেহ করার কী আছে?
ইভা ঃ আপনি তো ইচ্ছা করলে তাকে আটকে রাখতে পারতেন। নাকি চালাকি করে স্মৃতিকে বের করে দিয়ে সুযোগ নিতে চাইছেন?
দ্বীপ ঃ আপনি তো আশ্চর্য মানুষ! এর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
ইভা ঃ ও বুঝতে পেরেছি।
দ্বীপ ঃ আপনি তো মনে মনে আমার সাথেও কথা বলতে চাইছেন, তাই না?
ইভা ঃ আপনার মতো আমিও!
দ্বীপ ঃ আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?
ইভা ঃ আপনার কী মনে হয়?
দ্বীপ ঃ প্রশ্নের উত্তরে উল্টো প্রশ্ন কেনো? সরাসরি উত্তর দিন।
ইভা ঃ আপনি টিচারদের মতো জিজ্ঞাসা করছেন কেনো? এভাবে কথা বললে আমার কিন্তু মোটেও ভালো লাগে না।
দ্বীপ ঃ আসলে সরাসারি উত্তরটা পেলে ভালো লাগতো।
ইভা ঃ আমি তো আপনার মনের কথা জানতে চাইছিলাম।
দ্বীপ ঃ আপনি অনেক সময় ধরে ‘আপনি আপনি’ করছেন। ‘তুমি’ করে কবে বলবেন?
ইভা ঃ বাসর রাতে বলবো?
দ্বীপ ঃ তাহলে তো অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।
ইভা ঃ অপেক্ষা করুন। অপেক্ষায় অনেক আনন্দ আছে।
দ্বীপ ঃ বাহ্! আপনি তো বেশ গুছিয়ে কথা বলেন। আপনার কথা কিন্তু কবিতার মতোই সুন্দর লাগে।
ইভা ঃ আপনার কথাও তো বেশ ভালো লাগে।
দ্বীপ ঃ আরেকটু হলেই তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে। বাড়ি থেকে আপনাকে খোঁজ করবে না?
ইভা ঃ আমার মোবাইল বন্ধ। ফোন খোলা থাকলে এতক্ষণে বাবা আমাকে জ¦ালিয়ে মারতো।
দ্বীপ ঃ হুম! বুঝতে পেরেছি। আপনাকে প্রথম দেখাতে কিন্তু আমি ভালোবেসে ফেলেছি।
ইভা ঃ আমিও।
দ্বীপ ঃ আমি স্মৃতিকে আপনার কথা বলেছি। সে অবশ্য আপনার সাথে প্রেম করতে উৎসাহিত করেছে।
ইভা ঃ তার মানে?
দ্বীপ ঃ তার মানে সে সবকিছুই জানে কিন্তু। আমি যখন কেক নিয়ে ঘরে ঢুকছিলাম, তখন আপনাকে একনজর দেখেছিলাম। তারপর কেকটি রেখে আমার রুমে গেলাম। এরপর পর্দার ফাঁক দিয়ে আপনাকে বার বার দেখেছিলাম।
ইভা ঃ লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়েদের দেখা! এ ধরনের অভ্যাস থাকা কিন্তু মোটেও ঠিক নয়।
দ্বীপ ঃ তুমি তো আমার মনের রাণী। প্রথম দেখাতে তুমি আমার হৃদয়কে হরণ করেছো। প্রথম দেখায় তোমাকে ভালো লাগলো বলে।
ইভা ঃ আমারও তোমাকে প্রথম দেখায় ভালো লেগেছে।
স্মৃতি তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকেই একটু জোর দিয়ে বললো ঃ তোমরা দু’জন দূরত্ব বজায় রেখে বস। মা বাবা ঘরে ঢুকছেন।
কথাটি শুনের দ্বীপ তাড়াতাড়ি দূরত্ব বজায় রেখে সম্পূর্ণ আলাদা একটি চেয়ার নিয়ে বসলো। আর স্মৃতি হাসিমুখে চোখের ইশারায় ইভাকে উৎসাহিত করলো। ইভা ভালো লাগা লজ্জায় রাঙা হয়ে গেলো।
—– সমাপ্ত ———

17 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন