press

‘সাংবাদিক ও সামাজিক মাধ্যমকর্মী নির্যাতনকারীদের আইনের আওতায় না এনে অব্যাহতি দেয়া মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য হুমকি’

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

সাংবাদিক ও সামাজিক মাধ্যমকর্মী নির্যাতনকারীদের আইনের আওতায় না এনে অব্যাহতি দেয়া মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য হুমকি: আর্টিকেল নাইনটিন ২০২০ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন

২ মে ২০২১: আর্টিকেল নাইনটিনের ২০২০ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা গেছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কাজ আইন ও নীতিমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘিত হচ্ছে।

আর্টিকেল নাইনটিন একটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। ১৯৮৭ সালে সংস্থাটি তার যাত্রা শুরু করে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। বাংলাদেশে সংস্থাটি ২০০৮ সালে এর যাত্রা শুরু করে। সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় বাংলাদেশে অবস্থিত। ২০১৩ সাল থেকে সংস্থাটি প্রতি বছর বাংলাদেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে একটি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে আর্টিকেল নাইনটিনের বার্ষিক প্রতিবেদনটিতে দেখা গেছে, ২০২০ সালে করোনাকালীন সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে একজন সংবাদকর্মী নিহত ও ৩ জন সাংবাদিক অপহৃত হয়েছেন।

সংস্থাটির নিজস্ব নিজস্ব পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মোট ৬৩১ জন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী কোনো না কোনোভাবে প্রভাবশালী পক্ষের দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ২৫৬ জন সাংবাদিক ও ৩৩৮ জন মানবাধিকার কর্মী। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৩ টি অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধ করা হয়েছে বা তাদের তথ্য বা সংবাদ কোনো না কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহের সময় প্রতিবাদকারীদের দমন-পীড়নের ৩৬টি ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ৬ টি অপপ্রচার বা ঘৃণা ছড়ানোর ঘটনা এই প্রতিবেদনের জরিপে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের জরিপে দেখা গেছে, সাংবাদিক ও সামাজিক মাধ্যম কর্মীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (২০১৮) আওতায় মামলার উর্ধ্বগতি আশঙ্কাজনক। এই পরিস্থিতি মূলত বাংলাদেশের সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী ও অনলাইনকর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী বা মানবাধিকার কর্মীদের অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়নের জন্য দোষী ব্যক্তিদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার নজির রয়েছে যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বিঘ্নিত করছে।

জরিপে দেখা গেছে, ২০২০ সালে প্রায় ১৬ শতাংশ সাংবাদিক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ১১ মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। ৯৬ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ৪৭ জন (৭.৪৫%) বিভিন্ন বিভিন্ন মহলের হুমকি-ধামকির শিকার হয়েছেন।

প্রায় ৭২ শতাংশ (৭১.৯২%) গণমাধ্যমকর্মী আইনী হয়রানির শিকার হয়েছেন যা প্রতিবেদনের জরিপের তথ্য থেকে পাওয়া গেছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা হয়েছে। ১১ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে মানহানির মামলা। অনলাইনে মত প্রকাশের কারণে ৪১০টি মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটেছে শুধুমাত্র ২০২০ সালে। ৪টি ক্ষেত্রে আদালত অবমাননা বিষয় মামলা দায়ের করা হয়। ২৯টি মামলার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছিল না।

এসব ক্ষেত্রে আক্রমণের শিকার হন অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয় সাংবাদিক। প্রায় ৭৮ শতাংশ (৭৭.২৮%) স্থানীয় সাংবাদিক ২০২০ সালে তাদের এলাকায় আক্রমণ বা নির্যাতনের শিকার হন। রাজধানীতে এই হার ২২ শতাংশ (২২.২২%)। ইন্টারনেটে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের ৩টি ঘটনা বেশ আলোচিত হয়। তবে এ ধরনের আর ২০টির মতো ঘটনা আছে।

প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায় সবক্ষেত্রেই সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশের জের ধরে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অথচ সাংবাদিকরা দুর্নীতি, নিয়ম বহির্ভূত সরকারি কাজ বা স্থানীয় দুর্বৃত্তদের অপকর্মের ঘটনা তুলে আনতে কাজ করেছেন বা করছেন যা মূলত নাগরিকের তথ্য অধিকার নিশ্চিতের একটি প্রয়াস।

সরকারি দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনগুলোর ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার, সরকারের বেআইনী গ্রেফতার প্রবণতা, আটক বা নির্যাতনের ঘটনা বার্ষিক এই প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে। দেশের এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে আশঙ্কাজনক।

 

অন্যদিকে, করোনার কারণে মিডিয়া হাউজগুলোর আয় সঙ্কুচিত হওয়ায় ২০২০ সালে ১৬০০ সাংবাদিক তাদের চাকরি হারান। এক্ষেত্রে নারী সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। মিডিয়া হাউজগুলোর চাকরি নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় মূলত ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে নারী সাংবাদিকরা আগে চাকরি ঝুঁকিতে পড়েন।

 

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও এর প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। করোনার এই দুর্যোগের সময়, বিশেষত করোনার দ্বিতীয় প্রবাহে স্বাস্থ্য তথ্য ও জীবন রক্ষাকারী যে কোনো তথ্যে নাগরিকের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত আবশ্যক।

পাশাপাশি সাংবাদিকের দায়দায়িত্ব, নৈতিকতার প্রকাশও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম মানুষের সামনে তথ্য প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম এবং গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। কিন্তু বিশ্বের পরিবেশ সাংবাদিকদের জন্য যেন আরও বৈরী হয়ে উঠছে। মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপনে আর্টিকেল নাইনটিন এই বিষয়টিকেই সকলের সামনে তুলে আনতে চেয়েছে।

 

মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উদযাপনের অনলাইন আলোচনায় আর্টিকেল নাইনটিনের বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালকের বলেন, ’সাংবাদিকের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও কল্যাণ প্রশ্নে আমাদের আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও তথ্যের অবাধ প্রবেশযোগ্য নিশ্চিতে সামনে রয়েছে আরও অনেকটা বন্ধুর পথ।’ তিনি বলেন, ’ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের অধীনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধামান অন্যায্য মামলার ঘটনায় আর্টিকেল নাইনটিন উদ্বিগ্ন। কারণ এই পরিস্থিতি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে মারাত্মক হুমকি।‘ আর্টিকেল নাইনটিনের আঞ্চলিক পরিচালক আরও বলেন, “যেসব অপরাধী সাংবাদিকদের বিভিন্ন সময় নির্যাতন নিপীড়ন করেছে, তাদের আইনের আওতায় না এনে ছেড়ে দেওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন এবং আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। আমাদের সকলের মনে রাখা প্রয়োজন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি সাংবাদিকদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনলাইন সেমিনারে বলেন, সাংবাদিকরা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও নাগরিকের কাছে প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সংবাদ ‍তুলে ধরেন যা মূলত আমাদের মৌলিক অধিকার চর্চায় সাহায্য করে।

শেয়ার করুন