আমিন probash amin

যত দোষ, সাংবাদিক ঘোষ!

প্রভাষ আমিন :  মানছি, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা একটা কঠিন সময় পার করছে। কিন্তু এই সময়ের দায় তো সাংবাদিকদের নয়। সিনিয়র সাংবাদিক আফসান চৌধুরী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মিডিয়া বলে একক কিছু নাই। তিন গোষ্ঠী মিলে এটা ১. মালিক. ২. ঊর্ধ্বতন কর্মী/সাংবাদিক/সম্পাদক ৩. সাধারণ সাংবাদিক। প্রথমটা সকল ক্ষমতা রাখে, ঠিক করে কী যাবে কী যাবে না। তার উদ্দেশ্য ক্ষমতাবানদের খুশি করা, নিজের সম্পদ বাড়ানো। ২. এরা মিডিয়া চালায়, মালিককে তেল দেয়, কর্মীদের ওপর ছড়ি ঘোরায়, লাইন করে, একদিন পত্রিকার সম্পাদক হবার আশা রাখে। রাজনীতি করে কিন্তু এদের ওপর বাপ্ আছে।৩ নম্বর হচ্ছে চাকা ভাঙা সাইকেল, সংসার চালাতে ব্যস্ত, ক্ষমতাহীন অসহায় মানুষগণ। বেশির ভাগ ঢাকার বাইরে থেকে আশা, বিসিএস হতে পারবে না বা অন্য ভালো চাকরির সুযোগ কম বলেই সাংবাদিক। মিডিয়াকে গালি দিয়ে লাভ নেই কারণ মালিক, নেতা আর কর্মী তিন আলাদা দুনিয়ার প্রাণী। (কিছু ব্যতিক্রম তো আছেই কিন্তু তাতে মিডিয়ার চরিত্র বা কাঠামো পাল্টায় না)।‘
মোটা দাগে আমি আফসান ভাইয়ের সাথে আমি একমত। দেশে তিন নাম্বার গোত্রের সাংবাদিকই বেশি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে কোনো অব্যবস্থাপনার জন্য মানুষ ডাক্তারদের গালি দেয়। এমনকি হাসপাতালের বাথরুম ময়লা থাকলেও দোষ হয় ডাক্তারের। কারণ তারাই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে থাকেন। মানুষ তাদেরই দেখতে পায়। তেমনি গণমাধ্যমে কোনো বিচ্যুতি হলে আফসান ভাইয়ের তালিকার তিন নম্বরে থাকা অসহায় সাংবাদিকদেরই সবাই গালি দেয়। কারণ তারাই মাঠে ময়দানে থাকে। তারা তো সংবাদ সংগ্রহ করে। কিন্তু ট্রিটমেন্ট দেয়া না দেয়ার সিদ্ধান্ত বা ক্ষমতা কিন্তু তার নয়। বরং একটি সত্য ঘটনা লেখার পরও সেটি ছাপা না হলে তার যে বেদনা, সেটা আমরা কেউ দেখতে পাই না, বোঝা তো অনেক পরের কথা।
গুলশানে কলেজছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় ভালো সাংবাদিকতা হয়নি, সেটা মানছি। ভালো সাংবাদিকতা তো অনেক পরে কোখাও কোথাও অপসাংবাদিকতাও হয়েছে। এ ঘটনায় চার ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়েছে গণমাধ্যমে। কিছু গণমাধ্যম ঘটনাটিকে সাধারণভাবে দেখে নির্মোহভাবে ট্রিটমেন্ট দিয়েছে। কিছু মিডিয়া, যাদের সাথে বসুন্ধরার সম্পর্ক খারাপ, তারা অতি উৎসাহ দেখিয়েছে। কিছু মিডিয়া, যাদের সাথে বসুন্ধরার সম্পর্ক ভালো, তারা উল্টো মরে যাওয়া মেয়েটির চরিত্র হননে নেমেছে নোংরাভাবে। আর বসুন্ধরার মালিকানাধীন মিডিয়াগুলো এ ব্যাপারে স্পিক টি নট। এখন এই চার ধরনের প্রতিক্রিয়ার কোনো সিদ্ধান্তই কিন্তু আফসান ভাইয়ের তিন নাম্বার তো বটেই, তালিকার দুই নাম্বারে থাকা সাংবাদিকরাও নেননি। এখানে পুরোটাই পূঁজির ব্যাপার।
এখানে সাংবাদিকদের কিছু করার নেই। অনেকে বলছেন, কিছু করার না থাকলে চাকরি ছেড়ে দেন, তরমুজের ব্যবসা করেন। ভালো পরামর্শ। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করার প্রতিবাদে পদত্যাগ করাটাই সবচেয়ে ভালো সমাধান। কিন্তু বিপ্লবী ভাইয়েরা, সাংবাদিকদেরও কিন্তু সংসার আছে। তাদেরও বাসা ভাড়া দিতে হয়, বাজার করতে হয়। বসুন্ধরার মালিকানাধীন ৭টি গণমাধ্যমের হাজার তিনেক কর্মী যদি আজ পদত্যাগ করে, আপনি তাদের বাহবা দিতে পারবেন, ফেসবুকে ঝড় তুলতে পারবেন। কিন্তু এই করোনাকালে কয়জনকে চাকরি দিতে পারবেন? তরমুজের ব্যবসা করার মত পূঁজি বা বুদ্ধি তো সবার নাও থাকতে পারে। আর অভিযোগ বসুন্ধরার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে। পুলিশ তদন্ত করবে, আদালত বিচার করবে। কিন্তু একজন ব্যক্তির দায় পুরো প্রতিষ্ঠানের সবাইকে নিতে হবে কেন?
আপনারা যে সাংবাদিকদের গাল দিচ্ছেন, এটাকে আমি প্রাপ্তি বলেই মানি। সাংবাদিকদের কাছে আপনাদের উচ্চ প্রত্যাশার কারণেই আপনাদের হতাশাও প্রবল। তবে খালি একটা অনুরোধ, আমাদের অসহায়ত্ব, সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করুন; ঢালাওভাবে আমাদের সততা, নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না। সাংবাদিকরা কিন্তু আত্মসমালোচনা করতে জানে, নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নিতে চেষ্টা করে, প্রয়োজনে ক্ষমা চাওয়ার সৎসাহসও সাংবাদিকদের আছে।
এই ঘটনায় অপসাংবাদিকতা করা প্রতিষ্ঠান কিন্তু হাতে গোনা। আপনারা আমাদের ভুল ধরিয়ে দিন, গণমাধ্যমের পাশে থাকুন। গণমাধ্যম কিন্তু শেষ পর্যন্ত জনগণেরই মাধ্যম। এখনও কিন্তু মানুষ কোথাও বিচার না পেলে শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যমের কাছেই আসে।
লেখা শেষ করছি সুমন চট্টোপাধ্যায়ের একটি গানে তোলা প্রশ্ন দিয়ে-
যদি ভাবো কিনছো আমায়, ভুল ভেবেছো
কেনা যায় কণ্ঠ আমার দফা দফা
রুজি-রোজগারের জন্য করছি রফা
দু’হাতের আঙুলগুলো কিনতে পারো
আপসেও নেই আপত্তি, নেই আমারও
আমাকে না, আমার আপস কিনছো তুমি
বলো কে জিতলো তবে জন্মভূমি, জন্মভূমি?
20 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন