ভাবীর পরকীয়া

দেবর-ভাবির পরকীয়া: যেভাবে হত্যা করা হয় স্বামীকে

বিয়ের পর থেকেই পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপনগর কলেজপাড়া নিবাসী ব্যবসায়ী শাকিল আহমেদ (৩৫) এর স্ত্রী মিম (২২) এর সঙ্গে ছোট ভাই সাব্বির আহমেদের (দেবর) পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে শাকিলের সঙ্গে বাবা-মা ও একমাত্র ছোট ভাইয়ের জমিজমা ও পুকুরে মাছচাষের ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ ছিল। আবার তাদের পরকীয়ার বিষয়টি শাকিল আঁচ করতে পারেন। তাই সব বাঁধা দূর করতে দেবর-ভাবি মিলে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে কুশনচাপা দিয়ে হত্যা করে শাকিলকে।

এমনকি শাকিলকে হত্যার পর মিম ও সাব্বির বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সাব্বির ওড়না দিয়ে মিমের দুই পা, শাকিলের পাঞ্জাবি দিয়ে দুই হাত এবং পরিহিত ওড়না দিয়ে মুখ বেঁধে বাইরে থেকে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে চলে যান। এ সময় সাব্বির মিমের সঙ্গে গোপনে কথা বলার জন্য তাকে দেয়া মোবাইল ফোনটিও নিয়ে যান এবং বাসার মেইন গেটের চাবি পাশের বাসার দেওয়ালের ওপর রেখে দেয়।

২৮ মে রাতে শাকিলের মরদেহ ভাড়া বাসা হতে উদ্ধারের পর বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। দেবর-ভাবির প্রেমঘটিত ঘটনায় এ হত্যা হয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান। ঘটনার সঙ্গে জড়িত মিম ও সাব্বিরকে আটক করেছে পুলিশ।

পরে থানায় জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। ইতোমধ্যে নিহত শাকিলের স্ত্রী মিম ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। সাব্বিরকে চার দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।

প্রাথমিক তদন্ত ও আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের পর উঠে আসা তথ্যে পুলিশ সুপার মহিবুল ইসলাম খান জানান, বিয়ের পর থেকেই শাকিলের স্ত্রী মিমের সঙ্গে ছোটভাই সাব্বিরের পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শাকিলের সঙ্গে বাবা-মা ও একমাত্র ছোট ভাইয়ের জমিজমা ও পুকুরে মাছচাষের ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ ছিল। স্ত্রী মিম ও সাব্বিরের মধ্যকার পরকীয়ার বিষয়টিও শাকিল আঁচ করতে পারেন। যে কারণে একই বাড়িতে অবস্থান করেও আলাদাভাবে সংসার শুরু করেন শাকিল।

বিষয়টি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেলে শাকিল গত ১৯ মে স্ত্রীকে নিয়ে ঈশ্বরদী শহরের রূপনগর কলেজপাড়া মহল্লায় জনৈক আহসান হাবিবের বাড়ির দ্বিতীয় তলায় ভাড়াটিয়া হিসেবে ওঠেন। কিন্তু সাব্বির গোপনে একটি মোবাইল ফোন মিমকে দেন, যা মিম লুকিয়ে রেখে শুধু সাব্বিরের সঙ্গে গোপনে কথা বলতেন এবং বাড়ি ফাঁকা পেলে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতেন।

একপর্যায়ে স্ত্রী মিম ও ছোট ভাই সাব্বির শাকিলের প্রতি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে যান এবং তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ২৭ মে রাতে মিম পানির সঙ্গে তিনটি ঘুমের ট্যাবলেট গুঁড়া করে মিশিয়ে শাকিলকে খাওয়ান। সে পানি খেয়ে পরদিন ২৮ মে শাকিল সারাদিন ঘুমিয়ে কাটান। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সন্ধ্যার পরে সাব্বির শাকিলের বাসায় আসবেন বলে মিমকে মোবাইল ফোনে জানিয়ে রাখেন।

সাব্বির যখন গোপনে বাসায় আসেন, শাকিল তখনো ঘুমের ওষুধের প্রভাবে ঘুমাচ্ছিলেন। পরে তারা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী শোয়ার ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় শাকিলের নাকে-মুখে সোফা সেটের কুশন (বালিশ) দিয়ে চাপা দেন। এতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যান শাকিল। অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর ফলে শাকিল তেমন কোনো প্রতিরোধ করতে পারেননি।

শাকিলকে হত্যার পর মিম ও সাব্বির বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সাব্বির ওড়না দিয়ে মিমের দুই পা, শাকিলের পাঞ্জাবি দিয়ে দুই হাত এবং পরিহিত ওড়না দিয়ে মুখ বেঁধে বাইরে থেকে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে চলে যান। এ সময় সাব্বির মিমের সঙ্গে গোপনে কথা বলার জন্য তাকে দেয়া মোবাইল ফোনটিও নিয়ে যান এবং বাসার মেইন গেটের চাবি পাশের বাসার দেওয়ালের ওপর রেখে দেয়।

ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, সাব্বিরের কাছ থেকে মিমের কথা বলার গোপন মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। মিমের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদালতে রেকর্ড করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কোনো আসামি জড়িত আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আসামি সাব্বিরকে চার দিনের পুলিশ রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলাটি তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ মে রাতে পাবনার ঈশ্বরদী বাজারের এক কাপড় ব্যবসায়ী ও মুলাডুলি ইউনিয়নের প্রতিরাজপুরের দুবলিয়া গ্রামের ইব্রাহিম হোসেনের ছেলে শাকিলের মরদেহ ভাড়া বাসা হতে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহত শাকিলের মামা কোরবান আলী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে ঈশ্বরদী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

শেয়ার করুন