অনাথ হত্যা চাঁদপুর রিপোর্ট

জমি সংক্রান্ত বিরোধেই কাল হলো ফরিদগঞ্জের অনাথের

আনিছুর রহমান সুজন :
মাছ ব্যবসায়ী অনাথ দাস ১৮ বছর পুর্বে নিজের চাচাতো ভাই সুবল দাসের কাছ থেকে ৩শতক জমি কিনেছেন। সেই ক্রয়কৃত জমি তিনি শেষ পর্যন্ত বুঝে পাননি। কিন্তু জমি দখল স্বত্ব বুঝে পেতে বছরের পর পর সালিশ বৈঠকসহ সকল কিছুই করেছেন। ত্রিশ হাজার টাকা জমির জন্য খরচ করেছেন লক্ষ টাকা। শিকার হয়েছের মারধরের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই জমির জন্যই তাকে নৃংশস ভাবে খুন হতে হলো।

নিখোঁজের সাতদিন পর তার অর্ধগলিত দেহ উদ্ধারের পর ছায়াতদন্তে নামা পিবিআই হত্যাকান্ডের রহস্যজাল ভেদ করলো। পুলিশ সূত্র মতে , জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ভারাটে খুনির হাতেই খুন হতে হয় অনাথ দাসকে। এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত কড়ৈতলী বাবুর বাড়ির পাশে থাকা সেকান্দর গাইন ওরপে শেখার ছোট ছেলে সোহাগকে পুলিশ আটকের পর সে হত্যার কথা স্বীকার করে। সোহাগের কাছ থেকে অনাথ দাসের মুঠো ফোনটি উদ্ধার করে। এই এই হত্যাকাÐের সাথে জমি সংক্রান্ত বিরোধের মুল হোতা সুবলদাসসহ ৪জন জড়িত বলে জানা গেছে।

কে এই সোহাগ:
নানার বাড়ির প্রাপ্ত সম্পত্তির উপর থাকে সেকান্তর গাইনের দুই সন্তান । দক্ষিণ কড়ৈতলী গ্রামের লদ বাড়ির পাশেই তথা বাবুর বাড়ির পাশেই তাদের বাসস্থান। সোহাগ মূলত এলাকায় গাছী হিসেবে পরিচিত। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হিসেবে সে গাছ কাটার সাথে সাথে দিনমজুরের কাজ করতো। সম্প্রতি সে এবং জনৈক টিটু লদ বাড়ির একটি পুকুর ইজারা নিয়ে মৎস্য ব্যবসায়ী হিসেবে নাম লেখায়।

সরেজমিন গেলে সোহাগের সন্তান সম্ভবা স্ত্রী আমেনা বেগম জানান, তিনি ৬ বছরের ছেলে আরাফাতকে নিয়ে কোথায় যাবেন । কি করবেন। কিছুই বুঝতে পারছেন না। দুইদিন পূর্বে সমিতির লোক পরিচয় দিয়ে কিস্তির বিষয়ে কথা বলতে এসেছে বলে তাদের ঘরের সামনে কয়েকজন লোক আসে। পরে তারা সোহাগের খোঁজ করে। এসময় আমেনা বেগম, তার স্বামী সোহাগকে ফোন দেয়। যদিও তারা কোন সমিতি থেকে ঋণ নেয়নি বলে জানায়। কিন্তু আমেনা বেগমকে দিয়ে সোহাগকে ফোন করিয়ে অবস্থান নিশ্চিত হয়ে সোহাগকে আটক করে পিবিআই।

আমেনা বেগম জানায়, তার নিজের মোবাইল ফোন ছাড়াও সোহাগের কাছে পাওয়া আরো একটি মোবাইল ফোন নিয়ে যায় তারা।

স্থানীয় বিভিন্ন লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সোহাগ নেশার সাথে জড়িত। দিনমজুর হিসেবে কাজ করতো সে। তবে তার বিরুদ্ধে গুরুতর কোন অভিযোগ নেই।

সরেজমিন এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, পিবিআই সোহাগকে আটকের পর বুধবার দুপুরে সোহাগের মামাতো কামরুল ও টিটু নামে দুইজনকে আটক করে।

স্থানীয় লোকজন জানান, গত ১৯ জুলাই সোমবার সকালে তিনি কড়ৈতলীর পাশ্ববর্তী শাহী বাজারে মাছ বিক্রি করতে যান। মাছ বিক্রি করে তিনিসহ লোকজন এসে কড়ৈতলী বাজারের একটি চায়ের দোকানে এসে চা খান। পরে সেখানেই তার কাছে একটি ফোন আসে। এরপর তার সঙ্গীদের কাছে তার কাজ আছে বলে চলে যান। এরপর থেকে তার আর খোঁজ মিলেনি।

ঘটনাস্থল:
পাইকপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের দক্ষিণ কড়ৈতলী গ্রাম ও সাহাপুর গ্রামেকে পৃথক করা ডাকাতিয়া নদীর শাখা খালের মধ্যে অনাথ দাসের লাশ পাওয়া যায়। লাশ প্রাপ্তির স্থান থেকে ঘাতক সোহাগের বাড়ি কয়েকশত গজ দুরে। খালের একপাশে সাহাপুর গ্রামের পন্ডিত বাড়ির ধান ক্ষেত এবং বিভিন্ন আবাদি ফসল। রয়েছে ঝোপ ঝাঁড়। অন্যদিকে বিপরীত দিকে রাস্তার পাশে পুকুর লদ বাড়িসহ আশেপাশে বাড়ি ঘর রয়েছে। স্থানীয় লোকজন জানান, নানা সময়ে এই খালে বিভিন্ন প্রাণীর মৃতদেহের গন্ধ ছড়াতো। এইসময় তারাও মনে করেছিলেন এইকই ধরনের কিছু। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনাথ দাসের মৃত দেহই উঠে আসলো।

এলাকাবাসীর জানায়, অনাথ দাস দীর্ঘদিন ধরে মাছ ব্যবসার সাথে জড়িত । কিন্তু কখনো তিনি মজুমদার বাড়ির সংলগ্ন ব্রীজের পাশ দিয়ে যাওয়া খাল পাড়ের রাস্তা দিয়ে চলাফোর করতেন না। তিনি শাহী বাজার, কড়ৈতলী বাজারে মাছ বিক্রি করতেন।

নিহত অনাথ দাসের ভাই রঘুনাথ দাসের স্ত্রী স্বপ্না দাস জানান, তার ভাসুর গত কয়েকমাস ধরেই তার স্বামী তথা ভাইয়ের সাথে তাদের ঘরের রাতযাপন করতেন। প্রতিদিন মাছ বিক্রির জন্য বের হতেন এবং রাতে ফিরে আসতেন।

গত ১৯ জুলাই সোমবার সকালে তিনি কড়ৈতলীর পাশ্ববর্তী শাহী বাজারে মাছ বিক্রি করতে যান। এর থেকে তার হদিস নেই। তার মুঠো ফোনটিও বন্ধ ছিল। অনাথের দুই পুত্র বিকাশের স্ত্রী শিপ্রা দাস ও নয়নের স্ত্রী সুমী দাস জানান, নিখোঁজের পর থেকে তার শশুড়ের খোঁজে তারা এতদিন বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে খোঁজ খবর নিয়েছেন। তিনি মাঝে মধ্যে তার বোন শেফালীর বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলার পাকদি গ্রামে না বলেই বেড়াতে যেতেন। পরে দুই/তিন দিন পর ফিরে আসতেন। এবারো হয়তবা বোনের বাড়িতে বা অন্য কোথায় বেড়াতে গিয়েছেন। প্রথম কয়দিন এই চিন্তা করেছেন। তছাড়া মোবাই ফোনেরচার্জার ঘরে থাকায় হয়ত মোবাইলে চার্জ নেই। কিন্তু গত রোববার দুপুরে লদ বাড়ির পাশের খালে লাশ পাওয়ার খবরে আমাদের লোকজন ছুটে গিয়ে আমাদের শশুরের লাশ চিহ্নিত করে।

অনাথ দাসের ভাই রঘুনাথ দাসের স্ত্রী স্বপ্না দাস জানান, ১৮ বছর পুর্বে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে কেনা সম্পত্তির জন্য বছরের পর বছর ধরে নানা ঘটনা ঘটেছে। তার ভাশুর অনাথ দাস নিখোঁজ হওয়ার সপ্তাহ পুর্বে এই সম্পত্তি নিয়ে মারামারি হয় সুবল দাসের পরিবারে সাথে। সেই সময় অনাধ দাসকে হুমকি দেয়া হয়।

24 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন