উত্তোলন বন্ধ হোক

ফসলি জমি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ হোক

বিশেষ সম্পাদকীয় :

চাঁদপুর জেলার সর্বত্রই বিশেষ করে হাজীগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নে অবৈধভাবে ফসলি জমি থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। বিষয়টি গত ক’বছর যাবত চলছে। এতে পার্শ্ববর্তী কৃষিজমিগুলো ভেঙ্গে ওই এলাকায় একপ্রকার পুকুর হয়ে যাচ্ছে। এক শ্রেণির অসাধু লোকজন এ ব্যবসা করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছে। আর কৃষক হারাচ্ছে তার প্রিয় অবলম্বন- কৃষি জমি।

যদিও এটা অন্যায়, তবুও চলে যাচ্ছে এসব অবৈধ কাজ-কারবার। এরপর কাজ শেষ হলে প্রশাসনের টনক নড়ে, তারপর হয় জরিমানা। এই জরিমানা করে লাভ কি? যখন জমির সমস্ত বালু চলে যায় অন্যত্র, কাজ শেষ হয়ে যায়, তখন আর জরিমানা করে লাভ কী? বিষয়টা বোধগম্য হচ্ছে না।

চাঁদপুর রিপোর্ট এর এক প্রতিবেদনে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১৫জুলাই) হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোমেনা আক্তার এ বালু ব্যবস্থাপনা আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৫নং সদর ইউনিয়নের মৈশাদী মাঠে রামপুর নৌহাটার মৈশাইদ গ্রামের মো. মুনাব্বর মজুমদারের ছেলে মো.ফরহাদ মজুমদার (২০) এবং একই গ্রামের মৃত জাহাঙ্গীর আলম মজুমদারের মেয়ে মর্জিনা আক্তার (৩১) কে অবৈধভাবে ফসলি জমিতে ড্রেজার বসিয়ে মাটি উত্তোলণের দায়ে ড্রেজার ব্যবসায়ী ২ জনকে ১লক্ষ টাকা জরিমানা ও ড্রেজার জব্দ করা হয়েছে একই সাথে ড্রেজারের পাইপ কেটে নষ্ট করা হয়েছে।

চাঁদপুর রিপোর্ট এর এক প্রতিবেদনে জানা যায়,  হাজীগঞ্জ পৌরসভাধীন কংগ্রাইস-বদরপুর মাঠে মকিমাবাদ গ্রামের হারুনুর রশিদের ছেলে খন্দকার আরিফ অবৈধভাবে ফসলি জমিতে ড্রেজার বসিয়ে মাটি উত্তোলনের দায়ে ড্রেজার ব্যবসায়ীর ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ড্রেজার জব্দ করা হয়েছে একই সাথে ড্রেজারের পাইপ কেটে নষ্ট করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোমেনা আক্তার এ বালু ব্যবস্থাপনা আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এ জরিমানা করেন।

বালুমহাল সংক্রান্ত সরকারি পরিপত্রে বলা হয়েছে যে, কতিপয় ক্ষেত্রে বালু বা মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ৪। বিপণনের উদ্দেশ্যে কোন উন্মুক্ত স্থান, চা বাগানের ছড়া বা নদীর তলদেশ হইতে নিম্নবর্ণিত ক্ষেত্রে বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাইবে না- (ক) পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (১৯৯৫ সনের ১নং আইন) এর অধীন প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে ঘোষিত হইলে;
(খ) সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারেজ, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, বন, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা হইলে, অথবা আবাসিক এলাকা হইতে সর্বনিম্ন ১ (এক) কিলোমিটার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত সীমানার মধ্যে হইলেঃ তবে শর্ত থাকে যে, সরকার, জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় বলিয়া বিবেচিত হইলে, সরকারি গেজেটে প্রকাশিত আদেশ দ্বারা, সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখপূর্বক, এই ধারায় উল্লিখিত কোন বিষয়ে উক্ত শর্ত শিথিল করিতে পারিবে; (গ) বালু বা মাটি উত্তোলন বা বিপণনের উদ্দেশ্যে ড্রেজিংয়ের ফলে কোন নদীর তীর ভাঙ্গনের শিকার হইতে পারে এইরূপ ক্ষেত্রে; (ঘ) ড্রেজিংয়ের ফলে কোন স্থানে স্থাপিত কোন গ্যাস-লাইন, বিদ্যুৎ-লাইন, পয়ঃনিষ্কাশন-লাইন বা অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ লাইন বা তদ্‌সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হইবার আশংকা থাকিলে; (ঙ) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর আওতাধীন উক্ত বোর্ড কর্তৃক চিহ্নিত সেচ, পানি নিষ্কাশন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বা নদী ভাঙ্গন রোধকল্পে নির্মিত অবকাঠামো সংলগ্ন এলাকা হইলে; (চ) চা বাগান, পাহাড় বা টিলার ক্ষতি হইতে পারে, এইরূপ স্থান হইলে;
(ছ) নদীর ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ, মৎস্য, জলজ প্রাণি বা উদ্ভিদ বিনষ্ট হইলে বা হইবার আশংকা থাকিলে; (জ) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, সরকার কর্তৃক, সময় সময়, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত এলাকা হইলে। ভূ-গর্ভস্থ বা নদীর তলদেশ হইতে বালু বা মাটি উত্তোলন সংক্রান্ত বিশেষ বিধান৫। (১) পাম্প বা ড্রেজিং বা অন্য কোন মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাইবে না। (২) নদীর তলদেশ হইতে বালু বা মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে যথাযথ ঢাল সংরক্ষণ সাপেক্ষে, সুইং করিয়া নদীর তলদেশ সুষম স্তরে (River Bed Uniform Level) খনন করা যায় এইরূপ ড্রেজার ব্যবহার করতঃ বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করিতে হইবে। (৩) উপ-ধারা (২) এর অধীন ড্রেজিং কার্যক্রমে বাল্কহেড বা প্রচলিত বলগেট ড্রেজার ব্যবহার করা যাইবে না। একক কর্তৃপক্ষ৬। (১) দেশের যে কোন চর এলাকা অথবা যে কোন স্থলভাগ হইতে বালু বা মাটি সরকার কর্তৃক ইজারা প্রদানের ক্ষেত্রে এবং সরকারি যে কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্দিষ্ট নদী, নদী বন্দর, সমুদ্র বন্দর, খাল-বিল প্রভৃতি স্থান হইতে উত্তোলিত বালু বা মাটির বিপণনের প্রয়োজন দেখা দিলে উক্ত বিপণনের জন্য একক কর্তৃপক্ষ হইবে ভূমি মন্ত্রণালয়।
(২) উপ-ধারা (১) এর অধীন কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয় প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা কর্তৃপক্ষের সহিত সমন্বয় করিবে।
অবাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বালু বা মাটি উত্তোলন৭। অবাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কোন সরকারি কার্যক্রম বা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনে বালু বা মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে এই আইনের বিধানাবলী প্রযোজ্য হইবে নাঃ
তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত কার্যক্রম বা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বালু বা মাটি উত্তোলন ও ব্যবহার করিবার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হইবে।
বালু বা মাটি রপ্তানি সংক্রান্ত বিধান৮। (১) সরকার কর্তৃক সময় সময়, প্রণীত রপ্তানি নীতি আদেশের বিধান অনুসরণ ও কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন গ্রহণক্রমে বাংলাদেশ হইতে বালু বা মাটি বিদেশে রপ্তানি করা যাইবে।
(২) বাংলাদেশ হইতে বালু বা মাটি রপ্তানি সংক্রান্ত বিধান বিধি দ্বারা নির্ধারিত হইবে।
বালুমহাল ঘোষণা ও বিলুপ্তকরণ৯। (১) বালুমহাল চিহ্নিত ও ঘোষণাকরণের ক্ষেত্রে, উপ-ধারা (২) এর বিধান সাপেক্ষে, জেলা প্রশাসককে নিম্নবর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণ করিতে হইবে-
(ক) সংশ্লিষ্ট এলাকার রাজস্ব অফিসার কর্তৃক পরিদর্শন করাইয়া ট্রেসম্যাপ ও তফসিলসহ স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন গ্রহণ করিবেন;
(খ) নৌ-বন্দর সীমার বাহিরে নির্ধারিত নৌ-পথে যেখানে বালু বা মাটি আছে সেই সকল স্থানে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর মাধ্যমে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ করাইয়া স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন গ্রহণ করিবেন;
(গ) দফা (ক) ও (খ) এর অধীন গৃহীত প্রতিবেদনের আলোকে বিভাগীয় কমিশনারের নিকট এতদ্‌সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রেরণ করিবেন।
(২) উপ-ধারা (১) এর দফা (গ) এর অধীন প্রস্তাব প্রেরণের পূর্বে জেলা প্রশাসক পরিবেশ, পাহাড় ধ্বস, ভূমি ধ্বস অথবা নদী বা খালের পানির স্রোতের গতিপথ পরিবর্তন, সরকারি স্থাপনার (যথাঃ ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তাঘাট, ফেরিঘাট, হাটবাজার, চা-বাগান, নদীর বাঁধ, ইত্যাদি) এবং আবাসিক এলাকার কোনো ক্ষতি হইবে কিনা সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতামত গ্রহণ করিবেন।
(৩) কোন বালুমহালে উত্তোলনযোগ্য বালু বা মাটি না থাকিলে, বা বালু বা মাটি উত্তোলন করিবার ফলে পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিনষ্ট বা সরকারি বা বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা জনস্বার্থ বিঘ্নিত হইবার আশংকা থাকিলে, জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনারের নিকট উক্ত বালুমহাল বিলুপ্ত ঘোষণা করিবার প্রস্তাব প্রেরণ করিতে পারিবেন।
(৪) এই ধারার অধীন বালুমহাল চিহ্নিত ও ঘোষণাকরণ কিংবা বিলুপ্তি ঘোষণা সম্পর্কিত জেলা প্রশাসক কর্তৃক প্রেরিত প্রস্তাব বিভাগীয় কমিশনার পরীক্ষা-নিরীক্ষাপূর্বক বা, ক্ষেত্রমত, সরেজমিনে পরিদর্শনপূর্বক, অনুমোদন করিতে পারিবেন, বা সুস্পষ্ট নির্দেশনাসহ পুনঃপ্রস্তাব প্রেরণের নিমিত্ত ফেরত প্রদান করিবেন।
(৫) উপ-ধারা (৪) এর অধীন বিভাগীয় কমিশনারের অনুমোদন লাভ করিলে জেলা প্রশাসক নির্ধারিত পদ্ধতিতে বালুমহাল ঘোষণা বা, ক্ষেত্রমত, বিলুপ্তিক্রমে উহা সর্বসাধারণের অবগতির জন্য প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করিবেন।
(৬) এই ধারার অধীন কোন বালুমহাল ঘোষণা বা বিলুপ্ত করা হইলে জেলা প্রশাসক অবিলম্বে কর্তৃপক্ষকে উহা অবহিত করিবেন।
(৭) এই ধারার অধীন বালুমহাল ঘোষণা বা বিলুপ্তির আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সরকারের নিকট আপত্তি উপস্থাপনপূর্বক দরখাস্ত দাখিল করিতে পারিবেন এবং এই ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গণ্য হইবে।
(৮) এই আইন বলবৎ হইবার পূর্বে জেলা প্রশাসক কর্তৃক ঘোষিত বালুমহাল এইরূপে বহাল থাকিবে যেন উহা এই আইনের অধীন চিহ্নিত, ঘোষিত ও প্রকাশিত হইয়াছে।

আমাদের বক্তব্য, যেহেতু বাংলাদেশ সরকারের গেজেটে বলা হয়েছে যে,  পাম্প বা ড্রেজিং বা অন্য কোন মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাইবে না, সুতরাং মানুষের কৃষি জমি বিনষ্ট করে এ বালু উত্তোলন বন্ধ হোক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন