চিকিৎসক থেকে আন্তর্জাতিক প্রতারক এই নারী

নিউজ ডেস্ক :

চিকিৎসক ইশরাত রফিক ঈশিতা ফিলিপাইনের একটি ওয়েবসাইট থেকে ৪০০ ডলারে সামরিক বাহিনীর মতো ‘বিগ্রেডিয়ার জেনারেল’ র‌্যাঙ্ক পদটি কিনেছিলেন। এরপর সেই র‌্যাঙ্ক ব্যাচ ও পোশাক বানিয়েছিলেন। তার সহযোগী শহিদুল ইসলাম দিদারও ফিলিপাইনের প্রতিষ্ঠানটি থেকে ‘মেজর জেনারেল র‌্যাঙ্ক’ পদ কিনেছিলেন। এলিট ফোর্স র‌্যাব তাকে গ্রেপ্তারের পর এ ধরনের নানা ভয়ংকর তথ্য জানতে পেরেছে।

র‌্যাব জানায়, তিনি ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন, কাউন্টার ক্রাইম ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশনের সদস্য পদের ভুয়া সনদ তৈরি করে প্রচারণা চালিয়ে থাকেন। ভুয়া ডিগ্রি, পদ-পদবি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আইপি চ্যানেলে নিজের প্রচার-প্রচারণা চালাতেন। তাছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে টকশোতে অংশগ্রহণ করতেন। বিশেষ করে ভুয়া সার্টিফিকেট, এডিটিং ছবি, মিথ্যা বিবৃতি ও তথ্য প্রদানের মাধ্যমে সবাইকে বিভ্রান্ত করতেন। এছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারী শিশু অধিকার, চিকিৎসা বিজ্ঞান, করোনা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচক হিসেবে নিজের প্রচার চালাচ্ছিলেন।

শনিবার ভোরে রাজধানীর মিরপুরে দেশি-বিদেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ভুয়া প্রতিনিধি পরিচয় দেওয়া প্রতারক ইশরাত রফিক ঈশিতা ও তার সহযোগী শহিদুল ইসলাম দিদারকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

বিকালে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, গোয়েন্দা অনুসন্ধানে ভিন্নধর্মী এই প্রতারণার সম্পর্কে তথ্য পেয়ে তাকে ধরতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে উদ্ধার করা হয়- ভুয়া আইডি কার্ড, ডুয়া ভিজিটিং কার্ড, সিল, ভুয়া সার্টিফিকেট, প্রত্যয়নপত্র, পাসপোর্ট, ল্যাপটপ, ৩০০ পিস ইয়াবা, পাঁচ বোতল বিদেশি মদ। মঈন বলেন, ইশরাত পেশায় একজন চিকিৎসক। তিনি ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে ২০১৩ সালে (সেশন ২০০৫-২০০৬) এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। এরপর ২০১৪ সালের শুরুর দিকে মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেন। ওই বছরই একটি সরকারি সংস্থায় চুক্তিভিত্তিক চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পান। চার মাস চাকরির পর শৃঙ্খলাজনিত কারণে চাকরিচ্যুত হন। এরপর থেকে তিনি প্রতারণা শুরু করেন। চিকিৎসাশাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও গবেষক হিসেবে পরিচয় দিতেন। যেমন- এমপিএইচ, এমডি, ডিও ইত্যাদি। তাছাড়া ক্যানসার বিশেষজ্ঞ হিসেবেও নিজেকে প্রচার চালাতেন।

র‌্যাব মুখপাত্র বলেন, ‘করোনা মহামারিকে পুঁজি করে ভার্চুয়াল জগতে প্রতারণায় সক্রিয় ছিলেন ইশরাত। অনলাইনে করোনা প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন ও সার্টিফিকেট দিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালাতেন। বিদেশি ভুয়া সার্টিফিকেট প্রচারণা করে অর্থের বিনিময়ে সার্টিফিকেট গ্রহণে আকৃষ্ট করতেন। গ্রেপ্তার ইশরাত ‘Young World Leaders for Humanity’ নামে একটি অনিবন্ধনকৃত ও অননুমোদিত সংগঠন পরিচালনা করছিলেন। যার সদরদপ্তর নিউইয়র্কে অবস্থিত বলে প্রচারণা চালাতেন। যদিও এই পেজের কো-এডমিন ছিলেন ইশরাত। এই পেজের মাধ্যমে দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতারণা নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন। নেপাল, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ভারত, আমেরিকা, নাইজেরিয়া, ওমান, সৌদি আরব এসব দেশে অর্থের বিনিময়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করেন। এসব দেশে সংগঠনের ব্যানারে সেমিনার অ্যাওয়ার্ড প্রদান ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন।’

‘যেখানে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যক্তিদের অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। ভুয়া অ্যাওয়ার্ডের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ইশরাত ও তার প্রধান সহযোগী দিদার ভাগ করে নিতেন। ২০১৯ সালে রাজধানীর একটি অডিটোরিয়ামে ৩০ জন ‘Young World Leaders for Humanity’ কে সম্মাননা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে ইশরাত সঞ্চালক ছিলেন। অনুষ্ঠানটি গ্রহণযোগ্য করতে বিভিন্ন ব্যক্তিদের ব্যক্তিদের ছবি যুক্ত করে অ্যাডভাইজর, ভাইস চেয়ারম্যান, ইন্টারন্যাশনাল ভাইস চেয়ারম্যানসহ নানা পদে দায়িত্ব পালন করত বলে প্রচারণা চালাতেন।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব মুখপাত্র বলেন, ‘৬০ জনকে নিয়ে তিনি করোনার সেমিনার করেছেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন বিদেশি বিভিন্ন ডক্টর সার্টিফিকেট প্রদান করছেন। সেখানে সবার কাছ থেকে তারা চার হাজার টাকা করে নিয়েছিলেন সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য। যে সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণটাই ভুয়া ছিল। এছাড়া ইয়াংদেরকে নিয়ে তিনি একটি প্রোগ্রাম করেছিলেন। সেখানে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এই সার্টিফিকেট প্রদান প্রোগ্রামের রেজিস্ট্রেশন বাবদ তাদের কাছ থেকে তিন হাজার টাকা করে নিয়েছিল।’

অপর প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব মুখপাত্র বলেন, ‘নিজের প্রচারণার জন্য ইশরাত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন টকশোতে গেছেন। আইপিসির সদস্যপদ নেওয়ার জন্য তিনি অনেকগুলো ভুয়া সার্টিফিকেট জোগাড় করেন। তবে ফিলিপিনের আইপিসি অর্গানাইজেশনের আমরা কোনো ভিত্তি খুঁজে পাইনি। যেখান থেকে তিনি ৪০০ ডলার খরচ করে সার্টিফিকেট কিনেছিলেন।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক তিনি নিজে বানিয়েছেন জানিয়ে মঈন বলেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেলের কেনার ছয় মাস পর তিনি কর্নেল হয়েছেন। তার ছয় মাস পরে হয়েছেন ব্রিগেডিয়ার হন। কীভাবে হয়েছেন তার কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। বিভিন্ন সার্টিফিকেট দেখে তারা এডিট করে সার্টিফিকেট বানিয়েছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই ভুয়া সার্টিফিকেট দেখিয়ে আস্থা অর্জন করতো।

কে এই দিদার

ইশরাতের ‘বস’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া তার সহযোগী শহিদুল ইসলাম দিদার ২০১২ সালে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা (ইঞ্জিনিয়ার) শেষ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিপ্লোমা করেছেন। তিনি একটি গার্মেন্টেসে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। দিদারও ফিলিপাইনে একই সাইট থেকে টাকার বিনিময়ে ‘মেজর জেনারেল’ পদ কেনেন।

এছাড়া নিজেকে আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক), ইয়াং ওয়ার্ল্ড লিডার কর হিউমিনিটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা বা কর্ণধার হিসেবে পরিচয় দিতেন। একইভাবে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার দূত বা অ্যাম্বাসেডর পরিচয় দিতেন। এভাবে দেশে ও বিদেশে প্রতারণা, চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিপুল অর্থ কামিয়েছেন। (ঢাকা টাইমস)

27 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন