থাকা সেই মেয়েটি

দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটি

এম ইব্রাহীম মিজি

মেডিকেলের সামনে দাঁড়ানো, হাতে ধবধবে সাদা এপ্রোন। তোতন ভাবলো মেডিকেলের স্টুডেন্ট, রিক্সা কিংবা বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে গেল! হয়তো একহারা শ্যামলা গড়ন আর মেডিকেলের স্টুডেন্ট এ দুটো বিষয়ই একসাথে তোতনকে মুগ্ধ করেছে। একবার ভাবলো রিক্সা থেকে নেমে পড়বে কিনা। পারলো না, সাথে মা যে! মনে মনে স্থির করলো কালকেই এসে খোঁজ নিবে। মেয়েটিকে দেখার পর থেকেই তোতনের চোখে-মুখে শুধু একটি ছবিই ভাসছে, ভাবনাতেও সে।

রাত গভীর হয়, তোতনের ভাবনার মিটার ঊর্ধ্বগামী। মেয়েটির সাথে কালকে দেখা হবে তো? ও কি ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে? এ রকম আরও কত কী! পরদিন বিকেলবেলা বাইক নিয়ে ছুটে চলে। অধির আগ্রহে কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যান্য মানুষের ভীড়ে মেয়েটিকে খুঁজতে থাকে। কিন্তু দেখা পায় না। হয়তো ক্লাস শেষ হয়নি, চলে অপেক্ষা। দশ মিনিট, বিশ মিনিট এভাবে প্রায় দেড় ঘণ্টা তবুও দেখা মিলে না। তোতনের অস্থিরতা বেড়ে যায়। দেখতে দেখতে গোধূলিও শেষ হয়ে এলো কিন্তু মেয়েটির দেখা মিললো না। এক বুক কষ্ট নিয়ে বাসায় ফিরে তোতন। অন্যদিন এত তাড়াতাড়ি ফিরে না।

মা জিজ্ঞেস করল, কিরে তোতন, শরীর খারাপ? না, ঠিক আছে তোতন জবাব দেয়। নিজের রুমে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে। ছাদে যায়, সেখানেও ভালো লাগে না। আদরের ময়নাটা তোতনকে দেখে শিস দেয় তবুও মন ভরে না। তোতনের চোখেমুখে নেই সেই খুঁনসুটি, যা গতকালও পাখিটিকে অস্থির করে তুলছিল। দোলনায় দোল খেতেও ভালো লাগে না, ফিরে যায় রুমে। কিছুক্ষণ মোটর রেস খেলে, না হচ্ছে না। এরপর দাবা, তবুও না! কিছুতেই আজ মন লাগছে না! মন যে সেই মেয়েটির রূপের পিঞ্জরে বন্দি!

দেখাইলা কী রূপের ঝলক!
পড়ে না তো ভাবের পলক।

ভাবতে ভাবতে রাত শেষ হয়ে যায়, ঘুম আসে না। পরদিন বিকেলবেলা আবার ছুটে চলে, আজকে আরও ঘণ্টা খানেক আগে থেকেই অপেক্ষা করতে থাকে, তবুও দেখা মিলে না। ইদানিং তোতনের একটি রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিদিন বিকেল বেলা মেডিকেলের সামনে গিয়ে মেয়েটির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা। এভাবে তিন মাস কেটে যায়, শরীরের সমস্ত রক্তকণিকার পরিবর্তন হয় তোতনের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল, কিন্তু মন মানে না। সেদিনের এক মুহূর্তের স্মৃতি আজও হৃদয় থেকে এতটুকু মলিন হয়নি। তিন মাস পর তোতন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে, হাসপাতালে ভর্তি হয়।

ডাক্তার নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে নিশ্চিত হয় ডেঙ্গু। ডাক্তার ওষুধ দেয় কিন্তু কাজ হয় না। অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। একদিন দুদিন তিনদিন পর হঠাৎ এক ভরদুপুরে সেই মেয়েটিকে তোতন শয্যাপাশে স্ট্রোথোসকোপ হাতে দাঁড়ানো অবস্থায় আবিষ্কার করে। এতো সেই মেয়েটিই! ম্যাডাম আপনি? তিনমাস পূর্বে এক বিকেলবেলা মেডিকেল কলেজের গেটে দাঁড়ানো ছিলেন না? হবে হয়তো, কেন? না তারপর আর দেখা নেই তো, তাই!

মেয়েটি আর কিছু না বলে তোতনকে চেক আপ করে চলে যায়। আবার অপেক্ষার পালা, মেয়েটির কোন দেখা নেই। পনের দিন পার হয়ে গেল, তবুও দেখা নেই। কর্তৃপক্ষ তোতনকে রিলিজ করে দেয়, তোতনের রিলিজ হতে মন চায় না। কিন্তু না হয়ে কোন উপায় নেই। এর দুই মাস পর তোতন এক বন্ধুর বড় ভাইয়ের বিয়েতে যায়। ওয়াশ রুমে হাত ধূতে গিয়ে মেয়েটির দেখা পায়, অপরূপ রূপের মাধুরী মিশিয়ে পাশের বেসিনেই হাত ধূচ্ছে। তোতন তড়িঘড়ি করে জিজ্ঞেস করলো ম্যাডাম আপনি? মেয়েটি রহস্যের হাসি হাসে। কেন? আমি কি বিয়ের দাওয়াত খেতে আসতে পারি না? তোতন বলে না তা বলিনি।

দুই মাস আগে হঠাৎ এক ভরদুপুরে হাসপাতালে চেক আপ করেই আপনি ঊধাও। এরপর হঠাৎ এখানে পেয়ে গেলাম তো, তাই! মেয়েটি আবারও রহস্যের হাসি হাসে। তোতন হাত ধূতে ধূতে মেয়েটি বের হয়ে মুহূর্তেই কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। সারা কমিউনিটি সেন্টার তন্য তন্য করে খুঁজেও পেল না। তোতন আবার ভাবতে থাকে। কিন্তু কোন কূল কিনারা করতে পারে না।

পরদিন ছুটে যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালের আরএসকে মেয়েটির বর্ণনা দেয়। ডাক্তার বলেন আমি নতুন এসেছি এখানে, এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না, দুঃখিত। হাসপাতালের ডিউটি রেজিস্টার তন্য তন্য করে খুঁজেও সেই দিন ও এর আগে-পরের আরও তিন দিন দুপুরের ডিউটি তালিকায় কোন মেয়ে ডাক্তারের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না।

পরদিন বিকেল বেলা মেডিকেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় তোতন। হঠাৎ দূর থেকে কলেজ ভবনের গেটের দিকে চোখ পড়ে তোতনের, মেয়েটিকে ঢুকতে দেখে তোতন, হন্তদন্ত হয়ে ছুটে চলে গেটের দিকে। কিন্তু একি! কলেজের প্রধান গেট খোলা থাকলেও লম্বা করিডোরের কোথাওতো কারও পায়ের আওয়াজটি পর্যন্ত নেই। তোতন চিৎকার করে জিজ্ঞেস করে, কেউ আছেন? নিজের চিৎকারের প”তিধ্বনি শুনতে পায়।

হঠাৎ তোতনের চোখ পড়ে তৃতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্রীর ছবিসংবলিত একটি শোক সংবাদে! এতো সেই মেয়েটি! যার জন্য তোতনের এত ভাবনা! যাকে প্রথম দেখেছিল প্রায় সাত মাস আগে এই কলেজেরই গেটে অ্যাপ্রোন হাতে দাঁড়ানো অবস্থায়। তোতন জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

89 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন