রিপোর্ট ফয়েজ মেম্বার

মতলব উত্তর থানার ওসি’র অনুপেরণায় মাদক ছেড়ে আলোর পথে ফয়েজ মেম্বার

মতলব উত্তর প্রতিনিধি :
দিনে আত্মগোপন, রাতে পুলিশের ভয়ে নির্ঘুম কাটানো। সেই সঙ্গে মরণঘাতী মাদকের ভয়াবহ ছোবল। প্রতিটি মুহূর্ত যেন ভয় আর উৎকণ্ঠায় কাটছিল। এর মধ্যেও মাসে মাসে মামলার ঘানি টানতে আদালতে কাঠগড়ায়। কখনোবা স্বজনদের ছেড়ে জেলখানার চার দেয়ালে বন্দি।

সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছিল অভিশপ্ত জীবন। ভেবেছিলাম আর বোধ হয় বাঁচা হবে না। কিন্তু না, খুঁজে পেয়েছি আলোর দেখা। মা-ভাই এবং স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বেশ ভালোই কাটছে জীবন সংসার। দেখছি সৎ পথে বড় হওয়ার স্বপ্ন। মানুষের কাছ থেকে পাচ্ছি আত্মসম্মানও।

অনেকটা আবেগ জড়ানো কণ্ঠে কথাগুলো বলেছেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ফয়েজ আহমেদ। তিনি পুশ্চিম পুটিয়ারপাড় গ্রামের হাজী আবদুর রব এর ছেলে। তিনি মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শাহজাহান কামালের আহŸানে সাড়া দিয়ে মাদকের অন্ধকার জগৎ ছেড়ে আলোর পথে ফিরেছেন।

একান্ত আলাপে মাদক ব্যবসা ছেড়ে সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা ফয়েজ আহমেদ বলেন, বেকারত্ব জীবন নিয়ে কয়েকটি বছর কেটে যায়। সংসারে জোয়াল কাঁধে নিয়ে সংসারের খরচ চালাতে দেখা দেয় চরম অর্থসংকট। কোনো কাজ না পেয়ে অর্থের জোগান দিতেই বেছে নিয়েছিলাম অন্ধকার মাদকের জগৎ। প্রথমে মাদক সেবন করেছি। এর পর মাদক ব্যবসায়ীদের প্রেরণায় সরাসরি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ি।

আমার মূল ব্যবসা ছিল ইয়াবা। যা পেতাম ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকেই। প্রথম প্রথম এগুলো বিক্রি করে বেশ ভালই আয় রোজগার হতে লাগলো। এক পর্যায়ে পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী হয়ে গেলাম। টাকার দেখা মিললেও অসৎ পথে এ আয়ে সংসারে শান্তি এলো না। বরং অশান্তি যেন চিরসঙ্গী হয়ে গেল। মাদকসহ ধরা পড়ে হয়ে গেলাম তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ী। পর পর হওয়া দুটি মাদক মামলায় আদালতে হাজিরা এবং মামলা চালাতে গিয়ে যা উপার্জন করেছিলাম এর সবটুকুুই ফুরিয়ে গেছে। এর উপর পুলিশের অভিযানের ভয়ে কত রাত যে নির্ঘুম কেটেছে তা গুনে বলা যাবে না। দিনের আলোয় ভয় কম থাকলেও সমাজে মিশতে পারতাম না। ঘৃণা আর আড়চোখে দেখত সবাই। মা, ছোট ভাই-বোন এবং স্ত্রী-কারোর কাছে মুখ দেখাতে পারতাম না। কেউ মিশতো না আমাদের সঙ্গে। আমার সংসার জীবনে ২ ছেলে ও ২ মেয়ে রয়েছে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ভেবেছিলাম এ অপরাধের জগৎ ছেড়ে ভালো হয়ে যাব। কিন্তু সেই সুযোগ পাচ্ছিলাম না।

তিনি বলেন, মাদকের কারণে সংসারে সীমাহীন অশান্তি ছিল। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মারপিট, কলহ লেগেই ছিল। প্রতি রাতে পুলিশ এসে দরজার কড়া নাড়ত।

পরে ওসি মুহাম্মদ শাহজাহান কামাল স্যারের ডাকে সাড়া দিয়ে মাদক ব্যবসা ছেড়ে আত্মসমর্পণ করেছি। তিন মাস ধরে প্রতি সপ্তাহে একবার থানায় হাজিরা দিয়ে যাচ্ছি। সব থেকে বড় কথা হল পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এখন আর আমাদের খোঁজ করছে না। হয়রানি করছে না। বরং একজন দারোগা (এসআই) সবসময় আমাদের খোঁজ-খবর রাখছেন। দুঃখ-কষ্ট থাকলে তা সমাধানের চেষ্টা করছেন। তাই আমরা এখন ভালো আছি।

তার স্ত্রী রিমা আক্তার জানান, আমার স্বামী পুলিশের সহায়তায় মাদক ব্যবসা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। আমাদের দাম্পত্যজীবন সুখের হয়, এ প্রত্যাশা করছি।

মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ শাহজাহান কামাল বলেন, পুলিশের কাজ হলো আইন প্রয়োগ করা। কিন্তু আইন প্রয়োগেই সব সমস্যার সমাধান নয়। একজন মাদক সেবনকারীর বিরুদ্ধে যখন মামলা হচ্ছে তখন ওই মামলা চালাতে গিয়ে তাকে আরও অপরাধ করতে হচ্ছে। মামলার খরচ বহন করতে গিয়ে সে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়। এতে দেখা যায় একজন মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় সে আর ভালো হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এ কারণেই মাদক ব্যবসায়ী এবং সেবনকারীদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ফয়েজ আহমেদ মাদক ছেড়ে আলোর পথে এসেছে তাকে পুলিশ বা কোনো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এখন আর বিরক্ত করছে না। তিনি শান্তিতে বসবাস করছে। আমরা চাই না কারোর বিরুদ্ধে মামলা হোক, আর সেই মামলা চালাতে গিয়ে বড় ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ুক।

39 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন