হারানো প্রিয়ার ভালোবাসা

এম ইব্রাহীম মিজি :

আমার অফিস শুরু হবে সকাল নয়টায়, তাই সকাল বেলা নাস্তা খেয়ে বের হওয়ার জন্য শীতকাল ব্যতিত অন্য ঋতুতে যথেষ্ট সময় পাওয়া যায় কিন্তু গরম কালেও অফিসে যাওয়ার অজুহাতে সজল তাড়াহুড়ো করে শুধু এক কাপ চা পান করে সকাল সকাল বের হয়ে পড়ে। মা ছেলের পরিবর্তন লক্ষ্য করে, আবার ভাবে সদ্য লেখাপড়া শেষ করে চাকরিতে যোগদান করেছে তাই হয়তো সকাল সকাল বের হয়, তাছাড়া রাস্তাঘাটেও জ্যামের কারণে সময় নষ্ট হতে পারে তাই একটু আগে ভাগে যাওয়াটাই ভালো। কিন্তু সজল রাস্তায় বের হয়ে চটজলদি রিক্সা নিয়ে অফিসে যাওয়ার পথে ভাবতে থাকে কখন ওর সাথে দেখা হবে।

ওর সাথে দেখা হবে কিনা তারও কোন নিশ্চয়তা নেই, মেয়েটিতো ওকে চিনেই না! কিন্তু সজলের হৃদয়ে প্রেমের দমকা হাওয়া। মেয়েটি দেখতে পরীর মত না হলেও প্রথম দেখাতেই ওর প্রেমে পড়বে না এমন যুবক খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল হবে। বাহারি রঙের ড্রেস আর তার উপর সাদা এ্যাপ্রোণ পরে যখন মেডিকেল কলেজের দিকে রিক্সাযোগে আসতে থাকে সজল তখন রিক্সায় করে বিপরীত দিকে অফিসে যেতে থাকে। প্রথম যেদিন ওর সাথে দেখা হয়। ওর পরনে ছিল লাল-সবুজ ড্রেস আর তার উপর ধবধবে সাদা এ্যাপ্রোণ। ওরা দুজন একসাথে রিক্সাযোগে আসতে থাকে।

মনে হয় দু’বোন, বান্ধবীও হতে পারে। দুজনের মাঝে ও একটু লম্বা কম হলেও দেখতে ওই বেশ মানানসই স্মার্ট! আর ওকে দেখার জন্যই সজল প্রতিদিন সকাল সকাল বের হয়ে পড়ে শুধুমাত্র এক কাপ চা পান করে। যদি কোন দিন ওর দেখা না পায় মনে হয় যেন কত দিন কতকাল ওর সাথে দেখা হয়নি। সরকারি ছুটির দিনগুলিও সজলের কাছে অসহ্য লাগে। মনে মনে ভাবে কেন যে সপ্তাহে দুদিন ছুটি! একদিনই যথেষ্ট ছিল! আর বিশেষ বিশেষ ছুটির দিনে মনে হয়, ইস! ছুটিটা যদি না থাকতো তাহলেই ভালোই হতো। ওর সাথে দু-একদিন চোখাচোখিও হয়েছে। মেয়েটি ওকে খেয়াল করেছে কিনা তা বলার জো নেই, তবুও ওর ধারণা ও হয়তো ওকে দেখেছে।

রাস্তাঘাটেতো কত জনার সাথেই এমন দেখা হয়, তাতে কী! চাকরির এক বছরের মাথায় সজল বদলির আদেশ পায়। একবার ভেবেছিল চাকরিটাই ছেড়ে দিবে! আবার ভেবেছে ছেড়ে দিয়ে কী লাভ? ও হয়তো কলেজের অন্য কোন ছেলেকে ভালোবাসে, এ যুগের মেয়েরা একা একা বসে থাকে না, কোন না কোন ভাবে কাউকে না কাউকে মন দিয়েই থাকে। ভাব দেখায় এমন যেন সে ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না! নানান কথা ভেবে অবশেষে সজল নতুন কর্মস্থলে যোগদান করে। দেখতে দেখতে তিন বছর কেটে যায়, মেয়েটিও এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের প্রথম বছরের মাথায় বিসিএস ক্যাডার হয়ে যোগদান করে জেলা শহরের হাসপাতালে।

ইতিমধ্যে সজলের জীবন থেকে তিনটি বসস্ত কেটে গেলেও মেয়েটির কথা একটুও ভুলতে পারে নি। যখনই অবসর পেয়েছে তখনই, এমনকি প্রচÐ কাজের ভীড়েও ওকে নিয়ে ভেবেছে। মাঝে মাঝে ওর কাছে ছুটে যেতে চেয়েছে মন কিন্তু বিবেকের অশরীয় বাধায়’ যেতে পারেনি, কারণ এটি নিছক ছেলেমানুষি ছাড়া কিছু হবে না। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে মোটর সাইকেলযোগে অফিসের কাজে জেলা শহরে যাচ্ছিলো সজল। হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে একটি ট্রাক এসে সজোরে আঘাত করে। যখন জ্ঞান ফিরে নিজেকে দেখতে পায় হাসপাতালের বেডে। চোখ খুলেই সেই মেয়েটিকে সামনে দেখতে পেয়ে অ্যাকসিডেন্টে পাওয়া সমস্ত ব্যথা যেন মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে যায়।

হঠাৎ ওকে দেখে আর আবেগ ধরে রাখতে পারে না সজল। তুমি? পরক্ষণেই বলে উঠে সরি, আপনি এখানে? মেয়েটিরও ওকে চিনতে খুব বেশি সময় নিতে হয়নি। আমি এখানে যোগদান করেছি তিন মাস হল। অ্যাকসিডেন্ট করে আপনি এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ওর সব মনে পড়ে যায়, বলল- হ্যাঁ, হ্যাঁ। ব্যাস এটুকুই, এরপর শুধু ওর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা। শুরু হয়ে যায় ভাবনা, রঙিন সুতায় স্বপ্নের জাল বুনা। ওর তাকানো এবং চুপ মেরে যাওয়া দেখে মেয়েটি সব বুঝে ফেলে। এরপর দুদিন আর ওর দেখা নেই, অন্য ডাক্তাররা এসেছে, কিন্তু ও আর ফিরে আসেনি।
ওর কাছে এই দুদিন মনে হচ্ছিল যেন দুই যুগ। হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে ওকে নিয়ে মনে মনে কত স্বপ্ন যে এঁকেছে সজল তার কোন ইয়ত্তা নেই। তৃতীয় দিন ও এসেছে একগুচ্ছ সাদা রজনীগন্ধা হাতে করে, তা দেখে ওর আর আনন্দের সীমা রইল না। কিন্তু’ পরক্ষণেই সব আনন্দ মাটি হয়ে গেল যখন মেয়েটির পিছনে আরও একজনকে দেখতে পেল একগুচ্ছ গোলাপ হাতে। কোন কোন আগমণ, কোন কোন শুভেচ্ছাও হৃদয়কে ভেঙে চুরমার করে দেয়। গোলাপগুচ্ছ হাতে দাঁড়ানো ছেলেটিকে যখন পরিচয় করিয়ে দিল ওর বাগদত্ত হিসাবে নিঃশ্বাসটা যেন বন্ধ হয়ে এলো। সজল তখন আর কিছু ভাবতে পারছে না। হারানো প্রিয়ার ভালোবাসাকে কাছে পেয়েও চিরতরে হারালো….

154 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন