এহসান গ্রুপ

টাকা রাখলে ‘হাশরের ময়দানে সুপারিশে’র আশ্বাস দেয় এহসান!

নিউজ ডেস্ক :

যশোর শহরের পুরাতন কসবা মিশনপাড়া এলাকার বাসিন্দা আফসার উদ্দিন। এখন তার বয়স ৬৫ বছর। ২০১১ সালে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে এহসান গ্রুপে সাড়ে ১২ লাখ টাকা আমানত রেখেছিলেন তিনি। লাভের আশায় টাকা রেখে এখন প্রায় নিঃস্ব আফসার উদ্দিন। ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত আফসার উদ্দিন এখন বসবাস করেন ভাঙাচোরা একটি টিনের বাড়িতে। ডায়াবেটিস ও পায়ের গ্যাংগ্রিনসহ নানা রোগে ভুগছেন তিনি। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। দীর্ঘ ২৫ বছরের চাকরিজীবনের সব পুঁজি হারিয়ে অনেকটাই নির্জীব তিনি।

সম্প্রতি এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান রাগীব আহসানসহ সংশ্লিষ্টরা গ্রেফতার হওয়ায় টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে আরও বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আফসার উদ্দিন।

বিমান বাহিনীর সাবেক ক্লার্ক আফসার উদ্দিন জানান, যশোরে বিমান বাহিনীর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ঘাঁটিতে ক্লার্ক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। ২০১১ সালে অবসরে যান।

আরো পড়ুন : শ্বেতির সাদা দাগ দূর করার সহজ কিছু উপায়

একদিন শহরের বেজপাড়া জামে মসজিদের খাদেম আফসার উদ্দিনের কাছে জানতে চান- ‘চাকরির অবসরের টাকা কী করেছেন? কোনো ব্যাংকে না রেখে এহসানে রাখেন। এহসানে টাকা দিলে তা সুদ হবে না। শরিয়ত অনুযায়ী ব্যবসায়ের লভ্যাংশ পাবেন। মৃত্যুর পর জানাজা পড়াবেন তারা। হাশরের ময়দানে সুপারিশও করবেন আল্লাহর দরবারে।’

এসব কথায় সন্তুষ্ট হয়ে ওই বছরের ডিসেম্বরে এহসান সোসাইটিতে সাড়ে ১২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন আফসার উদ্দিন। আড়াই বছরের মতো প্রতি মাসে নির্ধারিত মুনাফা পান। তবে ২০১৪ সালের শেষ দিক থেকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয় এহসান। আফসার উদ্দিন তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি। সেই থেকে আর কোনো টাকা-পয়সা পাননি। টাকার টেনশনে শরীরে জেঁকে বসে নানা রোগ।

আরো পড়ুন : জেনে নিন যৌন রোগের লক্ষণ ও প্রতিকার

হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, একটি ভুলে আজ আমি প্রায় নিঃস্ব। একটা বাড়ি করতে চেয়েছিলাম, সেটা আর করা হলো না এহসানের প্রতারকদের জন্য।

শুধু আফসার উদ্দিন নন, তার মতো এহসান গ্রুপে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা আমানত রেখে নিঃস্ব হয়েছেন যশোরের প্রায় ১৬ হাজার মানুষ। প্রতারণার ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে অনেকে হয়েছেন শয্যাশায়ী। এর মধ্যে ৫৬ জনের মতো বিনিয়োগকারী মারা গেছেন বলে দাবি ক্ষতিগ্রস্তদের।

স্থানীয়রা বলছেন, এহসান গ্রুপের শিকার থেকে বাদ পড়েননি কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ। সবার থেকে টাকা নিয়েছে তারা। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা, সহকারী শিক্ষক, বেসরকারি চাকরিজীবী, প্রবাসী ও শ্রমজীবী- সবাই শিকার বনেছেন এহসানের। পরকালে মুক্তির দোহাই দিয়ে সুদবিহীন উচ্চ মুনাফার কথা বলে হাজার হাজার মানুষকে নিঃস্ব করেছে গ্রুপটি। আত্মসাৎ করেছে কেবল যশোরের মানুষদেরই ৩২২ কোটি টাকা।

আরো পড়ুন : ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

১৬ হাজার গ্রাহকের একজন যশোর শহরের বেজপাড়া চোপদারপাড়া এলাকার কাজী মফিজুল হক (৭৮)। তিনি পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

মফিজুল হক বলেন, অবসর গ্রহণের পর হজ করি। হজ শেষে দেশে ফেরার পর শহরের দড়াটানা জামে মসজিদে নামাজ আদায় করতে যাই। সেখানকার ইমাম-মুয়াজ্জিন আমাকে জানান- ‘ব্যাংকে টাকা রাখা হারাম। পরকালে জবাবদিহি করা লাগবে। তারা আমাকে বোঝাতে সক্ষম হন এহসান গ্রুপে টাকা রাখলে হালাল হবে। এ ছাড়া ব্যাংকের চেয়ে বেশি লভ্যাংশ পাওয়া যাবে। তাই অবসরকালীন যে টাকা পাই সেখান থেকে চার দফায় ৪০ লাখ টাকা তাদেরকে দিই। লাখে ১৫০০ টাকা করে মুনাফা পাই ৪-৫ মাস। এরপর বন্ধ হয়ে যায় মুনাফা প্রদান।

আরো পড়ুন : মেহ প্রমেহ ও প্রস্রাবে ক্ষয় রোগের কার্যকরী সমাধানসমূহ

যশোর শহরের পুরাতন কসবা বিমান বন্দর রোড এলাকার ব্যবসায়ী শামসুর রহমান (৫২) জমি বিক্রির ১৫ লাখ টাকা এহসানে রাখেন। তিনি বলেন, ‘জমি বিক্রির টাকা প্রথমে সোনালি ব্যাংকে রেখেছিলাম। ইসলামের নানা ব্যাখ্যা দিয়ে বিমান বন্দর রোডের কুন্দিয়ান জামে মসজিদের ইমাম ওমর ফারুকের প্ররোচনায় ব্যাংক থেকে টাকা তুলে এহসানে রাখি। প্রথমে ১০ লাখ এবং পরে আরও পাঁচ লাখ টাকা রাখি। আমাকে বলা হয়, লাখে প্রতি মাসে ১২০০ টাকা মুনাফা দেওয়া হবে। ৮-৯ মাস নিয়মিত মুনাফা পেয়েছি। এরপর আর পাইনি।’

২০১৪ সালের শেষ দিকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের টাকা আদায়ে গঠিত হয় ‘যশোর এহসান ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক সংগ্রাম কমিটি’। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক মফিজুল ইসলাম ইমন।

ইমন জানান, এহসান গ্রুপের তিন থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে এহসান সোসাইটি, এহসান রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড, এহসান ইসলামি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি, আল এহসান প্রভৃতি। যশোর ছাড়াও দেশের ৩৯টি জেলায় তাদের ১৮২টি শাখার মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে এভাবে টাকা গ্রহণ করেছে তারা।

আরো পড়ুন : গেজ, অশ্ব,পাইলসের সহজ চিকিৎসা

তিনি বলেন, মানুষের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ইসলামি আদর্শের সঙ্গে বেঈমানি করে ৩২২ কোটি ১২ লাখ ৭৫০ টাকা পকেটে নিয়ে অধিকাংশ প্রতারক প্রকাশ্যেই ঘুরছে। দীর্ঘ ৭ বছর ধরে টাকা আদায়ে এবং প্রতারকদের ধরতে আমরা মাঠে রয়েছি। আমাদের অনেক বিনিয়োগকারী রোগে শোকে ইতোমধ্যে মারাও গেছেন। আমরা চাই প্রতারকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের টাকা উদ্ধারেও সরকারের হস্তক্ষেপ চাই আমরা।

এ বিষয়ে জানতে এহসান সোসাইটির অন্যতম পরিচালক মুফতি মো. ইউনুসের মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। যশোরে এহসান সোসাইটির মাঠকর্মী বড়বাজার মসজিদের খাদেম মোকসেদ আলী বলেন, ‘আমি নিজেও একজন গ্রাহক। আমি ওদের লোক না। এই বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’

এ বিষয়ে যশোর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পুলিশ সুপার রেশমা শারমীন  বলেন, ‘এহসান গ্রুপের প্রতারণা সংক্রান্ত ১৪টি সিআর মামলা যশোর পিবিআই তদন্ত করছে। এর মধ্যে তদন্ত শেষে ১০টি মামলার রিপোর্ট আমরা জমা দিয়েছি। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২৭ জনের নামে প্রতিবেদন দাখিল করেছি। এছাড়া যশোরে আড়াই কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় গতকাল এহসান সোসাইটির চেয়ারম্যানসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। এই মামলাটিও আমরা তদন্তের দায়িত্বে রয়েছি। তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’ (ঢাকা পোস্ট)

143 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন