e valy e orrange

বাংলাদেশের ই-মার্কেটকে ধ্বংস করেছে ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জ …

মিজানুর রহমান রানা :
বাংলাদেশের অনলাইন মার্কেট তথা ই-কমার্স ধীরে ধীরে নদীর পললের মতো গড়ে উঠার প্রক্রিয়ায় ছিলো। ই-মার্কেট সারাবিশে একটি জনপ্রিয় ই-কমার্স মাধ্যম। ভোক্তারা দেখে-শুনে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রাইস বা মূল্য সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে অবগত হয়ে হাতের কাছে তার চাহিদাকৃত পণ্যটি অনায়াসে পেতে ই-কমার্স মার্কেটে অর্ডার দিয়ে থাকে। ক্রেতা মার্কেটে ঘোরাঘুরি করে সময় নষ্ট না করে ই-কমার্সের মাধ্যমে অর্ডার দিয়ে পণ্য পেতে চায়।

আরো পড়ুন : শ্বেতী রোগের কারণ, লক্ষ্মণ ও চিকিৎসা

এটি একটি বিশাল মার্কেটে ধীরে ধীরে রূপদান করার প্রক্রিয়ায় ছিলো। কিন্তু কিছু দুস্কৃতিকারী ও অর্থলোভী পিশাচের অন্যায্য কার্যক্রমে বাংলাদেশের ই-কমার্স ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। ধাক্কা খেলো শুরুতেই। যা কোনোভাবেই দেশের স্বার্থে মেনে নেওয়ার বিষয় নয়।

এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ই-ভ্যালি, ই-অরেঞ্জ-সহ কতিপয় অর্থগ্রাসকারী দুষ্ট ভুয়া প্রতিষ্ঠান। যারা মানুষের সাথে বিশাল প্রতারণা করে ই-মার্কেট সম্পর্কে বিশ^াসটাই নষ্ট করে দিয়েছে। এখন মানুষ অনলাইনে পণ্য অর্ডার করতে ভয় পায় এ সমস্ত স্বার্থলোভী কু-চিন্তার মানুষদের জন্য।

অথচ শুরুতে এসমস্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি করা গেলে হাজার হাজার মানুষ কোটি কোটি টাকার প্রতারণা থেকে বেঁচে যেত। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার খপ্পরে পড়ে মানুষ হারিয়েছে যেমন অর্থ, তেমনি হারিয়েছে বিশ^াস। ফলে ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী অন্য অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের এদের কারণে আজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আরো পড়ুন : যৌন রোগের কারণ ও প্রতিকার

ই-ভ্যালির পরিকল্পনা : ই-ভ্যালি শুরুতেই নানা অফার দেয় গ্রাহকদের। এর মধ্যে হচ্ছে ইভ্যালির ক্যাশব্যাক অফার। যেমন যদি আপনি ১০০ টাকার পণ্য কেনেন, তাহলে আপনাকে সমপরিমাণ টাকা অথবা তার চেয়ে বেশি টাকা ক্যাশ দেওয়া হয়। ক্রেতা ক্যাশব্যাকের ওই টাকার ৬০ শতাংশ ব্যালেন্স থেকে খরচ করতে পারে। বাকি ৪০ শতাংশ নিজ থেকে খরচ করার শর্ত রয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশন বলছে, এ ধরনের শর্তযুক্ত অফার প্রতিযোগিতা আইনের বিরোধী।

তবে সাধারণ গ্রাহকরা ইভ্যালির এসমস্ত প্রতারণাযুক্ত অফার বুঝতে পারে না। সরল মনে তারা এদের ফাঁদে পড়ে যায়। আর অগ্রিম বাবদ হাজার হাজার টাকা ইভ্যালিকে দিয়ে দেয়। কিন্তু ইভ্যালি ও ই অরেঞ্জ গ্রাহকদেরকে কালক্ষেপণ করাতে করাতে অতিষ্ঠ করে ফলে।

আরো পড়ুন : ডায়াবেটিস প্রতিকার ও প্রতিরোধে শক্তিশালী ঔষধ

গ্রাহকদের কাছে ইভ্যালির দেনার পরিমাণ ১ হাজার কোটি টাকা। র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে প্রতিষ্ঠানটির সিইও রাসেল এমন তথ্য দিয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে রাসেল জানান, গত ফেব্রæয়ারিতে গ্রাহকদের কাছে দেনার পরিমাণ ছিল ৪০৩ কোটি টাকা। গ্রাহকের এই টাকা কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে, র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। সর্বশেষ দায় মেটাতে ব্যর্থ হলে ইভ্যালিকে দেউলিয়া ঘোষণার পরিকল্পনাও ছিল রাসেলের।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, একটা ব্র্যান্ড তৈরি করে গুডউইল নিয়ে এক সময় ইভ্যালিকে দেশি-বিদেশী বড় কোম্পানির নিকট ইভ্যালি বিক্রয় করার পরিকল্পনা ছিলো রাসেলের। তা যদি করতে না পারতো তাহলে এক সময় দেউলিয়া ঘোষণা করে সাধারণ মানুষকে পথে বসাতো সে। এরকম প্রতারণা দায় অন্য ভালো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিতে হতো। মানুষের সাথে ইভ্যালির প্রতারণা স্বরূপ ই-কমার্স মার্কেটটি সমূলে নষ্ট হয়ে যেতো।

আরো পড়ুন : মেহ প্রমেহ ও প্রস্রাবে ক্ষয় রোগের কার্যকরী সমাধানসমূহ

ইঅরেঞ্জের প্রতারণা : অনলাইন মার্কেটে সাধারণ মানুষের সাথে ই-অরেঞ্জ এক হাজার একশ’ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। এ ব্যাপারে মামলায় ই-অরেঞ্জের মূল মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তাঁর স্বামী মাসুকুর রহমান, মালিক বীথি আকতার, প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) আমানউল্লাহ চৌধুরী, প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদসহ প্রতিষ্ঠানটির সব মালিককে আসামি করা হয়েছে।

গত ২৮ এপ্রিল থেকে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা প্রকার পণ্য কেনার জন্য টাকা নিয়ে পণ্য সরবরাহ করার কথা থাকবলেও ই-অরেঞ্জ এক লাখ ভুক্তভোগীর সঙ্গে প্রতারণা করে। ভুক্তভোগীরা ই-অরেঞ্জের অফিসে গিয়ে পণ্য সরবরাহ চাইলে তারা কালক্ষেপণ করতে থাকে। কিন্তু গ্রাহকদেরকে কোনোপ্রকার পণ্য সরবরাহ করা হয়নি।

আরো পড়ুন : গেজ, অশ্ব,পাইলসের সহজ চিকিৎসা

এ প্রতারণার দায় কে নেবে? যারা সহজ সরল মানুষের সাথে প্রতারণা করে দেশে ই-কমার্স শিল্পকে শুরুতে ধ্বংস করে দিলো। হাজার হাজার বেকারের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিলো।

তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ইভ্যালির সিইও মোহাম্মদ রাসেল এবং তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

আর এর আগে গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের মামলায় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের মালিক সোনিয়া মেহজাবিন ও তার স্বামী মাসুকুর রহমানসহ তিনজনকে পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

এখন দেখার পালা শেষ পর্যন্ত কোথাকার পানি কোন দিকে গড়ায়।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, বেষ্ট ই-কমার্স।

ইভ্যালি নিয়ে যে ‘নীল নকশা’ ছিল রাসেলের

ঢাকা: ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ইভ্যালি যাত্রা শুরু করলেও দীর্ঘ তিন বছরে কোনো লাভের মুখ দেখেনি। অথচ বিভিন্ন অফারের নামে গ্রাহকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া অব্যাহত ছিলো প্রতিষ্ঠানটির।

নতুন নতুন গ্রাহকের টাকায় পুরাতন কিছু গ্রাহককে পণ্য দিলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দায় বাড়তে থাকে, বর্তমান সময় পর্যন্ত সেই দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহক অসন্তোষের জেরে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ইভ্যালির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। বৃহস্পতিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন এক ভুক্তভোগী। যার ভিত্তিতে বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইভ্যালির সিইও মো. রাসেল ও তার স্ত্রী-প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনকে গ্রেফতার করে র্যাব।

জানা যায়, গ্রেফতার দুইজন বিভিন্ন সময়ে ইভ্যালির অফিসে অপমান হেনস্থা ও ভয়ভীতির স্বীকার হয়েছেন।

আরো পড়ুন : মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়ার হোমিও চিকিৎসা

ইভ্যালির শুরু যেভাবে:
গ্রেফতার রাসেল প্রতিষ্ঠানটির সিইও এবং তার স্ত্রী শামীমা নাসরিন চেয়ারম্যান হিসেবে তাদের প্রতারণার অন্যতম সহযোগী। রাসেল ২০০৭ সালে একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে ২০১৩ সালে এমবিএ সম্পন্ন করেছেন। তিনি ২০০৯ সাল হতে ২০১১ সাল পর্যন্ত একটি কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করতেন। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি একটি ব্যাংকে চাকরি করেন।

প্রায় ৬ বছর পর ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রায় এক বছর শিশুদের ব্যবহার্য একটি আইটেম নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এক পর্যায়ে তিনি ওই ব্যবসা বিক্রি করে ২০১৮ সালে ইভ্যালি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ইভ্যালির কার্যক্রম শুরু হয়।

ভাড়ায় ধানমন্ডিতে একটি অফিস ও একটি কাস্টমার কেয়ার স্থাপন করেন। এছাড়া ভাড়াকৃত স্থানে আমিনবাজার ও সাভারে দুটি ওয়্যার হাউজ চালু করেন। কোম্পানিটি এক পর্যায়ে ২ হাজার স্টাফ ও ১৭০০ কর্মচারীকে নিয়োগ দেয়।

গ্রাহক টানতে লোভনীয় অফার:
জিজ্ঞাসাবাদে রাসেল র‌্যাবকে জানায়, ইভ্যালি ছাড়াও তার আরও কয়েকটি ব্যবসায়িক প্লাটফর্ম রয়েছে। এরই মধ্যে ই-ফুড, ই-খাতা, ই-বাজার ইত্যাদি। ইভ্যালির ব্যবসায়িক কাঠামো শুরু হয়েছিল সামান্য বিনিয়োগ দিয়ে। তার ব্যবসায়িক পরিকল্পনাই ছিল প্রস্তুতকারক ও গ্রাহক চেইন বা নেটওয়ার্ক থেকে বিপুল অর্থ তুলে নেওয়া।

তিনি বিশাল অফার, ছাড়ের ছড়াছড়ি আর ক্যাশব্যাকের অফার দিয়ে সাধারণ জনগণকে প্রলুব্ধ করতেন। যাতে দ্রুততম সময়ে ক্রেতা বৃদ্ধি পায়।

জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ইভ্যালির বর্তমান গ্রাহক সংখ্যা ৪৪ লাখেরও বেশি। সাইক্লোন অফার (বাজার মূল্যের অর্ধেক মূল্যে পণ্য বিক্রয়), ক্যাশব্যাক অফার (মূল্যের ৫০-১৫০% ক্যাশব্যাক অফার), আর্থকুয়েক অফার, প্রায়োরিটি স্টোর, ক্যাশ অন ডেলিভারি। এছাড়া বিভিন্ন উৎসব কেন্দ্রীক জমজমাট বৈশাখী, ঈদ অফার, টি-১০, টি-৫ ও টি-৩ অফার। এভাবে বিভিন্ন অফারে প্রলুব্ধ হন সাধারণ জনগণ।

জেনেশুনে নেতিবাচক প্রক্রিয়ায় ব্যবসা পরিচালনা:
ইভ্যালির বিক্রি বাড়াতে গ্রাহকদের প্রতিনিয়ত চাহিদা তৈরি হয় এ ধরনের পণ্যকে বেছে নেওয়া হয়। মূল্য ছাড়ের ফলে যার ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। এর ফলে ক্রমান্বয়ে প্রতিষ্ঠানটির দায় বাড়তে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির নেওয়ার্কে যত গ্রাহক তৈরি হতো, দায় ততো বৃদ্ধি পায়। রাসেল জেনেশুনে এ নেতিবাচক কৌশল গ্রহণ করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।

জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আরও জানান, একটি বিদেশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় অফার (১:২) এর আলোকে ইভ্যালির ব্যবসায়িক কৌশল তৈরি করেছেন।

ব্যবসায়িক ভবিষ্যত কর্ম পরিকল্পনা সম্পর্কে গ্রেফতারকৃতরা জানান, প্রথমত একটি ব্রান্ড ভ্যালু তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। এরপর দায়সহ কোনো প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কোম্পানির কাছে বিক্রি করে লভ্যাংশ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিলো তার। এ উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণও করেছেন।

85 জন পড়েছেন
শেয়ার করুন