সিনহা

সিনহাকে হত্যার পরিকল্পনা হয় ১৫ দিন আগে

নিউজ ডেস্ক :

টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ রোডের শামলাপুর চেকপোস্টে ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। তবে, সিনহাকে হত্যার জন্য অন্তত ১৫ দিন আগে গোপন পরিকল্পনা করেছিলেন সেসময়ে টেকনাফ থানার দায়িত্বে থাকা ওসি প্রদীপ। সিনহা হত্যা মামলার তদন্তে থাকা র‌্যাবের তদন্তে এমনটাই উঠে এসেছে।

র‌্যাবের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে পুলিশের সোর্স ও মামলার আসামি নুরুল আমিন বলেছেন, ‘জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে আইসি লিয়াকত স্যারের মাধ্যমে ওসি প্রদীপ স্যার আমাদের টেকনাফ থানায় ডাকিয়া পাঠান। আমি ও নিজাম উদ্দিন থানায় গেলে ওসি প্রদীপ স্যার ও আইসি লিয়াকত স্যারের সাথে দেখা হয়। ওসি প্রদীপ স্যার বলেন সিনহা টিনহা এসব ঝামেলা রাখা যাবে না। গায়েব কইরা ফেলতে হবে।’

সিনহা হত্যা মামলার চার্জশিটে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে নুরুল আমিন, নিজাম উদ্দিন ও আইয়াছ উদ্দিন টেকনাফ থানা পুলিশের সোর্স এবং সাজানো মামলার সাক্ষী ছিলেন। এই তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ঘটনার শুরুতে তারা ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন। সিনহাকে ডাকাত সাজিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করেন। তাতে ব্যর্থ হয়ে সিনহার চলাচলের খবর লিয়াকতকে ফোনে জানিয়ে দেন। পরিকল্পনা ও যোগসাজশের মাধ্যমে তারা হত্যাকাণ্ড ঘটান।

আরও পড়ুন: সিনহা হত্যা মামলা: সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক সাজা চায় পরিবার

সিনহা হত্যা মামলার অন্য আসামিরা হলেন- টেকনাফ মডেল থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের সাবেক আইসি লিয়াকত আলী, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন আজাদ ও আব্দুল্লাহ আল মামুন, কেটনাফ মডেল থানার সাবেক কনস্টেবল রুবেল শর্মা ও সাগর দেব এবং সেসময়ে শামলাপুর পুলিশ চেকপোস্টের দায়িত্বে থাকা এসআই মো. শাহজাহান আলী, কনস্টেবল রাজীব হোসেন ও আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ইমন।

তৎকালীন বহুল আলোচিত সেনাবাহিনীর মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার রায় সোমবার (৩১ জানুয়ারি) ঘোষণা করা হবে। গত ১২ জানুয়ারি আসামি ওসি প্রদীপের আইনজীবীর অসমাপ্ত যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. ইসমাইলের আদালত রায়ের এ দিন ধার্য করেন।

গত ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ রোডের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর পুলিশ বাদী হয়ে তিনটি মামলা দায়ের করে। পরে ওই বছরের ৫ আগস্ট কক্সবাজার আদালতে টেকনাফ থানার বহিষ্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ৯ পুলিশের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন মেজর সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। এরপর মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় র‍্যাব।

ওই বছরেরই ১৩ ডিসেম্বর ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও র‍্যাব-১৫ কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মো. খাইরুল ইসলাম। এতে সাক্ষী করা হয় ৮৩ জনকে।

এরপর ২৭ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয় এবং ২৩ আগস্ট থেকে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। যা শেষ হয় গত ১ ডিসেম্বর। পরে ৬ ও ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় আসামিদের ৩৪২ ধারায় বক্তব্য গ্রহণ।

গত বছরের ২৪ জুন মামলার একমাত্র পলাতক আসামি টেকনাফ থানার সাবেক এএসআই সাগর দেব আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। আসামিদের মধ্যে ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তার মধ্যে পুলিশের সোর্স নুরুল আমিনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

তদন্ত শেষে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫-এর তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মো. খাইরুল ইসলাম ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। ঘটনার প্রায় ১৮ মাস পর রায়ের দিন ধার্য করেন কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাঈল।

গত বছর ২৭ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয়। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সর্বশেষ দুই আসামির পক্ষে তাদের আইনজীবীদের যুক্তি উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আগামী ৩১ জানুয়ারি রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেন বিচারক। সবকিছু ঠিক থাকলে রায়ের দিন সিনহার পরিবারের সদস্যরাও আদালতে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।

এদিকে, আসামিদের সর্বোচ্চ সাজার দাবি জানিয়েছে সিনহার পরিবার। সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস সংবাদমাধ্যমকে মামলার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, আমার ভাইকে যারা নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে, তাদের সবাইকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হোক। এমন জঘন্য হত্যাকাণ্ড যেন আর না ঘটে। আমার মতো আর কোনও বোনের বুক যেন খালি না হয়। অপরাধ করে কেউ যেন পার না পায়। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, এটাই রায়ে প্রমাণ হোক।

তিনি বলেন, মামলার ১৫ আসামি হত্যার সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে ১ ও ২ নম্বর আসামি (ওসি প্রদীপ ও লিয়াকত) হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত। এই দুইজনের সর্বোচ্চ সাজা হবে, আমরা এটা প্রত্যাশা করছি। বাকি আসামিদের যার যার অপরাধ অনুযায়ী সাজা দেওয়া হোক।

শারমিন শাহরিয়া আরও বলেন, অবশ্যই আদালত সবকিছু বিবেচনা করে রায় দেবেন। একই সঙ্গে আমি মনে করি, এই রায়ের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অর্থাৎ ক্রসফায়ার বন্ধ হবে বাংলাদেশে। মানুষ সুবিচার পাওয়ার আশা রাখবে। এমন দৃষ্টান্তমূলক রায়ের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে। যে কেউ বিচার চাওয়ার জন্য আদালতে আসবেন।

 25 সর্বমোট পড়েছেন,  1 আজ পড়েছেন

শেয়ার করুন