রহমান রানা

‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’

মিজানুর রহমান রানা : রচনাকাল : ১৪ জুন ২০০৮ খ্রি.

সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতকে নিয়ে কোনো প্রকার মূল্যায়ন করতে হলে; এ জগতের কর্মময় মানুষদের সমালোচনা করতে হলে সর্বাবস্থায় লেখক/সমালোচকের বয়স, যোগ্যতা, শিক্ষা ও সাহিত্যানুরাগী ও সংস্কৃতিবান মানুষদের কর্মকাণ্ড, পরিসর ও অবস্থান সম্পর্কে ভালো করে জানতে হবে।

একটা কথা প্রচলিত আছে যে, “ত্রিশের আগে লেখা নয়”। কথাটা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত নয় এজন্যে যে, কবি সুকান্ত মাত্র সতের বয়সে উৎকৃষ্ট সাহিত্য রচনা করে প্রমাণ করেছেন বয়স সাহিত্য রচনার জন্যে কোনো বাধা নয়। কিন্তু সবাই তো আর কবি সুকান্ত নয়; তাই “ত্রিশের আগে লেখা নয়”। কথাটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিকও নয়।

কারণ, অল্প বয়সে পরিণত বয়সের মতো প্রজ্ঞা জন্ম নেয় না। তবে যাদের অন্তরে সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রীতি গভীরভাবে নাড়া দেয় তাদেরকে কম বয়স বলে বসে থাকাও ঠিক নয়; তাদের সাহিত্যচর্চা করতে হবে। সাহিত্যচর্চাবস্থায় (অর্থাৎ শিক্ষানবীশ কালীন সময়ে) সমস্ত সাহিত্য পরিমÐলকে নিয়ে এবং জ্ঞানী-গুণীদের নিয়ে ঢালাও মন্তব্য করা কোনো জ্ঞানী মানুষের কাজ নয়। সেটা হবে একান্ত অর্বাচীনদের কাজ।

আর যদি মন্তব্য করা একান্ত প্রয়োজন হয়েই পড়ে তাহলে তা’ লিখে পক্ষপাতমুক্ত কোনো জ্ঞানী লেখককে দিয়ে রচনার মান ঝালাই করে নেয়া উচিত। স্মরণ রাখতে হবে, পত্রিকার পাতায় যারা তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে কষ্ট স্বীকার করে লিখে থাকেন তাদের এ রচনা আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই পড়েন। তারা লেখকগণের রচনা থেকে উৎকৃষ্ট কিছু শেখার চেষ্টা করে থাকেন। লেখকগণের মতামত, রচনাবলী যদি একপেশে ও সত্যের অপলাপ হয় তাহলে সাধারণ মানুষ কী শিখবে। সমাজ হয়ে পড়বে কলুষিত ও পক্ষাপাতদুষ্ট।

পত্রিকান্তরে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে গঠনমূলক মতামত, লেখকগণের গঠনমূলক সমালোচনা করা কোনো অপরাধ বা অনৈতিক কিছু নয়; বরং গঠনমূলক মতামত সমাজের জন্যে হিতকরও বটে। গঠনমূলক মতামত সাহিত্য ও সাহিত্যিকের মনে সাহিত্যপ্রীতির জন্ম দেয়। কিন্তু পত্রিকার পাতায় কোনো রচনা প্রকাশিত হলেই উক্ত রচনা সম্পর্কে ভালোভাবে বিস্তারিত না বুঝেই অগোছালো মন্তব্য করা সঠিক কি-না তা’ ভেবে দেখার সময় এসেছে।

খোলা মন্তব্যে যাদের হিট করেছেন তারা নিতান্তই পরগাছা বৈ কিছু নয় এবং এ সমাজে যারা পরগাছা তারা ঠিকই তা’ বুঝে গেছেন তাদের করণীয় কী?

যারা পাঠকের মন্তব্য সঠিকভাবে বুঝেননি তাদের প্রতি দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া কিছুই করার নেই। সৃজনশীল বা বিজ্ঞ লেখকদের ব্যক্তিগত আক্রমণ করা সমীচীন নয়।

সাহিত্যক্ষেত্রে যারা ভাণ করে শুধু তাদের কথা নিয়ে আলোচনা করা যায়। যারা প্রকৃত অর্থে সাহিত্য-সংস্কৃতিবান তাদের প্রতি কোনো প্রকার অসৌজন্যতা প্রকাশ ঠিক নয়। যারা বিজ্ঞলোক তারা পত্রিকায় কোনো আলোচনা-সমালোচনা দেখেই অর্থাৎ সমূদ্রে ঝড় দেখে বেলাভূমিতে জ্ঞান হারান না এবং শিশুদের মতো কান্না জুড়ে দেন না।

সমালোচনা করলেই লেখকের লেখনি থেমে গিয়ে তিনি বেকার হয়ে যাবেন তা কী ঠিক? আর কোনো লেখকের রচনায় কারো নাম আসেনি বলে সে লেখককে নিন্দাবাদ করে তার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করা কী ঠিক?

একটা পত্রিকার জন্মদিনে সে পত্রিকায় লিখিত একজন সম্মানিত লেখকের রচনায় নিজের নাম আসেনি বলে বার বার উক্ত লেখকের ব্যাপারে উষ্মা প্রকাশ করে নিজের ওজন কমানো কী ধরনের ব্যবহার হতে পারে তা’ আমার জানা নেই। আমরা স্বচক্ষে দেখেছি যখন ওই লোকটি বক্তব্য রাখছিলেন, তখন দর্শকগণ হাসাহাসি করছিলেন যে, উনি নিজেই নিজের ঢোল পিটিয়ে যাচ্ছেন। নিজের নিজের আত্মপ্রচার করা অথর্বদের কাজ।

কথায় আছে, “ধর্মের ঢোল আপনিই বাজে”। কেউ কিছু সৃষ্টি করলে তা’ তো সাধারণই প্রচার করবে। নিজের ঢোল নিজে পেটাবো কেন? কারণ “খালি কলস বাজে বেশি।”

একটি ব্যাপার লক্ষণীয়, ঢালাওভাবে লেখকদের অশিক্ষিত, অমেধাবী বলে দোষারোপ করা কী যুক্তিযুক্ত? শিক্ষিত লোক কাকে বলে? বি.এ, এমএ, এমবিবিএস, বিসিএস, ডক্টরেট ইত্যাদি করলেই কী শিক্ষিত বলে ধরে নেয়া হয়? একজন মানুষ যখন বিরাট বিরাট ডিগ্রি অর্জন করে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য কাজ করে তখন তাকে কী বলা হয় ‘মুর্খ পণ্ডিত’।

অষ্টম শ্রেণীতে একটি ভাব স¤প্রসারণ পড়ানো হতো। “সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত।” কাজী নজরুল ইসলাম মাত্র ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলেন। তিনি কী অশিক্ষিত ছিলেন? তিনি সুশিক্ষিত ছিলেন কারণ তিনি প্রকৃতির কাছ থেকে শিখেছেন; আমরা কী প্রকৃতির কাছ থেকে বা নিজে নিজে শিক্ষা গ্রহণ করি? যদি করি তাহলে কী শিক্ষা গ্রহণ করি? লোকেরা শিক্ষিত হয়ে দুর্নীতি, তথ্য সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী ইত্যাদি যখন করে তখন তাকে কী শিক্ষিত লোকের কাজ বলা চলে? আর একজন গরীব রিক্সাচালক যখন ক্ষেত্রবিশেষে উদারতা প্রদর্শন করে তখন তাকে কী অশিক্ষিত বলে গাল দেয়া যাবে?

যারা কাক হয়ে ময়ূরপুচ্ছ পরিধান করে অভিনয় করে অর্থাৎ ভাণ করে তাদের কথা আমরা আলোচনা করতে পারি। এই অভিনয় বলতে নাট্যাঙ্গনের কথা নয়, বরং সাহিত্যক্ষেত্রে ভাণ অর্থে আমরা বলতে পারি। যাই হোক, কারো সমালোচনার জবাব দিতে হলে বা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে হলে না বুঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করাও সমীচিন নয়।

যারা নবীন লেখক (সাহিত্য চর্চা করছি মাত্র) তারা চেষ্টা করলেনও গুণী কবি-লেখকদের কাতারে যেতে কালোত্তীর্ণ রচনা তৈরি করতে হয়। আর সাহিত্যের বিজ্ঞজনরা সাহিত্যজীবনের অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে এসেছেন। তাঁরা নিজেকে মহাজ্ঞানী ভাবেন না। অথচ আমরা নবীন লেখকরা যারা মাত্র সাহিত্য চর্চা করছি আমাদের সামনে হাজার বছরের পথ বাকি তারা নিজেদের অনেক বড় মনে করছি এবং হম্বিতম্বি প্রকাশ করছি।

কোনো সাহিত্যিকের বেকার হয়ে যাওয়া তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কারো ওপর অভিমান করে কোনো প্রকৃত সাহিত্যিক বেকার হয়ে পড়েন বলে বিজ্ঞজনরা মনে করেন না। বরং প্রদীপের তেল যতক্ষণ থাকবে সে ততক্ষণ জ্বলবে, তেল না থাকলে প্রদীপ নিভে যায়। এর জন্যে কাউকে দায়ী করে উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো কী উচিত? কোনো ব্যাপারে সমালোচনা করতে হলে শালীনতা বজায় রাখা বুদ্ধিমান লেখকের অবশ্যই কর্তব্য। “নাই কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা, নাই কোনো চেহারা, নাই কোনো স্মার্টনেস। অথচ সেই-ই নাট্যকার ও অভিনেতা” এভাবে কারো সমালোচনা পরিপক্ক মানুষ করে বলে আমার জানা নেই এবং এটা সাহিত্য সমালোচনার ভাষা কি না তা সুধী সমাজের ভেবে দেখার সময় এসেছে।

বিগত ক’বছর আগে জনৈক লেখকের সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমালোচনা পত্রিকায় দেখলাম। তার ভাষায়. চাঁদপুরের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গন একদম পঁচে গেছে। মঞ্চে ভালো গায়ক-গায়িকারা গাইতে পারে না, শুধু মেদবহুল অবাঞ্ছিতরা গান গায়। আমি উক্ত সমালোচকগণকে বলবো, দয়া করে আপনারাও গান শিখুন। গান শিখে গাইতে নেমে যান। না হলে যে পঁচে যাবে সংস্কৃতি অঙ্গন। শুধু আপনাদের জন্যই টিকে আছে এ অঙ্গন। সমালোচনা করা সহজ; আর যা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইয়ে দেয়া হয় সেই কাজটি নিজে করা বড়ই কঠিন। অনেক সময় ঢাকঢোল পিটিয়ে সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনে অনেকই আসেন বিশেষ স্বার্থ সিদ্ধির জন্যে। কেউবা হয়ে যান অমুক কেউবা তমুক। তাদের বাহারি পদ (পা নয়) দেখে ভিমড়ি খাবার যোগাড় হয়। একটা পদ (সাক্ষী গোপাল) ধরে রাখার জন্যে নানান কায়দা রপ্ত করে সেই পদটি আজীবন ধরে রাখতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা’ কী সম্ভব হয়?

সাহিত্যাঙ্গনের অনিয়ম, অনাচারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কলম ধরেন তাদের প্রতি রইলো সহমর্মিতা ও প্রাণঢালা ভালোবাসা। সেই সাথে আশা করছি, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে সমালোচনার ক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট চিন্তাশীল লেখনী ও নিরপেক্ষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হবো।

 80 সর্বমোট পড়েছেন,  1 আজ পড়েছেন

শেয়ার করুন